খাবে এসো।
প্রচুর অনিচ্ছা নিয়ে সত্যেন ওঠে। হাত-মুখ ধোয় সময় নিয়ে। খিদে যে পায়নি তা নয়। কিন্তু ইচ্ছে নেই। মনে হচ্ছে খেতে গেলেই উঠে আসবে।
ধোঁয়া-ওঠা মাটন। রুটি বেতের ঝাঁপিতে। একটা দুটো করে সেঁকে দিয়ে যাচ্ছে পূর্ণিমা। আলু-ফুলকপির ডালনা, স্যালাড।
মাটনের বাটি সরিয়ে দেয় সত্যেন, কালকেও খেয়েছিল। গন্ধেই বমি আসছে।
রেজালা করেছে আজকে, সরিয়ে রাখছ যে!
ভালো লাগছে না মণি। আমি যা হয় দিয়ে ঠিক খেয়ে নিচ্ছি প্লিজ ডোন্ট বদার।
খেতে খেতে মণিমালা ডাকল, পূর্ণিমা টি, ভিটা অন করে দিয়ে যাও তো।
একেবারে অন্যমনস্ক ছাঁদে খাচ্ছে সত্যেন। মগ্ন খাওয়ায় ভাবনায়। যেন সে একটা গ্রহে একলা মানুষ। কোথায় কেউ নেই। চারপাশে খালি বাতাস। তা-ও আছে কী?
ও মা, দ্যাখো দ্যাখো, কী ভয়ংকর অ্যাকসিডেন্ট!–ঋতম চেঁচিয়ে বলে।
ওরে বাবা, ঠিক গাইসালের মতো, না?
গতকাল মধ্যরাতে দিল্লি রোড বম্বে রোডের সংযোগস্থলে একটি ট্রাক ও একটি প্রাইভেট কারের মুখোমুখি সংঘর্ষে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রাকটি মোটরগাড়িটির উপর উঠে যায় সংঘাতে। ট্রাকের চালক ও খালাসি মৃত। গাড়িটি একেবারে পিণ্ডাকৃতি হয়ে গেছে। আগুন লাগেনি কেন—সেটাই আশ্চর্য! গাড়ির চালক ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছেন। তাঁকে শনাক্ত করা যায়নি। তবে কোনো কোনো প্রমাণ অনুযায়ী চালক একজন মহিলা।
হৃৎপিণ্ডের ধুক ধুক ধুক…হঠাৎ একটা ফসকে গেল।
দ্যাখো বাবা-দ্যাখো…! মুখ তুলে চায় সত্যেন রক্তহীন, দৃষ্টিহীন।
তদন্ত হচ্ছে। খবর এখনকার মতো শেষ হল। পরবর্তী খবর…
ও কী? উঠে পড়লে!
অনেক কষ্টে নিজেকে সামলায় সত্যেন, অস্পষ্ট স্বরে বলে, হয়ে গেছে। তারপর তাড়াতাড়ি শোবার ঘরের বাথরুমে বেসিনের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে। আজকের রুটি, ফুলকপি, মটরশুটি গোটা গোটা উঠে আসে, তারপর গতকালের মাটন তার শেষবিন্দু পর্যন্ত পাকযন্ত্র আলোড়িত করে উঠে আসতে থাকে। ঝাঁঝরির ওপর তর্জনী দিয়ে সমস্ত ঘষে ঘষে পাতালে পাঠায় সে, খুনি যেভাবে খুনের প্রমাণ লোপ করে, তারপর ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় শুয়ে পড়ে। জ্বর আসছে। ঘনঘটা করে জ্বর আসছে…
কাজকর্ম শেষ। ঋত ঘুমিয়ে পড়েছে। এত বড় হল ছেলে তবু শোবার সময়ে মাকে চাই। হয় মা গল্প বলে, কিংবা ছেলে, কিংবা গল্প হয়…প্রণীত কী বলেছে, ঝুমুরের সঙ্গে চৈতালির কী রকম ঝগড়া হয়ে গেল শুধু শুধু। জানো মা, অভিষেক মোবাইল নিয়ে স্কুলে আসে। আমাকে একটা দেবে?
তুমি তো বুদ্ধিমান ছেলে ঋত? জানো না ক্লাস সিক্সের ছাত্রের মোবাইল কেন, ঘড়ি ব্যবহার করাও ঠিক নয়। দরকারই তো নেই, তুমিই বলো। সারেরা জানতে পারলে বকবেন কিন্তু।
উচিত নয় কেন মা?
অ্যাডাল্টরা যা যা করে মাইনরদের তা তা করতে নেই সব সময়ে। তুমি কি বাবার মতো চাকরি করতে পারবে? সেই জ্ঞান বুদ্ধি এলে তখন…
ঠিক বাবার মতো! ঘুম-ঘুম গলায় বলল ঋত-নীল ইন্ডিকা গাড়ি…ক্রেডিট কার্ড,,,টাকার ব্যাগ…টুর…মা…।
আলতো করে ছেলের মাথায় হাত রাখে মণি-হ্যাঁ। বিচক্ষণ… কাজপাগল…লাভিং অ্যান্ড কেয়ারিং…
সেই একই হাত সত্যেনের গায়ে রেখেছে মণিমালা। জাগাতে নয়, মানুষটা ভীষণ চিন্তিত, সেই চিন্তার ওপর আশ্বাসের হাত। হাতে তাপ উঠে এল। বেশ জ্বর। তাই অখিদে, অনিচ্ছা, খারাপ লাগা, কিছু ভালো না লাগা…বিরক্তি! বেশ করে ঠান্ডা লাগিয়ে এসেছেন।
শুনছ! শুনছ!–ওষুধটা খেয়ে নাও।
লাল চোখ মেলে সত্যেন। কোথায় আছে, কে বলেছে, ঠিক করতে পারছে না।
তোমার খুব জ্বর। এখন দুটো প্যারাসিটামল খেয়ে নাও-মণি এক হাতে তার ঘাড়টা তুলে রেখেছে। আর এক হাতে ট্যাবলেট দিচ্ছে দুটো, জল।–শুয়ে পড়ো।
দুদিন অফিস কামাই হল। মণিমালারও। একটা জ্বররা রোগী, অতি দুর্বল, অতি অস্থির, মাঝে মাঝে এমনকি বিড়বিড় করে বকছেও। ডাক্তার দেখে গেছেন। সাধারণ ঠান্ডা লাগা জ্বর বলেই মনে হচ্ছে, তবে আর একদিন থাকলে রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। কী করে যাবে মণিমালা? সে মেপে ওষুধ দেয়, জ্বর মাপে, স্পঞ্জ করিয়ে দেয়। নাঃ, তৃতীয় দিনে জ্বর ছেড়ে গেছে। সত্যেনকে অফিস যেতেই হবে। দুর্বলতা? তেমন কিছু না। জোরালো সুপাচ্য পথ্য দিয়ে গেছে মণিমালা সমানেই।
অফিসে জ্বরের কথা জানানো হয়েছে, কিন্তু গাড়ি চুরির কথা নয়। সত্যেন একটা নীল মারুতি ভাড়া করেছে হঠাৎ দূর থেকে দেখলে কারও কিছু মনে হবে না। ইনশিয়োরেন্স ক্লেম এখনও পাঠায়নি। কেন? সে জানে না।
আস্তে আস্তে পুরো দমে কাজকর্ম আরম্ভ হয়ে যায়। একটা মেরুন রঙের এস্টিম কিনেছে সত্যেন। স্যাট্রো, জেন, এসব গাড়ির গড়ন একদম পছন্দ করতে পারছে না সে আজকাল। তাই দীর্ঘপুচ্ছ এস্টিম। নতুন টাকা দিয়ে নতুন লোনে। ইনশিয়োরেন্সের টাকাটা পাওয়া গেলে মণি আর ঋতের জন্য সে আর একটা গাড়ি কিনবে। এটা আগেই করা উচিত ছিল। কিন্তু মণিমালা খুব উৎসাহী নয়। তার জন্যে গাড়ি কেনার কথা উঠলেই কথা ঘুরিয়ে ফেলে।
একদিন…মাত্র একদিন বলেছিল—
আমার কেমন…খারাপ লাগে।
কেন?
কী দরকার? এত কাছে স্কুল! ঋতও কী সুন্দর বন্ধুদের সঙ্গে হইচই করতে করতে যায় স্কুল বাসে। বাজার-হাট? বিশেষ দরকার হলে তা তোমার গাড়িই পাই!…
মণি কিন্তু বেশ সম্পন্ন ঘরের মেয়ে। তার বাবা দাদা দু-জনেই ডাক্তার। স্বভাবতই তাদের বাড়িতে দুটো গাড়ি আছে। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে মণিমালা অতিরিক্ত পছন্দ করে না, এবার বোধহয় একটু জোরই করতে হবে।
