উপমন্যু যখন শোনে তার পত্নীর প্রসবক্লান্তি কেটে গেছে তখন সে কেবিনে যায়। অস্বস্তিতে নাড়াচাড়া করে উপহারের রজনিগন্ধা। তারপর নীচু হয়ে স্ত্রীর চোখে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি রাখে। কঠিন অনন্য স্বরে এতদিনের পুষে রাখা প্রশ্নটি করে, কে বাবা? বাচ্চাটার?
চমকে ওঠে রিনা, কিন্তু পরক্ষণেই সরিয়ে নেয় শিশুটির জাতবস্ত্রের ঘোমটা, আর সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর চোখে লাফিয়ে ওঠে নির্ভুল প্রতিবিম্ব, তার নিজের।
জিজ্ঞাসা-মুছে-যাওয়া বোকা-বনে-যাওয়া সেই মুখের দিকে ক্লান্ত চোখে তাকায় রিনা, ফুঁপিয়ে উঠে বলে, কে আর? এক মিথ্যে-মিথ্যে-মিথ্যে-উপমন্যু– এমন করে বলে যেন একই সঙ্গে তার পুত্রলাভ ও পতিবিয়োগ হল।
স্মার্ট গাই
চোখ মেলে সত্যেন চ্যাটার্জি চারদিকে ঘন অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না। দুর্ভেদ্য, নিচ্ছিদ্র অন্ধকার।
প্রথমে মনে হয়েছিল মাঝরাতে ঘুম ভেঙেছে। কিন্তু শহরের মাঝরাত, সুখী গৃহকোণের মাঝরাতেও তো এমন অন্ধকার হয় না! ঘরে মৃদু নীল, রাস্তা থেকে রক্ষী আলো। পাশে একটা ঘুমন্ত, নিশ্চিন্ত মানবশরীরের নরম উষ্ণতা, যা এক রকমের আলোই। এখানে ঠান্ডা, জলে-জলে ভিজে ভিজে ভাব চারদিকে এবং…এবং… অন্ধকার…ত্রিলোক অন্ধ করা। আরে! এ তো তবে মৃত্যুর পরবর্তী অন্ধকার! নরকের! কেননা সে তো একটা মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল! বাঁচার কথা নয়! সে মানবলীলা সংবরণ করেছে। দপ করে মনে পড়ল গর্জমান সাইক্লপস-চোখ। বিকট বিধবংসী আওয়াজ আর তারপর অন্ধ তমস। গা হিম করা ভয়ে চোখ বুজল সে। মরলে তবে মানুষ প্রথম এই অন্ধকারে আসে? তারপর? তারপর কী ভাবতে গিয়ে গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল তার। কীসের লোম? গায়ের? গা কোথায়? কেন? কী করে? তখন সে বুঝল, কপালজোরে যে গুটিকতক লোক মরিয়াও মরে না সে সেই বিরল প্রজাতির। সে মরে নাই।
আকাশে ছিন্ন কাঁথার মধ্যে দিয়ে মলিন আলল। চোখ-সওয়া হয়ে যাচ্ছে অন্ধকার। ওই তো মরণ আলিঙ্গনে পরস্পরকে আঁকড়ে ধসে রয়েছে দানব ট্রাক আর তার নীল ইন্ডিকা। ট্রাকটার পশ্চাদ্দেশ মোটামুটি অক্ষত, কিন্তু নীল ইন্ডিকাখানা ট্রাকের দুমড়ানো সম্মুখভাগের তলায় ঢুকে গেছে। একেবারে পিণ্ডাকৃতি। আসলে সে ড্রাইভারের সিট থেকে ছিটকে পড়েছিল। কী করে সে জানে না। ডানদিকের দরজাটা কিছুদিন থেকেই একটু গোলমাল করছিল। গ্যাসকেট-ফ্যাসকেটের ব্যাপার আর কী? গারাজে যায যাব করে যাওয়া হচ্ছিল না, এত্তো বিজি শিডিউল…যাব যাব করে…সেই আলগা দরজাই তাকে বাঁচিয়েছে। কে বাঁচাল? আলগা দরজা? না সাত রতির রক্তপ্রবাল প্লাস তিন রতির নীলা? না কি? সে হাত জোড় করে আকাশের দিকে তাকায়—হে জগদীশ্বর, আর কেউ নয়, তুমি…তুমিই বাঁচিয়েছ। আমার ওপর তোমার অনিঃশেষ করুণা হে বিধাতা! তার চোখ দিয়ে গরম জল বেরিয়ে এল।
দিল্লি রোড বম্বে রোড যেখানটায় বিভক্ত হয়ে গেছে সেই মোড়টার কাছাকাছি ঘটেছিল দুর্ঘটনাটা। তারা ফিরছিল। লিজি আর সে। ভোরবেলা পৌঁছে একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়েই আবার অফিস ছুটতে হবে। সারা সপ্তাহের নিচ্ছিদ্র খাটুনির পর এইসব বিনোদন। তার আলসে-মেজাজ আর তারপর ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে উল্লসিত উত্তেজনাময় ড্রাইভিং। সত্তর…আশি…আশি ছাড়াচ্ছে…নব্বই…। লিজ বলছে আরও জোরে। যেন মিলনমুহূর্তের তুঙ্গ শীৎকারে, সমস্ত শরীরে চারিয়ে যায় উন্মাদনা। অদূরে সাইক্লপস চোখ হঠাৎ…গাঁ গাঁ, প্রাণপণে গাড়ি ডাইনে ঘোরাবার চেষ্টা। বিকট আওয়াজ। অন্ধকার।
আস্তে আস্তে হামাগুড়ি দিয়ে নিজের শারীরিক অবস্থাটাকে বুঝে নিয়ে টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল সে। সারা শরীরে ব্যথা। কিন্তু সেরকম যন্ত্রণা নেই। হাড় ভাঙেনি। গরম সুটের দৌলতে শরীরটা সুরক্ষিত। কপালের ওপর একটা জায়গা জ্বালা করছে, হাতের পাতায়ও। বোধ হয় ভালোই ছড়েছে, উঠে দাঁড়িয়ে কোট থেকে ধুলো ঝাড়তে লাগল সে, পড়েছে একটা ঘেসো মাঠে। হাইওয়ের পাশে এরকম থাকে আকছার। কে জানত সেসব আয়োজন সত্যেন চ্যাটার্জির প্রাণ বাঁচানোর জন্য? কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে ঘাসভূমিকে চুম্বন দেয় চ্যাটার্জি। ক্রিকেটার ফুটবলাররা ম্যাচ জিতে যে-রকম দেয়। হাঁটুতে বেশ আড়ষ্ট ব্যথা লাগল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল সত্যেন, ঘটনার জন্য, দুর্ঘটনার জন্য, লাভ লোকসানের অনুপাত কষে নেওয়া এক সুখ-দুঃখে মিশ্রিত পবিত্র কান্না। এবং, আর একটু পরে মাঠ পার হয়ে সাবধানে রাস্তার দিকে এগোতে থাকল সে।
আশ্চর্য! এ রাস্তা দিয়ে এখন তো মিনিটে মিনিটে ট্রাক যায়! একটাও?…নাঃ আসছে একটা, চোখে আলো পড়তেই হাত তুলতে গিয়েছিল, পরক্ষণেই আতঙ্কে মুখ ঢাকল সত্যেন। কী সর্বনাশ! সাহায্য কী? এখন সাহায্যের মানে কী?
ট্রাকটা চলে গেল প্রচণ্ড বেগে। কী একটা খড়মড়ে জিনিস উলটেপালটে ভাঙছে। তার চাকায়। ভ্রূক্ষেপও করল না। মত্ত ড্রাইভার, ঘোরে আছে। চাঁদ পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছে এবার। সেই আলোয় সত্যেন আশ্চর্য হয়ে দেখল তারই গাড়ির নাম্বারপ্লেট, তিন-চার টুকরোয় ভাঙা, কিন্তু…তার পায়ের কাছে তারই গাড়ির আইডেনটিটি পৌঁছে দিয়ে গেছে মত্ত ট্রাক, কিংবা ট্রাক নয়…আসলে সেই সর্বশক্তি যিনি মারেন, বাঁচান। জল-উপছোনো চোখে সে ত্বরিয়ে লে নিল টুকরোগুলোকে, একটার পর একটা তাসের মতো সাজাল। অদূরে একটা লম্বা জলাশয় চিকচিক করছে, গলা থেকে টাইটা খুলে নিয়ে টুকরোগুলোকে পরম যত্নে বাঁধল সে, সঙ্গে বাঁধল একটা বড়োসড়ো পাথরের টুকরো। সব তার জন্য এই মধ্যরাতের বধ্যভূমিতে সাজিয়ে রেখেছেন তিনি। আকাশের দিকে তাকাল একবার। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি জড়ো করে জিনিসটা মাঝপুকুরে ছুঁড়ে দিল। যেমন করে চাকার বল ছোড়ে। ধুপপপ চমৎকারভাবে ডুবে গেল আইডেনটিটি।
