এবার সে অনেক সাহস সঞ্চয় করে তালগোল পাকানো অকুস্থলের দিকে যায়। ট্রাকটা যেন দু-পা তুলে আহত ঘোড়ার মতো সামনে লাফিয়ে উঠেছে, ভাঙা দরজা দিয়ে ঝুলছে একটি মৃতদেহ। মুখের জায়গায় একটা মাংসের রক্তাক্ত চাঙড়। অন্ধকারে কালো দেখাচ্ছে। ইন্ডিকাটা ঢুকে গেছে ভেতরে। তার সামনে পেছন বলে আর কিছু নেই। একটা অসমান বিকৃত বস্তুপিণ্ড এবং সেই পিণ্ডের সঙ্গে পিণ্ডাকৃতি হয়ে, শিউরে উঠল সত্যেন, জড়িয়ে গেছে লিজের দেহ। খুব সাবধানে লাইটার জ্বালিয়ে দেখল—ধড় মুণ্ড বলে আলাদা কিছু নেই। বীভৎস! তার ভেতর থেকে প্রবল একটা বমির ভাব উঠে আসছে। কিছু নেই। কিছু অবশিষ্ট নেই। ট্রাঙ্কে তাদের ব্যাগগুলো ছিল। তাদের অস্তিত্বই বুঝতে পারল না সত্যেন। অকুস্থল থেকে সরে এসে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগল সে। বমিটাকে আটকাতে পারল না। ঘাসের ওপর উগরে দিল ভয়, ঘৃণা, তারপর একটু সুস্থ হতেই কী মনে পড়ল—সে নিজের পাশ পকেটে, হিপ পকেটে, বুক পকেটে হাত রাখল। পার্স, পার্স, গোছা গোছা টাকা। ক্রেডিট কার্ড। লাইসেন্স, এমনকি রুমাল সহ সব। পরিষ্কার গুছিয়ে রাখা, যেন পোশাকের সঙ্গে সেলাই করে দিয়েছে কেউ। সমস্ত শরীর কাঁপিয়ে দীর্ঘ দীর্ঘ একটা নিশ্বাস বেরিয়ে এল। ভগবান, ওহ ভগবান, অগতির গতি! অবলের বল হে! একবার লাইটারটা আবার বার করল। জ্বালিয়ে দেবে? নাহ। আগুন এখন বহু দূর থেকে দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, বিস্ফোরণ হতে পারে, বলতে কী সে নিজেও ঝলসে যেতে পারে অল্পবিস্তর। তা ছাড়া খোদার ওপর খোদকারি করার দরকারটাই বা কী! তিনি যখন যেচে পড়ে তাকে এমন রক্ষা করেছেন। যা নিতান্তই দুর্ঘটনা অগ্নিযোগ করলে সেটা প্রমাণ লোপের চেষ্টা বা অপরাধে পরিবর্তিত হবে। সে তো অপরাধী নয়! এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ীও সে নয়। মেজাজে গাড়িটা চালাচ্ছিল সে। দোষ ওই ট্রাক ড্রাইভারের, ব্যাটা মাতাল ছিল। ঘোর মাতাল, পুলিশ ওর পেটে পিপে-ভরতি দেশি পাবে। সে কলকাতা নগরীর দিকে হাঁটা দিল। তার শহর, তার আশ্রয় ও প্রশ্রয়।
স্টেশনের রিটায়ারিং রুম ভাড়া নিয়ে সারাদিন নিজের পরিচর্যা করল সত্যেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল সুটটার কোথাও ফাটা-ফোঁটা হয়েছে কি না। নেই, তা সত্ত্বেও একজন অ্যাটেনড্যান্ট জোগাড় করে সুটটা ইস্ত্রি করিয়ে আনল, জুতো জোড়া পালিশ করাল, কপালের ওপরটা ভালো ছড়েছে। একবার ভাবল পট্টি লাগাবে। তারপর ভাবল সেক্ষেত্রে কৈফিয়ত দিতে হবে, তারপর ভাবল পট্টি না লাগালেও কৈফিয়ত অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং সে হাতে ও কপালে পট্টি লাগাল। চানটান করে ভালো করে ব্রেকফাস্ট করল, প্রেস করা সুটটা পরল, একটা ট্যাক্সি নিয়ে থানায় গেল, বালিগঞ্জ থানা, নিজের গাড়িটা মিসিং ডায়েরি করাল, তারপর দোকানে গিয়ে অবিকল আগেরটার মতো একটা টাই কিনে পরল, অবিকল আগেরটার মতো ওভারনাইট ব্যাগ। যে রকম দুটো স্টোনওয়াশ জিনস, নাইট-সুট ও টি-শার্ট নিয়ে গিয়েছিল সেগুলো কিনে ব্যাগটা ভরতি করে ফেলল। কটেজ ইন্ডাস্ট্রির দোকানে গিয়ে একটা শ্রীনিকেতনী লেডিজ ব্যাগ কিনে ফেলল। যেখানেই যায় মণির জন্য সে কিছু-না-কিছু উপহার আনে। তারপর বাড়ি ফিরে এল, পূর্ণদাস রোডে তার চমৎকার ফ্ল্যাট, যাকে বাড়ি বলাই যায়।
এখন মণি থাকবে না, সে স্কুলে গেছে। নার্সারি অ্যান্ড কিন্ডারগার্টেন। সাতটায় বেরোয়, দেড়টা-দুটোয় ফেরে। আর ঋত, ঋতম? সে-ও এখন স্কুলে। ঢোকবার আগে একটা কোচিং নিয়ে ঢোকে। কোন ভোরে তার মা উঠে তাকে ব্রেকফাস্ট করে দেয়। বেশ ভারী। তারপর টিফিনবাক্স ভরে দেয়। ফলটল বা কোনো মুখরোচক জাঙ্ক ফুড খেতে হলে টাকাপয়সা থাকে পকেটে। মণিমালার জেদ ঋতমকে তার বাবার মতো হতে হবে, যদি না তার চেয়েও বড়ো হয়।
চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলল সত্যেন। সত্যেন ও মণিমালা দুটো নামই পুরনো ধরনের বলে তাদের দরজায় লেখা আছে এস চ্যাটার্জি, এম, চ্যাটার্জি, ঋতম চ্যাটার্জি। এই এস এম ঋতমের মধ্যে দিয়ে সত্যেন চ্যাটার্জি তার আইডেনটিটি কার্ডের মধ্যে ঢুকে গেল। ছবি হ্যান্ডসাম, বয়স–চ্ছ, ঠিকানা প্রারম্ভিকা ২৫ পূর্ণদাস রোড, কলকাতা…। পেশা-সার্ভিস, অ্যাসোসিয়েট ম্যানেজার এফ আর ইন্ডাস্ট্রিজ, ফোন…। মাঠের মতো লিভিংরুমের নিবিড় কার্পেটের ওপর শব্দহীন মার্জার চরণে সে শোবার ঘরের আয়ত আলস্যের মধ্যে এসে পৌঁছোল। প্রশস্ত ডবল বেডের পুষ্পিত আবরণী তাকে স্বাগত জানাচ্ছে, স্বাগত জানাচ্ছে দেয়াল থেকে হাস্যমুখ ফ্যামিলি অ্যালবাম। সত্যেন-মণি, মণি-সত্যেন, সত্যেন-মণি-ঋতম, মণি-ঋতম, সত্যেন-ঋতম হাস্যমুখ। বাপের হাসিতে সংযত আহ্বাদ, মা গরবিনি, পুত্র স্বাভাবিক শিশু-বালক হাসিতে স্নেহ-সুখ-জাগানিয়া। এ ছাড়াও আছে, বাঙ্গালোরে ম্যানেজমেন্ট স্নাতক যুবক সত্যেন সবান্ধব। তীক্ষ্ণ চোখ-মুখ, মুখটি দুধ দিয়ে ধোয়া। সদ্য-বিবাহিত দম্পতি, স্টুডিয়োয় ভোলা বিজ্ঞাপন ফটো, নতুন ফ্ল্যাট প্রবেশ, সাদা গরদের ধুতি চাদর, লালপাড় গরদের শাড়ি, কোলে ক্রন্দনরত ঋতম। সে নতুন ফ্ল্যাটে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে। সিল্ক দেওয়াল, দাবাবোর্ড মেঝে, ঢাকনা দেওয়া ঘোমটা আলো, আসবাবের তনিমা, ইলেকট্রনিক্সের গ্ল্যামার কিছুই তার ভয় কাটাতে পারছে না। স্বাভাবিক শিশু-বিস্ময় জাগাতে পারছে না। সে বোধহয় ফিরে যেতে চায় সেই বউবাজারি দোতলার তুতো ভিড়ে, যেখান থেকে কনিষ্ঠতম শরিক সত্যেন চ্যাটার্জি নিজের অংশের তোয়াক্কা না করে সমাতৃক, সপত্নীক, সপুত্ৰক বেরিয়ে এসেছিল। এরকম হয়। বাচ্চাদের নতুন পরিবেশ অ নিরাপদ মনে হয়। মানিয়ে নিতে সময় লাগে। সেই মানিয়ে নেওয়ার ছবিও ঝুলছে দেয়ালে। ঠাকুমার কোলে নিদন্ত-হাসি ঋতম। পরম নিশ্চিন্ত, ঠিক যেমন এই ফ্ল্যাটটার কোলে এখন সত্যেন চ্যাটার্জি। অ্যাসোসিয়েট ম্যানেজার এফ আর ইন্ডাস্ট্রিজ। স্মার্ট গাই। সহকর্মীরা ঈষৎ বক্রোক্তির সঙ্গে ঈষৎ বাহবা মিশিয়ে বলে থাকে, চ্যাটার্জি ইজ আ স্মার্ট গাই।
