আয়নায় ছায়া পড়েছে তার। বন্ধ ঘরে আলো কম, প্রতিবিম্বও তাই ছায়াময়। তাকে ঠিক কী রকম দেখাচ্ছে খাট থেকে বুঝতে পারল না সত্যেন। কাছে গিয়ে আয়নার ওপরের আলোটা জ্বালিয়ে দিল। এই আলো জ্বেলে মণিমালা প্রসাধন করে। খুব নরম চেহারার, নরম ধাতের মণিমালা। মাখনে গড়া হাত-পা, চুলগুলো কাক-কালো, কপালে ছোটো টিপ, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, গলায় সরু হার, কানে মাকড়ি, হাতে বালা, ঘড়ি-মণিমালা স্কুলে, কি বাজারে কি অন্য কোনো দরকারে বেরোচ্ছে। কিংবা মাথায় বিচিত্র খোঁপা, চোখে কাজল, দামি গাদোয়াল, গহনা মণিমালা বিয়েবাড়ি যাচ্ছে, পার্টি-বাড়ি যাচ্ছে। পাশে সত্যেন, স্মার্ট গাই। নতুন ওভারনাইট ব্যাগ ভরতি জামাকাপড় ঠিক যেমনটি নিয়ে গিয়েছিল, টাইয়ে বাঁধা গাড়ির নাম্বারপ্লেট গহিন জলে, প্যান্টের পকেটে, শার্টের ভেতর পকেটে গোছা গোছা ক্যাশ, পার্সে ক্রেডিট কার্ড, আইডেনটিটি কার্ড, লাইসেন্স, বাড়ির চাবি, ঈশ্বরের করুণা।
দ্রুত জামাকাপড় বদলে ফেলল সে, এক গ্লাস জল খেল, একটা হালকা শুয়ে পড়ল সর্বতাপহর বিছানার কোলে। ভাবতে লাগল কিছু কি ভুল হয়ে গেল। কোনো চিহ্ন পড়ে নেই তো? ব্যাগ-ফ্যাগ সব গাড়ির থ্যাঁতলানো শবের সঙ্গে এমনভাবে দলা পাকিয়ে গেছে যে সে হদিস করতে পারেনি। গ্লাভ কম্পার্টমেন্টে গাড়ির কাগজপত্রগুলোরও নিশ্চয়ই একই দশা। তবু তার সামান্য আফশোশ হতে লাগল অকুস্থলে আগুন জ্বালিয়ে না আসার জন্যে। সে তো খুনখারাপি করছে না। অ্যাকসিডেন্টটাও সে ঘটায়নি। লিজ, ট্রাক ড্রাইভার ও তার খালাসি নিশ্চিত ডেড অ্যান্ড গন। তাদের বেঁচে থাকবার কোনো আশাই নেই। তা হলে আগুন ধরিয়ে শবদাহ করলে অপরাধ হত? সে তো কোনো অপরাধ করেনি! করেনি কী? অপরাধ? ঠিকঠাক! সত্যেন! ট্রাংকুলাইজারে আস্তে আস্তে তলাতে শুরু করল সে।
মি, স্যান্ডারসনের জন্যে লিজকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অফিসের আলিপুর গেস্ট হাউসে। উনি চেয়েছিলেন। ইন্ডিয়ান, বেঙ্গলি, লোক্যাল। লিজকে শাড়ি পরিয়ে নিতেই আর কোনো অসুবিধে হয়নি। আসল কথা, ওসব লোককে হ্যান্ডল করতে সফিস্টিকেশন চাই। লিজি তো হেজিপেঁজি নয়, সে-ও এক নামকরা কোম্পানির কলকাতা অফিসের রিসেপশনিস্ট। লম্বা লম্বা পা, মডেলের মতো লীলাময় চলাফেরা, একেবারে যেখানে যতটা মাপ দরকার তেমনই। গেস্ট হাউসে যখন স্যান্ডারসনের সঙ্গে কনট্রাক্ট বিষয়ে ফাইনাল কথাবার্তাগুলো হল, দেখা গেল পিএ-র কাজটুকু লিজি অনায়াসে করে দিতে পারে। মি. স্যান্ডারসন চমকৃত। ইদানীং লিজ তারও অনেক সেক্রেটারিয়াল কাজ করে দিচ্ছে। আনঅফিশিয়ালি। একটাই চাহিদা তার। সত্যেন, সত্যেনকে তার চাই।
প্রথম যেবার সত্যেন নিজেকে দিয়েছিল, এত কিন্তু কিন্তু, এত লাজুক ছিল সে যে নিজেকে স্মার্ট গাই বলে প্রমাণ করতেই পারেনি লিজের কাছে।
ভার্জিন না কি?–এখনও সেই হাসি শুনতে পায় সে।
কবে আর ভোগ করতে শিখবে?
বিবেক? আশ্চর্য সত্যেন, তুমি তো ফ্যামিলিকে বঞ্চিত করছ না। ইউ স্টিল লভ ইয়োর ওয়াইফ অ্যান্ড মেক লভ টু হার, ডোন্ট ইউ?
আস্তে আস্তে একেবারে অচেনা, উত্তেজক নেশার বস্তু চিনতে পেরে গেল। সত্যিই সারা সমাজটা পালটে গেছে এখন, পালটাবেই। এসব এখন কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই ধরে না। আরে বাবা, রোজ তোমার বাড়িতে খেতে ভালো লাগে? থাই, মোগলাই, কন্টিনেন্টাল—জিভের বদল, স্বাদের বদল, পরিবেশ বদল—ভালো লাগে না? কী দোষ এতে? তেতাল্লিশ হয়ে গেল, কবে আর ভোগ করবে জীবনের চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা ঐশ্বর্য? তা ছাড়া, মণিকে তো সে একটুও কম দেয় না। মণির চেহারা দেখলেই বোঝা যায়—শান্ত, প্রসন্নশ্রী…সকলেই বলে থাকে। আর ঋতম? তার তো কথাই নেই। তার মধ্যে নিজেকেই দেখতে পায় সত্যেন। এবং নিজের ছায়ার মতোই ভালোবাসে…অ্যান্ড হি লভস হিজ ওয়াইফ অ্যান্ড.মেকস লভ টু হার।…ডাজনট হি?
এ কী! তুমি এসে গেছ? অফিস যাওনি? এমন করে ঘুমোচ্ছ যে? শরীর ঠিক আছে তো?
সাধারণত সে ঢুর সেরে সোজা অফিস চলে যায়।
কীরকমভাবে ঘুমোচ্ছিল সে? পুঁটলি হয়ে। হাঁটু দুটো বুকের কাছে জড়ো, মাথাটা নুয়ে এসেছে বুকের ওপর। মাতৃগর্ভে জ্বণের মতো!
একটু একটু করে ফিরছে সত্যেন। কিন্তু ঘোর অবাস্তবতায়। ট্রাংকুলাইজড ঘুম চট করে সত্য চিনতে পারে না। ঘরখানা টলমল করছে। সামনে একটি অলৌকিক মূর্তি। ছোটোবেলার সরস্বতীপুজো? ভূমিকম্প! অঞ্জলি দেবে? পল্টন…পল্টন…আজ সরস্বতীপুজো…বেলা হয়ে যাচ্ছে। ওঠ। ওঠ বলছি শিগগিরই। তুই-ই ফাঁকে পড়বি…আমার কী…
মাথাটা জোরে ঝাঁকিয়ে চোখ কচলে উঠে বসল সত্যেন। তাকে নিয়ে স্প্রিং ফোম একটু দুলে উঠল।
কী হয়েছে? এত তাড়াতাড়ি? আমি তো তোমাকে বিকেলের আগে…
এত আশ্চর্য হবার কী আছে? একটু বিরক্ত গলায় সত্যেন বলল, তুমি কখন ফিরলে?
এই তো আজ প্রাইজ-লিস্ট করার ছিল। একটু দেরিই হয়ে গেছে। আমি ঘরে ঢুকে বিছানার কাছে আসবার আগে পর্যন্ত বুঝতেই পারিনি তুমি…এসেছ।
হঠাৎ সত্যেন বুঝতে পারল, তার মুখ থেকে রক্ত সরে যাচ্ছে। সে নাও ফিরতে পারত। কাঁপা গলায় বলল, আর বোলো না গাড়িটা চুরি হয়ে গেল।
গাড়ি? চুরি? কোথা থেকে? কখন?
কখন কি জানি? পার্কিং লট থেকে, বর্ধমান সরকারি গেস্ট হাউস…তেমন কিছু ভেবেই বলে গেল সত্যেন।
