ঢুকতেই পিসির দল হইহই করে উঠল—
তিলোমা! এই তিলোত্তমা, এই বুঝি তোর রাজকন্যে বউদির মেয়ে?
এই বুঝি তোর রাঙাদার মেয়ে!
একমাত্র না রে?
হ্যাঁ। ও হওয়ার পরই তো বউদি…
কী স্যাড না?
তারপরেই সেইসব কথা।–একদম বোঝা যায় না, না?
তোর রাঙাদার মতনও নয়। বউদির মতো তো নয়ই। কার মতো বল তো?
ছটোপিসি মুখটা কেমন বাঁকিয়ে বলে, আমার মতন নয় এটুকুই বলতে পারি।
কে জানে কোত্থেকে এসেছে।
আমি তখন মাথার চুল ঝাঁকিয়ে হেঁকে হেঁকে প্রত্যেকের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলি, তোমার মতন, তোমার মতন, তোমার মতন?
পিসিরা খুব হাসে, বলে, বেশ খরখরি আছে, না?
ছোটোপিসি বলে, খরিশ একেবারে।
আমি বলি, খরখয়ে, খরিশ, খনখনে, খশখশে, খপখপে, খটখটে, খ্যাংরা ড্যাংড়া…!
সবাই হাসে। একটা পিসি বলে, হ্যাঁরে, কিছু মনে করিস না, মা-মরা বলে বাচ্চাটাকে তোরা কি একটু যত্নও করিস না!
ছোটোপিসির বোধহয় রাগ হয়, বলে, ও হল আখকুটির সর্দার। এই নতুন জামা আসছে দু-দিনেই সেটা ছিঁড়েখুঁড়ে একশা। পায়ে চটি পরবে না। চান করতে তেল সাবান মাখযে না, চুল আঁচড়াবে না। ন-বছরে পড়ল, ও কি আর বাচ্চা আছে না কি? এখন তো নিজের কাজ নিজেরই করার কথা।
যাই বলিস আর তাই বলিস মা-মরা মেয়ের আর একটু বেশি আদর-যত্ন দরকার—পিসিটা বলল।
আমার কেমন রাগ হয়ে যায়। বলি, মা-মরা, মা-মরা! বেশ করেছি মাকে মেরে ফেলেছি। সবাইকে মারব। ঠাম্মাকে, ব-পিসিকে, ছো-পিসিকে, কাকুকে,
জেঠুকে, …!
ছোটোপিসি বলে, দেখলি তো! ওর গলায় রাগ চোখে রাগ। উঠে আসে——পুঁটু, যাও বলছি যা-ও। আমাকে ঠেলে বার করে দিতে থাকে ছোটোপিসি। আর একটা পিসি বলে শুনতে পাই, কী বলল রে? মাকে মেয়ে ফেলেছি! এমন কথা কেউ নিশ্চয় ওকে বলেছে। এমা! বাচ্চা একটা, অসহায়!
আর একজন আস্তে বলল, যাক গে যাক। পরের বাড়ির ব্যাপার। আমাদের কী!
ঠাম্মার কী সুন্দর ফাটা ফাটা পায়ে বাসি আলতা লেগে থাকে। ফাটা ফাটা ঠোঁটে পানের রস। ঠাম্মার আঁচল থেকে সুন্দর সুন্দর রান্নার গন্ধ বেরোয়। আঁচল মুঠোয় নিয়ে গা ঘেঁষটে আমার দাঁড়াতে ইচ্ছে করে ভীষণ। ঠাকুরপুজো করবার সময়ে ধূপ জেলে দেয় ঠাম্মা, দীপ জ্বালে, ঠাকুরকে ফুল দেয়, আমি হাতজোড় করে বসে থাকতে চাই, কিন্তু ঠাম্মা বলেন, সরে বোস পুঁটু, এখন পুজো করছি, ছুঁয়ে দিসনি।
আমি তো চান করে এসেছি ঠাম্মা!
হোক, তুই জন্ম-নোংরা। যেমন চিরকুট্টি ফ্রক, তেমনি জটবাঁধা চুল, হাতে পায়ে সবসময়ে ধুলো! কোত্থেকে এত ধুলো পাস?
ঠাম্মা, আমিও পুজো করব, কঞ্জুর দিয়ে পিদিম জ্বালাব!
ওই যে বললুম, তুই নোংরা।
ব-পিসিকে বলো না একদিন আমায় ঘষে ঘষে ঘষে ঘষে চান করিয়ে দেবে, ধুধুলের ছাল দিয়ে! আমি চেঁচাব না, কিছু বলব না। গরম জলে বেশ করে। আমি পায়ের নখে নখপালিশ পরব ছো-পিসির মতন। একটা সিল্কের কাপড় পরব।
কোথায় পাবি সিল্কের কাপড়? আমার পুজোর কাপড়ে হাত দিবি না। আর তোর পিসিরা? তবেই হয়েছে।
তোমাদের কাপড় পরব না ঠাম্মা। ওই যে আলমারি আছে…
কোন আলমারি?
ওই যে রাঙাদার ঘরে! চকচকে আরশুলো রঙের আলমারি আছে, ওতে অনেক সিল্কের বেনারসি আছে…ওখান থেকে দাও।
ও রে বাবা, ও তো তোর মায়ের আলমারি। ওতে হাত দিলে তোর বাবা আমায় মেরে ফেলবে!
বাবা ঠাম্মাকে মেরে ফেলবেন? একেবারে? ছবিটা আমি তক্ষুনি দেখতে পেলুম। ঠাম্মা মাটিতে পড়ে ছটফট করছেন। উলটেপালটে যাচ্ছেন, বাবা ঠাম্মার পেটে এইসান এক লাথি! ঘুষি, ঘুষি, ঘুষির পর ঘুষি, পেছনে একটা চাকা লাগানো ফলের গাড়ি। ঠাম্মা তার ওপরে পড়ে গেলেন, গাড়ি উলটে গেছে, রাস্তাময় কমলালেবু, আপেল, বেদানা গড়াচ্ছে, গড়াচ্ছে। ব্লাউজ ধরে রাঙাদা ঠাম্মাকে ওঠাচ্ছেন, আববার এক ঘুষি, ঠিক মুখের ওপর। ঠাম্মা পড়ে গেলেন, মুখটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ঠিক এমনি ছবি টিভিতে রোজ রোজ হয়। রাঙাদা ঠাম্মাকে এমনি করে মেরে ফেলবেন?
কেন ঠাম্মা?
তোর মা স্বর্গে গেছে তো! তার জিনিসপত্তর এখন তোর বাবার প্রাণ। নিজে ঝাড়ে পোঁছে, কাউকে হাত দিতে দেয় না। দেখিস না ঘরে চাবি দিয়ে চলে যায়। ওই একরকমের হয়ে গেছে!
যাঃ। তাহলে আর আমি কী করে পুজো করব? ঠাকুরঘরে সিংহাসনের ওপর নাড়গোপাল ঠাকুর আছেন। তার এপাশে ওপাশে লক্ষ্মীর পট, গণেশঠাকুরের পট, নারায়ণের পট, আর কত কত ঠাকুর ওপরে নীচে। আমি কী সুন্দর সবাইকে ফুল-তুলসী দিতুম, কঞ্জুরের দপদপে দীপ জ্বালিয়ে পুজো করতুম, তারপর ছোট্ট থালায় এলাচদানা আর পুঁচকি গেলাসে জল দিয়ে উপুড় হয়ে পেন্নাম করতুম আর বলতুম, ঠাকুর, হে ঠাকুর, আমাকে মায়ের মতো করে দাও, হে গণেশ, হে লক্ষ্মী, হে নাড়গোপাল আমি তোমাদের খুব ভক্তি করছি। দয়া করে আমাকে মায়ের মতো…
কিন্তু বড়োপিসি আমাকে ধুধুলের ছাল ঘষে চান করিয়ে না দিলে আর ওদের রাঙাদা আলমারি খুলে একখানা সিল্কের কাপড়ও না নিতে দিলে আমি কী করে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করব? কী করে আমার ভক্তি বোঝাব? শুধু একখানা সিল্কের কাপড়ের অভাবেই কি তা হলে আমার মায়ের মতো হওয়া হচ্ছে না?
ভীষণ রাগ হয়ে যায় আমার, ঠাম্মা পুজো শেষ করে যে-ই আমাকে পেসাদ দিতে এসেছেন অমন আমি ঠাম্মার পুজোর কাপড়ের আঁচল দাঁত দিয়ে কামড়ে ছিঁড়ে দিই।
