বারীন, প্লিজ, তোর কলেজে সকাল সকাল ছুটিও তো হয়, একটু আমার বাড়িটা ঘুরে যাস।
সে আবার কী? দুপুরবেলা তুই কোথায়?
আমি না-ই থাকলাম, ও তো থাকে?
ও কে? তোর স্ত্রী? রিনা?
হ্যাঁ।
তা আমি হঠাৎ তোর অনুপস্থিতিতে তোর শ্রীমতীর কাছে যেতে যাব কেন? আচ্ছা পাগল তো!
না, মানে এই, অনেকক্ষণ একা থাকে তো! বুঝতেই পারছিস একেবারে যুবতি মেয়ে…একলা।
পাহারা দিতে পাঠাচ্ছিস?
বলতে পারিস।
ব্যাপারটা ঠিক কী বল তো?
না মানে, ওকে আজকাল কেমন কেমন লাগে, যেন মনে হয় ওর লাইফে অন্য কেউ, মানে অন্য কারও প্রবেশ ঘটেছে।
তাই বলো। টিকটিকি লাগাচ্ছ আমাকে। তারপরে আমাকেই সন্দেহ শুরু করবে। মাফ করতে হল ভাই, এসব গোলমেলে ব্যাপারে আমি নেই। তা ছাড়া, রিনাই বা কী মনে করবে তোর অ্যাবসেন্সে গেলে?
কথাটা সত্যি।
তবু বন্ধুর পীড়াপীড়িতে রাজি হয়ে যায় বারীন।
ভর দুপুরবেলা রিনায় বেল বেজে ওঠে কুব-কুব-কুব-কুব। খুলে আরে আপনি? কী ব্যাপার?—আলুথালু রিনা বলে ওঠে।
আর বলবেন না, সাংঘাতিক জ্যাম। এক ঘন্টা বাসে বসে বসে তিতিবিরক্ত হয়ে ঘেমে-নেয়ে নেমে পড়লাম, কোথায় একটু কাটিয়ে যাই ভাবতে ভাবতে উপমন্যুর কথা মনে পড়ল। প্রচণ্ড তেষ্টা পেয়েছে কিন্তু। এক গ্লাস ঠান্ডা জল খাওয়াবেন?
কী আশ্চর্য বসুন বসুন।-পাখা চালিয়ে দেয় রিনা।
ঠান্ডা জল আনে, চা করবে কি না জিজ্ঞেস করে, মিষ্টান্ন বার করে। তারপর বারীনের আপত্তিতে আবার ঢুকিয়ে রাখে। কিছুক্ষণ গল্প করে তারপর বারীনও কথা খুঁজে পায় না, রিনাও না। বারীন বলে, দেখি, জ্যামটা ছাড়ল কি না।
না রে উপমন্যু, ঠিক দুম্বুরবেলা গেলাম, এক্কেবারে দি টাইম ফর দি অ্যারাইভ্যাল অফ পরকীয়, তো পৌনে দু ঘন্টা ছিলাম, কেউ এল না তো, তোর বউকে দেখেও মনে হল না কারও প্রতীক্ষা করছে। খুব সভ্য, ভদ্র বউ তোর, যাই বলিস।
বন্ধুর প্রশংসায় খুশিও হয় উপমুনু, আবার কোথায় যেন একটু আহতও হয়। বলে, এ উপকারটা কর প্লিজ, একটু লেগে থাক।
আর একবার গেলে কিন্তু ও আমার সম্পর্কে খুব খারাপ কিছু ভাববে।
রিনা কিন্তু কিছুই ভাবল না। কারণ বারীনের বেচারি-বেচারি অপ্রস্তুত-অপ্রস্তুত বিরস মুখখানা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল সে উপবোধে চেঁকি গিলছে। খুবই অস্বস্তিতে আছে।
আজকেও জ্যাম তো?—রিনা হাসিমুখে বলল, অর্থাৎ ছুতোটা ও-ই জুগিয়ে দিল।
অসুবিধেয় পড়লে চলে আসবেন বইকি ক–জল এল, শরবত এল। বিকেল গড়াতে চা এল, সঙ্গে ডালমুট, রসগোল্লা, সয়াবিনের ঘুগনি…
তৃতীয় দিন জল শরবত এসব সরবরাহ করে রিনা বলল, আপনার জন্যে কতকগুলো পত্রিকা এনেছি, যদি আমি ভেতরে একটু বিশ্রাম করি গিয়ে, কিছু মনে করবেন?—সে হাতের পাতা দিয়ে একটা হাই আড়াল করল।
চতুর্থ দিন হাজার কাকুতি-মিনতি করেও উপমনু বারীনকে আর পাঠাতে পারল। তবু তো সন্ধেবেলার বাড়ি ফিরে বারীন বিষয়ে রিনার মন্তব্যগুলি শোনায়নি। আজ দুপুরে হঠাৎ তোমার বন্ধু বারীনবাবু এসেছিলেন। নাকি ট্রাফিক জ্যামে আটকে হাঁফ ধরছিল।
একটু চুপ। তারপরে, তাই ভদ্রলোক আমাদের বসার ঘরটা জ্যাম করে দিয়ে গেলেন। হাঁফও ধরালেন ফাউ হিসেবে।
কেন? তোমার কি কেউ আসার ছিল? উপমন্যুর ধারালো প্রশ্ন।
আসবার আর কে থাকবে ভুবন ছাড়া? তা ভুবন তো আর বসবার ঘরে বসে, বসে কলতলায়। বাসনের পাঁজা নিয়ে।
আজ না তোমার বারীন-বন্ধু আবার এসেছিলেন। অনেকক্ষণ গল্প হল, জানো? তুমি ওঁর থেকে নাকি অঙ্ক টুকেছিলে স্কুলে পড়তে, এ মা! তুমি টুকলি?
উঃ আবার বারীন, বুঝলে? তোমার বন্ধুর কি আমাকে মনে ধরল না কি বলো তো! নিজে ঘরে বউ আনলেই তো পারেন, পরের বউয়ের কাছে ঘুরঘুর কেন?
ছি, ছি। বারীন আমার ছোট্টবেলার বন্ধু তা জানো?
ছোট্টবেলার বন্ধুরাই বন্ধুদের বউ নিয়ে বেশি হ্যাংলামি করে।
ইস, নিজেকে ভাবো কি?
কী আবার ভাবব, আমি যা তা-ই। স্রেফ একজন পরের বউ!
এ হেন প্রতিক্রিয়ার পর বাল্যবন্ধুকে টিকটিকিগিরি করতে পাঠানোটা ঠিক বন্ধুজনোচিত কাজ বলে মনে হয় না।
তখন উপমন্যু নিজেই হঠাৎ ভীষণ শরীর-খারাপের অজুহাতে দুপুর আড়াইটের সময় বাড়ি ফেরে। দরজা খুলে দেয় হারুর মা, বলে ভালোই হয়েছে বাবু আপনি এসে গেছেন, বউদি ভীষণ বমি করতেছে। খাচ্ছে উগরে দিচ্ছে, যা খাচ্ছে উগরে দিচ্ছে।
সে কী? কখন থেকে?
কখন মানে? কদিন থেকেই এমন করেতেছে। ধুন্ধুমার বমি।
কী খেয়েছিল? ফুচকা-টুচকা? আলু-কাবলি?
কই, আমি তো দেখিনি বাপু। দেখো এখন ঘরে যাও।
রিনার চোখের কোলে গভীর কালি। যেমন শীর্ণ দেখাচ্ছে। বুকের সামনের কাপড় ভিজে টুসটুস করছে।
কী ব্যাপার তুমি?
তোমারই বা কী ব্যাপার?
বিকেল হতে না-হতেই ডাক্তার মিসেস কারনানি। বললেন, ওহ, অ্যাট লং লং লাস্ট, মি. দত্ত আপনার একটা ছোট্ট অণু পরিমাণ স্পার্ম প্রচণ্ড ফাইট করে তার কাজটি করতে সফল হয়েছে। এখন সাবধান। বিয়ের অনেকদিন পরের কনসেপশন তো!
কালিপড়া চোখ, কিন্তু উদ্ভাসিত, যেন রাজ্যজয় করেছে। উপমন্যু আড়ে আড়ে দেখে। তার বুকের ভেতর পাথর। পাথরগুলোকে ডিনামাইট বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেওয়া দরকার। কিন্তু সে পারছে না, কিছুতেই পারছে না।
অবশেষে যথাসময়ে একটি সুস্থ, সবল আট পাউন্ডের পুত্রসন্তান প্রসব করে রিনা। কোনো জটিলতা নেই। খুব সহজ নির্গমন। আজকাল চট করে এমনটা দেখাই যায় না। বিশেষ করে এত পরের জাতক। বাচ্চাটার কান্নাটাও অদ্ভুত! যেন কাঁদছে না। গমক দিয়ে দিয়ে হাসছে।
