ওরা বলল, এই, পেটে খোঁচা দিবি না।
আমি বলি, এই, রাক্কসি বলবি না।
রাক্কুসিকে রাক্কসি বলব না তো কী বলব?
আমি ঝাঁপিয়ে পড়লুম, সামনে যাকে পেরেছি জাপটে ধরেছি, মারছি, কিল, চড়, ব্যাস, ওরাও সেই আর একদিনের মতো সবাই মিলে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, আমি পড়ে গেলুম, ওরা সবাই আমার ঘিরে ধরে মারছে। চোখের পাতা ফুলে গেছে, কপাল দিয়ে রক্ত পড়ছে, হাতে কালশিটে। বড়দিদিমণির কাছে আমায় যখন নিয়ে যাওয়া হল তখন আমার জামা ছেড়া, কাঁধ বেরিয়ে গেছে। ভীষণ বকুনি খাচ্ছে মেয়েগুলো। আমার যা আনন্দ হচ্ছে না!
মিনমিন করে একজন বলছে, পেটে খোঁচা দেবে কেন? মোর করতে হলে পেটে খোঁচা দিতে হবে?
বড়দি বলছেন, তাই বলে এইভাবে বারো তেরোজন ঘিরে ধরে মারবে তোমরা? তোমরা তো কাওয়ার্ড। সুচরিতা! এ তো গণপ্রহারের শামিল!
খেলার সুচরিতাদি কী বললেন আমি কিন্তু আর শুনতে পেলুম না। হঠাৎ আমার চারদিকে কারা হিজিবিজি করে হলুদ বনের কলুদ ফুল ছড়িয়ে দিতে লাগল, তারপর একটা মাঝরাতের মতো অন্ধকারের মধ্যে সব মিলিয়ে যেতে থাকল— মেয়েরা, দিদিরা, স্কুলবাড়ি, আমাদের বাড়ি, ঠাম্মা কাকু জেঠু পিসিরা সব। খালি একটা অনেক উঁচু শূন্য থেকে আমি পড়ছি, পড়ছি। কোথায় পড়ব মা? তোমার কোলে?
কতক্ষণ পরে জানি না, আধা-চোখ খুলে দেখতে পাই একটা অচেনা ঘর, অচেনা জানলা, দরজা, সবুজ পর্দা। এটাই কি তাহলে স্বর্গ? যেখানে আমার মা থাকেন! এ মা! স্বর্গ এইরকম? আমি তো ভেবেছিলুম স্বর্গের ঘর লাটসাহেবের ঘরের চেয়েও বড়ো। সেখানে সব গোলাপি, তা ছাড়া স্বর্গে এমন কিছু একটা ব্যাপার থাকবে যেটা আমি ভাবতেও পারি না। ও তো দেখছি জানা জিনিস সব! এই জানলা দরজাগুলো আলাদা হলেও, এরকম তো আমাদের বাড়িতেও আছে। এইরকম বিচ্ছিরি সবুজের কাছাকাছি কী যেন রঙের পর্দা তো আমাদের বাড়িতেও আছে, ঘাড় ফেরাতে গেলে দেখি ভীষণ ব্যথা! পাশ ফিরতে গেলে হাতে টান লাগল। দেখি হাতের থেকে একটা সরু নল কোথায় যেন উঠে গেছে! আমার ডানপাশে একটা নীচু কাঠের পার্টিশন। তার ওপাশ থেকে সাদা শাড়ি পরা, মাথার কড়া সাদা রুমাল বাঁধা একজন ঢুকলেন। আমি চট করে চোখ বুজিয়ে নিয়েছি, ও হো এটা তো প্রকাশদাদুর হাসপাতাল। উনি তো নাদিদি…
হঠাৎ শুনি পার্টিশনের ওপার থেকে রাঙাদার গলা, ব্ল্যাক-আউটটা তা হলে বলছেন…।
প্রকাশদাদুর গলা, হ্যাঁ ঠিক ওর মায়ের মতো, সেম সিম্পটম। ভালো করে পরীক্ষা না করে বলতে পারছি না অবশ্য।
রাঙাদা বললেন, আশ্চর্য!
আশ্চর্যই বটে! এইটুকু একটা মেয়ের এত স্ট্রেস! বউমারটা বুঝতে পারি, তাঁর তো ছিল একেবারে মুখে সেলাই। কিন্তু রাজেন—এইটুকু মেয়ের…
রাঙাদা তাড়াতাড়ি বললেন, অত মার খেয়েছো। মারামারি করেছে…তার তো একটা।
মারামারিও করেছে বলছে? শিওর? পড়ে পড়ে মার খায়নি? …
কোনো সাড়া পাচ্ছি না।
ডাক্তারদাদু বললেন, যদি করে থাকে তো আশার কথা। তার মানে ও আত্মরক্ষা করতে শিখছে, কাওয়ার্ডের মতো পালিয়ে বাঁচতে চায়নি। হারজিত লড়াইয়ে আছেই রাজেন। আজ হেরেছে…কাল জিতবে।
কাওয়ার্ডটা বোধহয় আমাকেই বললেন কাকা!–রাঙাদা বলে।
না, না। আমি কাউকেই তেমন কিছু বলতে চাই না। যে যার দায়টা ভালো করে বুঝে নিয়ে পালন করা চাই, নইলে দায় নিতে নেই। তুমি কী করেছ না করেছ তুমিই ভালো জানো বৎস। তবে তোমার কন্যা কালো, এক ধরনের কবচকুন্ডল সে নিয়েই জন্মেছে। তার ওপর যা শুনছি—দশপ্রহরণধারিণী। দেখো, মানুষের মতো বাঁচতে ওর হয়তো বাবা-টাবার দরকার হবে না।
আস্তে, খুব আস্তে, কেমন ধরা-ধরা গলায় রাঙাদা বললেন, আয়াম সরি।
এটার মানে আমি জানি, আমি দুঃখিত। আরও একটা জানি, কাওয়ার্ড মানে কাপুরুষ। কাপুরুষ মানে? আমি জানি, কিন্তু বোঝাতে পারব না। কিন্তু আর যেসব হিজিবিজি ওঁরা দুজনে বলাবলি করছিলেন, আমি তার কিছুই বুঝতে পারছিলুম না। আমার কানে শুধু লেগেছিল, মায়ের মতো, ঠিক ওর মায়ের মতো ক ব্যথা ভুলে গিয়ে আমি চোখ খুলে ফেলি, দেখি সামনে নার্সদিদি, আমারই মতো কালো, ঝুঁকে রয়েছেন আমার ওপরে! দেখি হাতটা, একটা ইনজেকশন… কিচ্ছু লাগবে না…কী ব্যথা করছে না তো?
ব্যথা করছিল ঠিকই। কিন্তু আমি বলি উঁহুহ।
সেই লোকটা
লোকটাকে সে প্রথম খেয়াল করে হুগলির ডি, আই অফিসে। আগেও দেখেছে। কিন্তু সে ভাবে লক্ষ করেনি।
বাবা স্কুল থেকে অবসর নিয়েছেন পাঁচ বছর হয়ে গেল। কিছুই হাতে পাননি। না পেনশন, না গ্রাচুয়িটি, না জি. পি. এফ। কোনোটার কাগজপত্র রেডি হয়নি, কোনটার ফাইল হারিয়ে গেছে। কোনোটা আবার ট্রেজারি রিলিজ করছে না। বাবা বললেন, দুটো বর্গের জ-ই আমার খয়ে গেল রে…জুতো আর জীবন। এবার তুই দ্যাখ যদি পারিস।
তা সেই তার বাবার কর্মক্ষেত্রের গোলকধাঁধায় প্রথম প্রবেশ। পাঁচ বছর সময় যতটা কম মনে হয়, ততটা কম নয় দেখা গেল। কেননা বাবার কর্মক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। বাবার সময়ের হেডমাস্টারমশাই রিটায়ার করেছেন। সেই সময়কার ক্লাক মারা গেছেন। কাগজপত্র সাত বাও জলে। বর্তমান ক্লাকের কাছে বর্তমান হেডমাস্টারমশাই যেদিন তাকে চতুর্থবার পাঠালেন সেদিন ক্লার্ক কাগজ পাকিয়ে কানে সুড়সুড়ি দিচ্ছিলেন। বললেন, পেন্ডিং কাজ যে করব ইনসেনটিভ কই?
