হঠাৎ কয়েকটা লাল গোলাপ ঝলসে ওঠে ওর হাতে।
দ্যাখো তো এগুলো ম্যাচ করে কি না!
গোলাপের আরক্ত সংরাগ ওর হাত থেকে তার হাতে, ক্রমে তার সর্বাঙ্গে চারিয়ে যাচ্ছে বুঝে রিনা কাছে, ওর আরও—আরও কাছে চলে যেতে থাকে। ঘন, আরও ঘন হয়ে যায় দুজনে।
ধরা গলায় রিনা বলে, ছাড়ো, এবার ছাড়ো৷
মনে আছে সেই সব দিন? রিনঠিন রিনরিন দিন? যখন কলেজের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে তুমি আর ডাক্তারদের চেম্বার পালিয়ে আমি…মনে আছে সেই রোদের গন্ধ, বাতাসের রং, ভিক্টোরিয়ার পুকুরের সেই যমুনা-যমুনা জল?
রিনা মন্ত্রমুগ্ধর মতো বলল, মনে আছে সেই অনন্ত চিনেবাদাম, আইসক্রিমের সেই ক্ষণ-মধুর, উট্রামের গোলঘরের সেই মহাকাশ? মনে আছে?
আর ঘাসের তবকে মোড়া মাঠের উষ্ণতা, মেঘের তবকে মোটা দুপুরের দুপুরালি! হিমের তবকে মোড়া…
রিনা দেখল, ওর চোখ চকচক করেছ। ওরা পুরুষ, কখনও কাঁদে না, ওদের। নাকি কাঁদতে নেই। কিন্তু সে তো মেয়ে, নেহাতই মেয়ে, তাই তার চোখ উপচোচ্ছে। উপচোতে দিল সে। আর তখনই এল সেই চুমো যা সকাল থেকে সে নিজেকে নিজে দিতে চাইছিল, ব্যর্থ হচ্ছিল বারবার। জলের ফোঁটাগুলো গাল বেয়ে নেমে এসে ঠিক যেখান থেকে গালের কিনার বেয়ে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই কিনারে, এ কিনার থেকে ও কিনারে চোখের পাতায়, কানের লতিতে, তারপর? তারপর ঠোঁটের কূল থেকে মুখের গভীরে ক্রমশ প্রবিষ্ট হয়ে যেতে থাকে…ক্রমশই।
শেষ বিকেলে সমস্ত প্রকৃতি আবির মাখে। ছাতে না উঠলে প্রকৃতি দেখা যায় না এখানে। কিন্তু কেমন করে যেন তার নজরে একটা টেলিস্কোপ, পেরিস্কোপ জাতীয় কিছু এসে যায়। সে দেখতে পায়। ওপরে এবং নীচে সব। গোটা পরিপার্শ্বই যদি হোলির রঙ্গভূমি হয়ে যায় তো না দেখে উপায়?
আসলে প্রেমই আমাদের দিয়ে যায় অন্য ধরনের সুস্বাস্থ্য, যাতে করে শরীরটা থাকে সতর্ক, সব সময়ে চনমনে, প্রেম আরও দেয় এক অদ্ভুত অভিনিবেশ। গোটা পৃথিবীর অন্তর্নিহিত খেলাটা পরিষ্কার বোঝা যায় যেন। হঠাৎ যেন একটা শক্ত পাটিগণিতের অঙ্ক সোজা হয়ে গেল। বেশ হেসে হেসে ভালোবেসে বেসে সেইসব প্রতিদিনের কর্তব্যকাজগুলো করতে থাকে রিনা যেগুলো ভূতুড়ে রকমের বিশ্রী লাগত আগে। যেমন বালিশের ওয়াড় পরানো, মশলাপাতির কৌটো পরিষ্কার করা, ন্যাতা ফুটিয়ে কাপ, অ্যাশট্রে পরিষ্কার করা…এবং এবং এবং।
হঠাৎ টিপ পরেছ যে? বাঁকা চোখে উপীন।
হঠাৎ এ সময়ে এত সাজ? ভুরু কুঁচকে উপীন।
আশ্চর্য! টিপ না পরাটা কোনোদিন চোখে পড়েনি। পরাটাই চোখ পড়ল। টিপ? কপালে হাত চলে যায়। তাই তো! টিপই তো! কালচে ম্যাজেন্টা রঙের একটা টিপ! ঠিক আছে, টিপ লাগিয়েছি। কিন্তু সাজ? সাজ কই? সেই একই কলকা ছাপের সুতির শাড়ি। সেই একই ব্লাউজও সামান্য একটু মাড় পড়েছে কী? ইস্ত্রি চলেছে।? হবেও বা। অন্য মনেই এসব করে গেছে রিনা। তবে এগুলো কিছু না। আসলে ভালোলাগার রং লেগেছে গায়ে হোলির সন্ধেবেলার আবিরের মতো। খুশির প্রসাধনীতে মুখ-হাতের চামড়া মসৃণ হয়ে উঠেছে। ওসব শাড়ি-টাড়ি টিপ-ফিপ কিছু নয়।
কেউ কি এসেছিল?—কেমন একটা সন্দেহের ছোঁয়া উপীনের গলায়।
কে এসেছিল আজ?—ক্রমশ আরও জোরালো আরও নিশ্চিত হতে থাকে প্রশ্ন।
কে আবার আসবে?
না। তাই জিজ্ঞেস করছি। ঠিক যেন মনে হল আমি ঢুকবার দু-মিনিট আগেও কেউ ছিল। কেউ এসেছিল।
অনেক কথা বলে ফেলেছে। চটপট সে মোজা ছাড়ায় পা থেকে। জুতোর মধ্যে ঢোকায় মোজাগুলো, বাড়ির চটিতে সন্তর্পণে পা গলায়, তারপর কুকুরের মতো হাওয়ায় নাক ঢুকিয়ে ফোঁস ফোঁস করতে করতে শোবার ঘরে চলে যায়।
চা করতে করতে হেসে ফেলে রিনা। টের পেয়েছে ঠিকই। কিন্তু যার জন্য নাক ফোঁস ফোঁস করা সেই কাটালিচাঁপা যে তার বুকের খাঁজে, কেমন করে তার সন্ধান পাবে ভদ্রলোক?
এসেছিল, সত্যিই তো এসেছিল। উপমন্যুর অনুপস্থিতির সময়টাই ওর প্রেজেন্ট প্লিজ করবার সময়। তবে, কবে, কখন, ঠিক কোন মুহূর্তে ও আসবে সেটা বলা থাকে না, জানা যায় না। সত্যি কথাই, ও-ও তো ইচ্ছেমতো আসতে পারে না, কাজের মাঝে সময় করে ওকে আসতে হয়। কবে সে সময় পাবে সে কথা কি ও ই জানে?
হয়তো কোনোদিন একটা শিরশিরে মতো হাওয়া বইল। চৈত্রের শেষের দিকে কী শরতের গোড়ায় যে রকম একটা মন-কেমন-করা হাওয়া দেয়। রিনরিন, রিনঠিন দিন। হয়তো সারা সকাল ধরে নিজেকে প্রস্তুত করল রিনা। প্রস্তুত মানে কী? সাজগোজ? দূর! ঘরদুয়ার গুছোনো, লেপা-পোঁছা? ধুর! ভালো-ভালো টি. ভি-তে শেখানো খাবারদাবার করা? ধুত্তোর! ওসব কিছুই লাগে না। চোখের কাজল ও দেখে না, দেখে চোখের ভেতর, বাড়ির সাজসজ্জার মধ্যেও কিছুই দেখে না, দেখে যেটা তার নাম ছটা। প্রভা, দ্যুতি। রিনার। রিনা নামক মানুষীর বিশেষ রিনাত্বের যে ছটা তার মধ্যে থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, সেটাই, সেটাই ওর অনুভব করে আনন্দিত অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠার অবলম্বন। আর কিছু লাগে না। আর খাবারদাবার? পাছে রিনার কষ্ট হয় অসময়ে খাবার খুঁজতে তাই ও পেট ভরিয়ে আসে, আর তেমন ভালো-ভালো জিনিস খেলে নিয়ে আসে রিনার জন্যে।
ছি ছি ছি, এমন এক গোছা অর্কিডের পাশে তুমি তেলেভাজা নিয়ে এলে?
আ রে! তেলেভাজা বলে কি ফেলনা? কাচের কেসের মধ্যে রাখে আজ্ঞে। কড়া থেকে ঝুড়িতে পড়তে পায় না, এমন কাটতি।
