এখন সে কী করবে? কী করতে পারে সে? খুব বেশি ভাববার সময় নেই। প্রচণ্ড রাগের মধ্যেও দ্রুত চিন্তা করতে হচ্ছে। তিনটে বিকল্প আছে মোট। এক লোকটাকে খুন করা। সে ক্ষেত্রে তার ফ্যামিলি ভেসে যাবে, দুই নিজেকে খুন করা, সে ক্ষেত্রেও তার ফ্যামিলি ভেসে যাবে। সে অতএব তৃতীয় বিকল্পটা নিল।
হেঁটে হেঁটে হেঁটে হেঁটে সে
লোকটার ভেতর
ঢুকে গেল।
স্বৈরিণী
থলে দুটো দাও, বাজার যাব।
একটু কুচো চিংড়ি এনো আর পেঁয়াজকলি। কলি কিন্তু, শাক নয়। সাদা পাঁপড় দেখো তো!
লিস্ট করো, লিস্ট করো, ফরমাশগুলো এলোমেলো ছুড়ে মারলে হবে না।
লিস্ট করার কি আমার সময় আছে এখন? জিনিসগুলো তো রিলেটেড। মনে রাখতে অসুবিধে কি?
তক্কো করো না, তক্কো ভালো লাগে না সাতসকালে, মেয়েমানুষ মানেই তক্কো।
কথা শুনলে মনে হয় কথা কইছে কোনো উপমন্যু নয়, নির্জলা এক উপীন। উপেন্দ্রনাথ, দেবশর্মা-টর্মা, এক্ষুনি শরৎচন্দ্রের চরিত্রদের গলায় বলে উঠবে, তোমার ছোঁয়া খাবার খেতে আজ আমার ঘৃণা বোধ হচ্ছে।
শরৎচন্দ্রের ডায়লগ মনে করতে রিনার হাসিই পেয়ে গেল। ডাল ধুতে ধুতে সে ফিক করে হেসে ফেলল। শরৎচন্দ্র পড়তে দেখলেই মা রাগ করত। বলত, অন্য কিচ্ছু না, গুছিয়ে ঝগড়া করতে শিখবি, আমার ওপরেই শিক্ষাটা ফলাবি সবার আগে, দাদা বলত, শুধু ঝগড়া নয়, প্রেমালাপ করতেও শিখবে মা, বেশ গুছিয়ে প্রেমালাপ, দেবদা, নদীতে কত জল। অত জলেও কি আমার কলঙ্ক চাপা পড়বে না?
তোরই তো কণ্ঠস্থ মুখস্থ দেখছি। রিনা ঠাট্টা করত।
কিন্তু না, শরৎচন্দ্রের প্রেমালাপ রসালাপ নয়, উপীন প্রমুখদের বুড়োটে সেকেলেমিতেই উপমন্যু সবাইকে টেক্কা দেবে মনে হয়। আর কী নীরস! কী নীরস! টাকা-আনা-পাই কিলোমিটার-লিটার ছাড়া কিছু বোঝে না কিছু না।
ধরো, বন্ধুর বিয়েতে ভালো করে সাজল রিনা। একটা নতুন তাঞ্চোই শাড়ি, গয়না, প্রসাধন, আয়নায় নিজেকে দেখতেও দারুণ লাগল।
কেমন লাগছে গো?—উপমন্যুর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে লজ্জা লজ্জা মুখ করে অতঃপর জিজ্ঞাসা।
উত্তর হল, ন্যাকামি রাখো। তাড়াতাড়ি নাও।
ন্যাকামি, ঢং এই কথাগুলো যেন শুধু রিনাকে নয়, রিনার আত্মাকেও অপমান করে। ভেতরটা কুঁকড়ে যায়। মনে হয়, সে নিজেকে যা ভাবছে তা সে নয়, সে যত দূর সম্ভব অকিঞ্চিৎকর, তুচ্ছ। আর উপমনুও তার জানাবোঝা মানুষ নয়। সে অন্য। একেবারে অন্য। ভয়-ভয় চোখে সে চারিদিকে তাকিয়ে দেখে। ওই তো খাটের ওপর জয়পুরি বেডকভার বিছানো। ভেবেছিল ওটা তারই, তাদেরই খাট কিন্তু তা বোধহয় নয়। ও আর কারও খাট, ওখানে অন্য কেউ শোয়, ওই আলমারি, বইয়ের যাক, পড়ার টেবিল, খাটের পাশে লম্বা এক ফালি কার্পেট চিনে লণ্ঠনের মতো ওই আলোর শেডটা অনেক শখ করে যেটা লাগিয়েছিল, মেমসাহেব-নাচা ঘড়ি যেটা তার রাঙাকাকু বেলজিয়াম থেকে এনে দিয়েছিলেন—এ সমস্তই চূড়ান্ত ন্যাকামি অর্থাৎ ভান, অর্থাৎ মিথ্যা।
কানে ন্যাকামি শব্দটার অপমান প্রত্যাখ্যান নিয়ে রিনা বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। রান্নাঘরের দিকে চোখ পড়ে। স্টিলের কয়েকটা বাসন দেখা যাচ্ছে। ঝকঝক করছে। ক্রিসমাস কার্ডের মতো একগুচ্ছ ফুল-আঁকা সাদা উনুনটা, ভীষণ প্রিয় রিনার। খুব যত্ন করে ব্যবহার করে। এগুলো? এগুলোও কি ন্যাকামি? ওই রান্নাঘরের তাক গোছানো, পেতল পালিশ করা, সোডা সাবান দিয়ে রান্নাঘরের মেঝে পরিষ্কার করা ঘষে ঘষে…? না, সম্ভবত এগুলো ন্যাকামি নয়। খুব কেজো গেছের ব্যাপার এসব। কাজ করো, খাও দাও ঘুমোও, কাগজ পড়ো। দু-চার খানা বই পড়ো, আর হ্যাঁ রাত্তিরবেলা ডাক পড়লে সাড়া দিয়ে। নিভাঁজ, নির্ভেজাল প্রকৃতির ডাক কিন্তু।
কেন? কেন এমন হল? বাচ্চারা এল না বলে? কিন্তু সে-ও তো তার অপরাধ নয়। ডাক্তারদিদি বলেই দিলেন, কোনো অসুবিধে নেই, কারওই কোনো ডিফেক্ট নেই। স্পার্মগুলো যে কেন কোনো ওভামকে ফার্টিলাইজ করতে পারছে না, তা ভগবানের বাবারও সাধ্য নেই বলার। মিস্টার দত্ত আপনি একটু টেনশন কমান তো! মিসেস দত্ত আপনি যেমন ভালো লাগে তেমন করে দিন কাটাবেন, যেমন খুশি থাকবেন, ধরুন ইচ্ছে হল মাথায় একটা ফুল গুঁজলেন, ইচ্ছে হল একদিন রান্না করলেন না, দোকান থেকে খাবার আনিয়ে চালিয়ে দিলেন। অনেক সময়ে বড্ড গতানুগতিকতার মধ্যে বাঁধা পড়ে যান আপনারা। প্লিজ…লেট ইয়োরসেল্ফ গো। ইট ক্যান মেক আ গ্রেট ডিফারেন্স। তা নয়তো…আমি ডাক্তার হয়েও শনাক্ত করতে পারছি না ভাই আপনাদের স্টেরিলিটির কারণটা।
ডাক্তারদিদি পারেননি, কিন্তু রিনা বোধহয় পারে। ওই যে উপমনুর স্পার্ম? ওরাও তো উপমনুরই মতো? একই ডি এন এ কোড মেনে তৈরি হয়েছে। সেই লক্ষ লক্ষ স্পার্ম রিনার গুটিকয় ডিম্ব বেচারির দিকে বাঁকা হেসে তেড়ে যায়, বলে, ইয়েস একটা বাচ্চার বডি তৈরি করতে রাজি আছি ঠিকই, কিন্তু খবর্দার নো ন্যাকামি। তার ভেতরে ওভামদের কুঁকড়ে যাওয়াটা আজকাল টের পেতে শুরু করেছে রিনা। তাই কেন তার ঘর শূন্য এ নিয়ে রিনার মনে খেদ থাকলেও কোনো প্রশ্ন নেই।
রুটিনমাফিক খাওয়াদাওয়া শেষ করে ফুস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে সোফায় একটু কাত হল উপমুন্য। এটা ওর উত্তর-চল্লিশ সাবধানতা। ডাক্তারের পরামর্শ। অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। সিগারেট আর মদ্যও বারণ, সে বারণটা অবশ্য সে শোনে না।
