এইবারে চানে ঢুকবে রিনা। চুল খুলতে খুলতে আড়চোখে দেখল উপমুন্য উঠে পড়ছে। যাক এইবার বেরোবে, বেরিয়ে যাবে, আঃ বেরিয়ে যাচ্ছে। মস্ত বড়ো একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে রিনা উপমন্যুর পরিত্যক্ত সোফাটায় বসে পড়ল। শুধু চুলের বিনুনইি খুলছে না। যেন সারা শরীরে তার অঙ্গের সঙ্গে অঙ্গ, প্রত্যঙ্গের সঙ্গে প্রত্যঙ্গ বিমোনো ছিল, স্নায়ুতে স্নায়ুতে জড়িয়ে গিঁট পড়ে গিয়েছিল, সেইসব গিঁট খুলছে সে সযত্নে, জট ছড়াচ্ছে, বিলি কাটছে। কী আরাম! কী অসহ্য মুক্তির আরাম! অনাবশ্যক একটা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় রিনা। চুলের ভেতর দিয়ে চিরুনি চালাতে চালাতে আরামে চোখ বুজে আসে। কিন্তু সেই কুঁড়েমিকে এক ভ্রূকুটিতে তাড়িয়ে সে বাথরুমে ঢুকে যায়। লাল বালতিটাকে কলের তলায় বসায়। তারপর ম্যাচিং লাল মগটা গবগব করে ডুবিয়ে এনতার জল ঢেলে যায় গায়ে। সাবান লাগাতে লাগাতে যতক্ষণ না সাদা ফেনায় গোটা শরীর ভরে যায় ততক্ষণ সাবানটা ছাড়ে না। চন্দনের গন্ধে বাথরুমটা ভরে যায়। নিজের ঈষৎ নত বুক তুলে ধরে সাবান দিয়ে ধোয়ার নামে অনেকক্ষণ আদর করতে থাকে সে। অঞ্জলিটা ঝটপট মুঠো করে পদ্মকলির মতো আকার করে দেখে, নাঃ বেশ সুললিত সাবলীল আছে মুঠো, গিঁটপড়া শক্ত আড়ষ্ট হয়ে যায়নি। এখনও।
তেমন গরম এখনও পড়েনি, তাই চুলটাও তেমন করে ভেজায়নি সে। সরু একটা সিঁদুরের রেখা আর একটা কুমকুমের টিপ পড়লেই মুখখানা বেশ হেসে ওঠে। সামান্য একটু ক্রিম ঘষে নেয়। পাটভাঙা একটা হালকা কমলা রঙের ছাপা শাড়ি পরতে পরতে নিজেকে ভীষণ ভালো লাগতে থাকে তার। মনে হয় আদর করুক, কেউ তাকে একটু আদর সোহাগ করুক। নিজেই নিজের মুখটাকে চুমো খাবার জন্য অনেকক্ষণ এপাশ ওপাশ ফিরে বৃথা চেষ্টা করে সে। তারপর একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে এক কাপ দুধ খায় চকলেট দিয়ে। ঠান্ডা ঠান্ডা। ঢালা উপুড় করে করে ফেনা ওঠানো। গান চালিয়ে দিতে হবে এখন তাকে। মাস্ট। অখিলবন্ধু ঘোষের ক্যাসেটটা বাছে সে, তারপর একটা পত্রিকা হাতে নিয়ে সোফাটায় পিঠ এলিয়ে বসে। নীচু একটা বেতের মোড়া টেনে আনে সামনে, পা দুটো তুলে দেয় তার ওপর। তারপর বইয়ের পাতায় চোখ রাখে। এখন গানের দিকেই তার মন পুরোটা চলে যাবে, না গল্পের বিবরণে মন হারাবে সেটা নির্ভর করছে সম্পূর্ণ গায়ক আর লেখকের আপেক্ষিক কেরামতির ওপর। তবে সত্যি কথা বলতে কি, সুরও নয়, সাহিত্যও নয়, আসলে তার মন ডুবে যায় একটা মনোরম অনুভূতির সাগরে। সুর তাল আর সাহিত্যরস দিয়ে তৈরি তার জলরাশি। কী পড়ল, কী শুনল সেগুলো তার মনে থাকে আবছাভাবে, শুধু হৃদয়ের ভেতরটা কূলে কূলে ভরে যায়।
হৃদয়ের এইরকম টইটম্বুর অবস্থাতেই দরজার ঘন্টাটা সেদিন পাখির গলায় ডেকে উঠল, কুব কুব কুব কুব, কুব কুব কুব কুব। ম্যাজিক আইতে চোখ রেখে কাউকে দেখতে পেল না রিনা। অগত্যা ছিটকিনি খুলে একটু ফাঁক করতেই হল দরজাটা। প্রথমেই একটা সাদা ঝলক। বাইরের সকাল দশটার প্রখর আলো আর সাদা শার্ট, সাদা প্যান্টের সুহৃৎ ঝলক।
তুমি? তুমি এখানে? তুমি হঠাৎ? আশ্চর্য হয়ে, আনন্দের তুঙ্গে উঠে গিয়ে রিনা কোনোমতে বলল।
কোনো কথা না বলে, প্রাণখোলা হাসিতে মুখ ভাসিয়ে ও ভেতরে ঢুকে এল। হাতের ব্রিফকেসটা দেখিয়ে বলল, ভালো বিজনেস হয়েছে আজ। এখন আমি একটু বিশ্রাম এবং এক কাপ ভালো দেখে ধোঁয়া-ওঠা চা অর্জন করেছি। তোমার হাতের।
কী আশ্চর্য, বসো না, বসো আগে আহ্লাদে কিশোরীর মতো শরীর মুচড়ে রিনা বলল।
ও বসে আছে। আধা-অন্ধকার বসার ঘরটায় আলো জ্বলছে বলে মনে হয়। ওর হাত-পা নাড়াচাড়ার মধ্যে একটা হালকা অ্যাথলেটিক ভাব আছে। যে কোনো মুহূর্তে উঠে দাঁড়াবে। সরে এক সোফা থেকে আর এক সোফায় যাবে, কি এক লাফে পৌঁছে যাবে ঘরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। এই লঘুতা ও পেয়েছে যোগ থেকে। যোগ করত রোজ।
এখনও চালিয়ে যাচ্ছ?—গ্যাসে চায়ের জল বসিয়ে দরজার ফাঁকটুকু দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল রিনা।
কী?
যোগ।
বাঃ, ওটা তো আমার প্রকৃতির দ্বিতীয় অংশই হয়ে গেছে। সেকেন্ড নেচার। চালাব না! যোগ বাদ দিয়ে আমার দিন শুরুই হয় না।
খবরের কাগজের পাতা উলটোচ্ছে। খড়মড় খড়মড় শব্দ হচ্ছে একটা। ওর ছোঁয়াচেই যেন রিনার পদক্ষেপেও কেমন একটা হালকা ভাব এসে যায়। ভেতর থেকে কী একটা ঢেউয়ের মতো ফুলে ফুলে উঠছে। তার মনে হয় না ন-বছর বিয়ে হয়ে গেছে। আগের চেয়ে ভারী আর আলগা হয়েছে শরীর। শাড়িটা অগোছালো। ভুলে যায়, সে পুরো মানুষটাই, যত চেষ্টাই করুক, আগের মতো লাবণ্যময় হতে পারে না কিছুতেই।
ধোঁয়া-ওঠা দু কাপ চা একটা সাদা ট্রেতে।
এই দ্যাখো কেমন তোমার সঙ্গে ম্যাচ করা ট্রে, ম্যাচ করা কাপগুলো…
আরে, তাই তো ক খুশি ছড়িয়ে যায় ওর সর্বাঙ্গে। বলে, আসল কথাটা বলছ কেন? একদম আসল কথাটা?
কী!
তুমি নিজেই যে আমার সঙ্গে ম্যাচ করা। তাই বাকিগুলো আপনিই ম্যাচ হয়ে যায়।
ধুত। দেয়ালে টাঙানো গোল আয়নার দিকে তাকাবার চেষ্টা করল রিনা। দেখতে পেল না। কিন্তু আয়নার দিকে তাকাবার দরকার কী? নিজের বোধ দিয়েই তো নিজেকে চিনে নেওয়া যায়। ভাঙাচোরা থ্যাঁতলানো ধামসানো দাবড়ানো এই রিনা কি ওর সঙ্গে মানানসই হতে পারে?
