অ্যাঁ?-ঠাম্মা ঠাস করে এক চড় কষিয়ে দেন আমার গালে! আমার এত ভীষণ ভীষণ লাগে। ঠিক সেই সিনেমার লোকদের মতো আমি মাটিতে ধড়াম করে শুয়ে পড়ি, উলটেপালটে কাঁদি।
দাদু তো একজন শোয়া মানুষ! পুজোর ঘরের পাশেই দাদুর ঘর। শুয়ে শুয়েই দাদু চ্যাঁচান, কী হল? কী হল? তোমরা কি আমাকে একটু শান্তিতে হরিনামও করতে দেবে না? আমার কি যাবার সময় হয়নি? হে ভগবান। এত অশান্তি। এত অশান্তি!
আমি দাদুর ঘরে ছুটে যাই। বালিশ করি। দাদু তো আর সবার মতো না! হাঁটতে পারেন না, উঠতে পারেন না, কেউ এনে না দিলে দাদু খেতেই পারেন না। দাদুর বিছানায় বাচ্চাদের মতো অয়েল-ক্লথ পাতা থাকে, আমি দেখেছি।
দাদু, ও দাদু! ঠাম্মা আমাকে ভীষণ ভীষণ জোরে চড় মেরেছে। আমি কাঁদতে কাঁদতে বলি।
আমার পুজোর কাপড় ছিঁড়ে দিয়েছিস সে কথাটা বললি না?
আমি তো পুজো করতে চাইছি, কেউ আমাকে পুজো করতে দিচ্ছে না কেন?
আট বছরের মেয়ে পুজো করবে কোথাও শুনিনি বাবা! এত আবদার! এত আবদার! যা বলবে তাই! যা বলবে তাই!
কোথায় তাই? আমাকে একটাও গোলাপি ফ্রক কিনে দিয়েছ? কাল আমাকে বাবা-কাকার মতো ডিমের রুটি করে দিয়েছিলে?
সাতসকালে আমার অত সময় কোথায় যে তোমার খাঁই মেটাব?
আজ সকালেও তো দাওনি!
দাদু এবার চেঁচিয়ে ওঠেন, যাবে? যাবে তোমরা এখান থেকে? কী আপদ! কী আপদ রে বাবা! দু দণ্ড যে শান্তিতে জিরোব তারও উপায় নেই।
আমি আজ বড়োদের সঙ্গে খাচ্ছি। আজকে ভাইফোঁটা কি না! তাই উৎসব। বাবা, কাকু, জেঠু সববার কপালে চন্দনের টিপ। পিসিদের মাথায় ধান দুবে লেগে রয়েছে। খেতে খেতে বাবা বললেন, আট বছর বয়স হয়ে গেল, ওকে তোমরা স্কুলেও দিতে পারনি? একটু কাণ্ডজ্ঞানও কি নেই তোমাদের?
ঠাম্মা ভয়ে ভয়ে বললেন, মেয়েটা যে তোমার বাবা, তুমি কিছু না বললে…
আশ্চর্য কথা! ও কী খাবে, কী পরবে সেগুলো কি আমি ঠিক করি? জিতু তুমি যত শিগগির সম্ভব ওকে একটা ভালো স্কুলে ভরতি করবার ব্যবস্থা করো।
আমার তখন খুব সাহস হয়, আমি বলে উঠি, আমি রিয়াদের ইস্কুলে ভরতি হব। লাল স্কার্ট,সাদা জামা, লাল ফিতে…
কাকু বলল, বয়স হিসেবে তো ওর ক্লাস থ্রি-তে পড়া উচিত। কিন্তু টু-থ্রি-তে তো আজকাল ভরতি করা অসম্ভব ব্যাপার!
তা আগে তোমাদের সে খেয়াল হয়নি কেন? আমার মেয়ে ঠিক আছে, তো আমাকে মনে করিয়ে দিলেও তো পারতে!
আমি চেষ্টা করছি—কাকু বলল।
আমার মেয়ে আমার মেয়ে আমি দুপুরবেলা দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে শব্দগুলো ওলটাই, পালটাই। আবার রাত্তিরবেলা শুয়েও যতক্ষণ ঘুম না আসে শুনতে পাই একটা ভারী গলা, আমার মেয়ে, আমার মেয়ে। আমি খেলা করি শব্দদুটো নিয়ে।
কোন মেয়ে?
পুঁটু মেয়ে।
কার মেয়ে?
আমার মেয়ে।
কোন আমার?
বাবার আমার।
কোন বাবা?
পুঁটুর বাবা, পুঁটুর বাবা, আমার বাবা–।
এইভাবে খেলতে খেলতে আমি একদিন ইস্কুলে ভরতি হয়ে যাই। ক্লাস থ্রি তেই আমি কি না আরে ছিছি রাম বোলো না হে বোলো না আবৃত্তি করতে পেরেছি! একশোটা আমের দশটা পচা বেরোলে, বাকিগুলো চারজনের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিলে, ক-টা পড়ে থাকবে—বলতে পেরেছি!
বড়দিদিমণি জিজ্ঞেস করলেন, পুঁটু ছাড়াও ওর আর কোনো নাম নেই?
কাকু বললো, না, না, মানে আমরা তো সত্যিই-পুঁটুটা ঠিক…
বেশ তো আপনি একটা নাম দিয়ে দিন না।
কাকু মাথা চুলকোয়—আমি মানে নাম…
দিদিমণি বলেন, পুঁটু। তুমি বলো না তোমার কোন নাম ভালো লাগে! আমি বলি, সুরূপা।
না না, কাকু হাঁ হাঁ করে ওঠে—ওটা বউদি, মানে ওর মায়ের নাম। উনি মারা গেছেন।
বেশ তো, ওর যখন ওই নামটাই পছন্দ একটু উলটেপালটে স্বরূপা করে দিই?
স্বরূপা সুরূপা…কাকু আওড়াতে থাকে…আমি বরং একটু বাড়ি থেকে…
দেখুন, থ্রি-তে একটাই মাত্র ভেকেন্সি আছে বলে, আর ও খুব ভালো কোয়ালিফাই করতে পেরেছে বলে একশো ত্রিশটা অ্যাপ্লিক্যান্টের মধ্যে ওকে নিলাম। সময় নষ্ট করলে পারব না। আপনি যখন অভিভাবক হিসেবে এসেছেন আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ঠিক আছে, কী রে পুঁটু স্বরূপা ঠিক আছে তো?
আমি বড়ো করে ঘাড় নাড়ি। ভীষণ পছন্দ। মায়ের নামের সঙ্গে কী মিল! এইবার একটু-একটু করে আমি মায়ের মতো হয়ে যাচ্ছি।
পাড়ার ইস্কুল। লাল স্কার্ট ইস্কুলে যাওয়া হল না বলে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে। কিন্তু কাকা বলল, অত দূরে তোকে নিয়ে কে যাওয়া-আসা করবে? রিয়াদের গাড়ি আছে তাই রিয়া যেতে পারে।
তোমরাও একটা গাড়ি কেননা—আমি বলি।
কেমন করে কিনব?
দোকানে যাবে, বলবে আমাদের স্বরূপা ইস্কুলে যাবে, ওই সাদা গাড়িটা দিন তো! রিয়াদের কালো গাড়ি, আমাদেরটা বেশ সাদা হবে?
কাকু হাসতে লাগল,-গুণের গুণমণি! গাড়ি কিনতে টাকা লাগবে না বুঝি? চাইলেই দিয়ে দেবে?
তা কেন? তোমার তো টাকা আছে, চাকরি করে টাকা পাও যে!
সে তো দু-দিনেই ফুটুস। ওতে কি হয়? লাখ লাখ টাকা চাই। যাক গে, এই স্কুলেও তো সবুজ স্কার্ট পরতে পাবি। নতুন জুতো, সবুজ রিবন। স্কুলব্যাগ, টিফিনবাকসোটা লালের চেয়ে সবুজ অনেক ভালো। আবার কেমন বাড়ির কাছে। হেঁটে হেঁটেই চলে আসতে পারবি।
কাকুকে কী করে বোঝাই হেঁটে হেঁটেই চলে আসতে আমি চাই না। কাছে নয়, দূরে, অনেক অনেক দূরে আমি চলে যেতে চাই। ট্রামে চড়ে, বাসে চড়ে, ট্রেনে চড়ে যাচ্ছি তো যাচ্ছিই, আস্তে আস্তে ভুলে যাচ্ছি সেই দোতলা বাড়িটা, ভুলে যাচ্ছি। দূর থেকে ছবি দেখার মতো দেখতে পাচ্ছি…পুজোর কাপড় পরা ঠাম্মা, উল বুনছে বড়োপিসি। বিনুনি দুলিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে ছোটোপিসি, কাকু অফিস যাচ্ছে, জেঠু কলেজ যাচ্ছে, অনেক বেলায়। দাদু শুয়ে শুয়ে খাচ্ছেন গলা গলা দলা দলা ভাত, মসমস শব্দ, একটু ফাঁক দরজাটা। সিগারেটের গন্ধ, আমি উশশশ করে নিয়ে নিচ্ছি গন্ধটা আমি ভালোবাসি। দূরে চলে যেতে ইচ্ছে করে। যেখানে থেকে ছবির মায়ের মতো ওদের দেখতে পাব। ওরা কেউ আমায় দেখতে পাবে না।
