তা হলে শো-কেসে কোনগুলো যায় শুনি?
শো-কেসেরগুলো বিককিরির না, ওগুলো বিজ্ঞাপন, তা তুমি যদি বলো তো ফিরিয়ে নিয়ে যাই। বেগনি অর্কিডের ফুল দেখেই তোমার খিদে মিটুক।
ইসস ঠোঙাটা দেখি একবার, গরম আছে কি না।
তেলেভাজার সঙ্গে চা-টাই জমে। কিন্তু তৈরি করতে একটু দেরি লাগবে, একটু হাঙ্গামা বলে-কফির জেদই ধরবে ও। এমন করবে যেন কফির জন্যে প্রাণটা কাতরাচ্ছে ওর। কফি ছাড়া অন্য কোনো পানীয় যেন ওর চলে না।
তুলনা করছে না রিনা, কিন্তু উপমন্যু? উপমন্যুকে কিছু তৈরি করে দিতেও ভেতরটা ভয়ে ঢিপঢিপ করে, কিংবা বিরক্তিতে গা-টা কিসকিস করতে থাকে।
চা-টা কে করেছে?
আমি, কেন?
চিনি নেই।
রুটিটা কে সেঁকেছে?
আমি। আবার কে?
চামড়া।
আলুর দমটা কে বেঁধেছে?
কেন?
নুন বেশি। আলু আর একটু সেদ্ধ হত।
কোনো হোটেলে ফুড-টেস্টারের চাকরি নিক না তার চেয়ে। প্রতিটি খুঁটিনাটিতে এত খুঁত ধরবার বাতিক যদি! এতই কি খারাপ রান্না করে রিনা? ধরে বেঁধে কোনোদিন রান্না শেখেনি হয়তো। কিন্তু দেখে দেখে শুনে শুনে শেখাও তো শেখা! ভয়ের চোটে না চেখে রান্না নামাতেই পারে না রিনা। চেখে মনে হয় এই রে নুনটা একটু বেশি হয়ে গেছে, ঝপ করে একটু চিনি দিয়ে দেয়, আবার চাখে, এই রে মিষ্টি একটু বেশি হয়ে গেল, দে একটু জল ঢেলে, যা পাতলা হয়ে গেল ঝোলটা, শেষে একটু ময়দাগোলা, একটু ঘি, একটু গরমমশলা দিয়ে গলদঘর্ম হয়ে যে জিনিসটা নামায় সেটাকে যদি উপীন যাচ্ছেতাই একটা নামে ডাকে, তাকে দোষ দেওয়াও যায় না। ভয়, আসল কথা, স্নায়বিক ভয় একটা কাজ করে তার কাজকর্মের পেছনে। অথচ ভয় পাওয়ার তো কথা নয়, টানা তিন বছর পরিচয়ের পরেই তো বিয়ে হয়েছে তাদের। তখন তো মনে হয়নি এমনি ভয় হবে। তা ছাড়া এমনি এমনি যখন সে নিজের ভালো লাগায় শখে কিছু রান্না করে, ছোলার ঘুগনি, কি বাঁধাকপির কোফতা, দিব্যি তো হয় জিনিসগুলো।
তুমি করেছ? দারুণ! ও তো বলে।
আমি করেছি বলেই দারুণ নাকি?
আরে আমি তো ভাবতেই পারিনি তুমি করেছ।
আমার বাড়িতে আমি করব না তো কি বড়ো হোটেলের শেফ এসে করে যাবে?
তা কেন? ওই সব হারুর মা নাড়র মা থাকে না? ভাবলাম হয়তো তেমনই কেউ… তা সে যে-ই করুক, ফ্যান্টাস্টিক হয়েছে। আর একটা দেখি।
আর একটা আর একটা করতে করতে দুজনে মিলে সব সাবাড়। ফুড টেস্টার মশাইকে দিয়ে আর যাচিয়ে নেওয়া হয় না জিনিসটা সত্যি সত্যি উতরোলো কি না।
পয়লা এপ্রিল যে রিনার জন্মদিন সেটা ও ছাড়া পৃথিবীর আর সবাই ভুলে মেরে দিয়েছে। সেই কবে মা জন্মদিনে ঠাকুরবাড়ি পুজো পাঠাত আর পায়েস রাঁধত। একবার সাত-আটজন বন্ধুকে শখ করে নেমতন্ন করেছিল সে, মাকে কত সাধাসাধি করে। ভালো ভালো রান্না হল, দোকান থেকে কেক-টেকও এল, আইসক্রিম পিঙ্ক নতুন ফ্রক পরে রিনাও রেডি। হায় রাম। একটা বন্ধুও এল না। মা তো রেগে লাল। ভালো করে বলতে পারিসনি, আমাকে নাহক এত খাটালি, এত্ত খাবারদাবার, কী হবে এখন? তার যে অপমানে অনাদরে চোখ ফেটে জল এসে গেছে সে খোয়াল মায়ের নেই। পরদিন স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করতে গিয়ে আর এক ফ্যাসাদ।—সে কি রে? আমরা ভেবেছিলাম এপ্রিলফুল করছিস। সত্যি-সত্যি তোর জন্মদিন পয়লা এপ্রিল। সত্যি-সত্যি নেমতন্ন করেছিলি? এ মা! ভাগ্যিস।
ভাগ্যিস কেন? না আটজনে মিলে ঠিক করেছিল একটা টুপি পাঠাবে। ফুলস ক্যাপ আর কি। তা শেষ পর্যন্ত সেটা হয়ে ওঠেনি। এমন বিদঘুঁটে জন্মদিন কে মনে রাখে!
কিন্তু একজন, সেই একজন ঠিক সেই মভ রঙের চমৎকার সিল্কের শাড়ি নিয়ে এসেছে! জন্মদিন তো তবু একরকম। বিবাহবার্ষিকীতেও মনে করে এক গোছা লম্বা লম্বা ফুল, আর সেই চমক্কার জয়পুরি মিনের গয়না নিয়ে এসেছে। ঠিক ওই গয়না, ওই শাড়িই রিনার সাংঘাতিক পছন্দ ছিল। উপমন্যুর এক বন্ধুর বিয়েতে উপহার কিনতে গিয়ে দেখেছিল। এক এক সময়ে এমন হয় না, যে মনে হয় ওই জিনিসটা না পেলে মরে যাব, জীবন বিস্বাদ হয়ে যাবে? এ সেই রকম চাওয়া। কিন্তু মুখ ফুটে উপমন্যুকে বলতে ইচ্ছে হয়নি। ওর টাকা ওর রোজগার ওর হিসেব। আর ওর খেয়াল—ও-ই বুঝুক।
উপমন্যুকে বলা হয়নি, কিন্তু ওকে কি বলা হয়েছিল? রিনার মনে নেই। কত কথাই তো গলগল করে বলা যায়। হিসেব থাকে কি? কিন্তু বিবাহবার্ষিকীর উপহার নিয়ে রিনা খুবই রাগারাগি করেছিল। এমন করছ যেন বিয়েটা তোমার সঙ্গেই হয়েছে–মুখটা বেচারির একটু ম্লান হয়ে গেল, কিন্তু হারবার পাত্র তো নয়, অমনি ঝলমল করে বলে উঠল, আমার না হোক তোমার তো বটে! আর বিয়ে একটা আনন্দের, একটু বেশ শুভ ব্যাপার! উপহার দিতে ইচ্ছে হল, চোখ চকচক, ঠোঁট তুলতুল দেখতে ইচ্ছে হল।
বলল আর রিনা অমনি গলে জল হয়ে গেল।
হারুর মা, কেউ কি এসেছিল, আজ দুপুরে?—উপমুন্যর ভাবটা যেন এই হঠাৎ কথাটা মনে হয়েছে তাই এমনিই জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু ভেতরটা তার উৎকর্ণ উদগ্রীব হয়ে আছে।
হারুর মা-ও তেমন, হেঁকে বলল অ বউদি দুপুরে কেউ এয়েছিল নাকি? বাবুর দিকে ফিরে বলল, আমার তো পেটে ভাত পড়লেই ঘুম ধরে গো বাবু।
আচ্ছা, আচ্ছা, হয়েছে- বিরক্ত গলায় বাবু বলেন।
অবশেষে নিজেরই এক বন্ধুকে কাকুতি-মিনতি করে উপমন্যু। কিন্তু কিন্তু করে বলেই ফেলে। খুব ছোটো লাগে নিজেকে। কিন্তু কি করা যাবে, এ যে প্রাণের দায়।
