এ মা! এতদিন তুই স্কুলে পড়তিসই না! ক্লাসের মেয়েরা চ্যাঁচামেচি করে জিজ্ঞেস করে।
কেউ ভরতি করে দ্যায়নি, কী করে পড়ব?
কেন? তোর বাবা? তোর মা?
আমার মা নেই, একটু ভেবে বলি, আমার বাবাও নেই।
সবাই অমনি চুপ হয়ে যায়। কেমন কাঁদো-কাঁদো! সবচেয়ে লম্বা মেয়েটা বলে, ইসস! বাবা-মা নেই, এমন আমি ভাবতেও পারি না!
আমার কেমন খারাপ লাগে। আমি বলি,
পাঁচখানা কাটলেট, লুচি তিনগন্ডা, গোটা দুই জিবেগজা, গুটি দুই মণ্ডা। আরও কত ছিল পাতে আলুভাজা ঘুঙনি। ঘুম থেকে উঠে দেখি পাতখানা শুন্যি।
ওরা হেসে ওঠে।
তুই বানালি?
হ্যাঁ, বানালুম।
আরও বানাতে পারিস?
আমি আরও বলি, আবোল-তাবোল, খাই-খাই, খুকুর ছড়া—থেকে–
বাঃ, স-ব তুই বানালি? এক্ষুনি এক্ষুনি?
এক্ষুনি নয়, আগে বানিয়ে রেখেছিলুম।
আমার এখন খুব ভালো লাগছে।
দিদিমণি ক্লাসে এলেন, নাম-ডাকা হয়ে গেলে একটা মেয়ে, তার নাম এখনও জানি না, তড়বড় করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, দিদি, একটা কথা বলব?
কী কথা? এক্ষুনি অমনি টয়লেট পেয়ে গেল?
না, না। আমাদের একজন নতুন মেয়ে এসেছে। দেখুন ওই যে স্বরূপা, ও না পদ্য বানাতে পারে।
দিদি বললেন, তাই নাকি? বলো তো?
দিদিমণির রাগি মুখের দিকে চেয়ে ভয়ে আমার প্রাণ উড়ে গেল, আমি উঠে দাঁড়িয়ে চুপটি করে থাকি।
মেয়েটা বলল, বল না, সেই যে বলছিলি—পরীক্ষাতে গোল্লা পেয়ে হারু ফেরেন বাড়ি-বল না।
আমি চুপ।
দিদিমণি বললেন, এটা ওর নিজের বানানো কেন হবে? এ তো সুকুমার রায়ের লেখা। আমি শুনেছি ও অ্যাডমিশন টেস্টে খুব ভালো কবিতা বলেছিল।
না দিদি—মেয়েটাও ছাড়বে না—ও বলেছে ওটা ওর নিজের বানানো।
তুমি বলেছ? কী নাম যেন তোমার?
স্বরূপা।
সুকুমার রায়ের কবিতা তুমি নিজে লিখেছ। বলেছ?
আমি বলি, না।
হ্যাঁ দিদি, ও বলেছে, বলেছে, বলেছে! সবাই হইহই করে ওঠে।
স্বরূপা, দাঁড়াও।
আমি দাঁড়াই।
কানে হাত দাও, দু কানে।
আমি দিই না।
দাও বলছি। দা-ও! … আমি বড়োপিসি ছোটোপিসি ঠাম্মা সবার গলা শুনতে পাই।
তখন আমি কানে হাত দিই।
হ্যাঁ এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকো, যতক্ষণ না আমি বসতে বলছি।
দিদিমণি পড়াতে থাকলেন। কী ছাইভস্ম আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার ইচ্ছে করছে এই মেয়েগুলোকে ঘুষি মেরে মুখ ফাটিয়ে দিই। এমন মারব না যে বাছাধনদের আর নালিশ করতে হবে না।
কিছুক্ষণ পর দিদিমণি বললেন, আর কখনও মিথ্যে কথা বলবে?
আমি মুখে মুখে জবাব দিই, মিথ্যে কথা বলিনি।
আবার বাজে কথা বলছ?
আমি মজা করেছিলুম। কী করে জানব ওরা জানে না।
আচ্ছা ঠিক আছে, বোসো। এমন মজা আর করবে না।
ক্লাস ভেঙে গেলে কতকগুলো মেয়ে বলল, কীরে কেমন খেলি? আমি মুখ বাঁকিয়ে বললুম, আবোল-তাবোল জানে না, খাই-খাই জানে না আবার ক্লাস থ্রির মেয়ে হয়েছে। ইঃ!!
নালশে মেয়েটা বলল, তুই একটা মিথ্যেবাদী।
তুই তো একটা কেলে-কুচ্ছিত, বিশ্রী!
আমি রাগে অন্ধ হয়ে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লুম। অন্য সব মেয়েরা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লম্বামতো মেয়েটা এসে তাড়াতাড়ি আমাদের ছাড়াতে লাগল।
এই কী হচ্ছে? কী হচ্ছে? ঠিক আছে শোধবোধ? শোধবোধ!
আমি উঠে দাঁড়াই, আমার ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ছে। ও উঠে দাঁড়ায়, ওর। কপালে আলু। দু-জনেরই চুল উলোঝুলো, জামাকাপড় ধুলোয়-ধুলো।
আমি তো মিথ্যেবাদী! তাই বাড়ি গিয়ে বলি, খেলতে গিয়ে পড়ে গেছি। বিচ্ছিরি স্কুল, বিচ্ছিরি দিদিমণি, বিচ্ছিরি মেয়েরা…
তোর কি কিছু পছন্দ হয় না।
আমি গোঁজ মুখে বসে থাকি। আমার আর ইস্কুলে যাবার শখ নেই।
কিন্তু তাই বললেই কি হয়? স্কুলে আমাকে যেতেই হয়। বাবার কড়া হুকুম। রাঙাদার! বাপ রে! আমাকে ওরা বলে রাকুসি, আমিও ওদের বলি, শূর্পনখা, তাড়কা, অলুম্বুষা, হিড়িম্বা, ঘটোৎকচ। আমি রামায়ণ সব জানি, ছোটোদের মহাভারত পড়েছি, কতবার! ওরা কিছু জানে না। এমন কি ঘটোৎকচ যে ছেলে রাক্ষস তা পর্যন্ত জানে না। খালি কটমটে নামগুলো শুনে দাঁত কিড়মিড় করে। আমি দূরে পালিয়ে গিয়ে বলি, আয় না ধর ধর, রাক্কসিকে ধর, কাঁচা খেয়ে নেব। অনেক ছুটেও ওরা আমাকে ধরতে পারে না। হেরো। কাঁচকলা! লবডঙ্কা।
তখন ওরা সবাই মিলে একদিন আবার দিদিমণির কাছে নালিশ করল। দিদিমণিও আমাকে খুব বকলেন। আমিও বলি, আমাকে যে ওরা রাক্কসি বলে খ্যাপায়, তার বেলা?
দিদিমণি বলেন, ছি, ছি, ছি? রূপ ঈশ্বরের দেওয়া। সবাই তো সমান হয় না। তাই বলে ওইরকম করে বলবে? তোমাদের একটা দয়ামায়া বলে জিনিস নেই?
কে চেয়েছে দয়ামায়া? আমার ভারি বয়ে গেছে চাইতে। আমি ওদের সঙ্গে ঘুরি না। একা একা থাকি। খেলার মাঠে সবার আগে পৌঁছে যাই দৌড়-রেসে। খেলাদিদি আমাকে হাইজাম্প শেখান, লংজাম্প শেখান। চু কিতকিত খেললে আমি বোঁ-ও করে ওদের কোর্টে গিয়ে যেটাকে সামনে পাই পেটে খোঁচা মেরে চলে আসি। কেউ আমাকে ধরতে পারে না। ধরবার সাহসই নেই। চোখগুলো কটমটে করে একটা ঝটকা মেরে যেমনি দৌড়ে যাই, ওরা ভয় পেয়ে যায়। আমাদের দল জেতে। আমাকে দলে নেবার জন্যে সব ছটফট করে। আমি কাউকেই চাই না। কোনো কথা বলি না। দিদিমণি যে দল ঠিক করে দেন সেই দলেই খেলি। একা খেলি, একা জিতি। দল জিতল কি না জিতল ভারি বয়ে গেল আমার!
এই করতে করতেই একদিন খুব মারামারি লেগে গেল।
