দেয়াল বলে, আগে ছিলুম টিকটিকির, এখন তোমার। আমি বলি, তুমি যদি সত্যিকারের দেয়াল হও তাহলে আমাকে মায়ের মতো করে দাও।
দেয়াল যেমন সাদা, তেমনি থাকে। উত্তর দিলে দেয়ালে একটা ছায়া পড়ে আমি দেখেছি। আজকে কোনো ছায়া পড়ে না। যন্ত্রণায় আমি ঘুমোতে পারি না, ডাক ছেড়ে কাঁদতে থাকি। তখন অবশেষে আমাদের প্রকাশদাদু ডাক্তারবাবু আসেন। একটু টিপেটুপে আমাকে আরও কাঁদিয়ে শেষে বলেন, এক্স-রে করলে ভালো হত।
ঠাম্মা বললেন, বাপরে, ওই আউপাতালি মেয়েকে নিয়ে এক্স-রে করতে যাওয়া! সে যে ভীষণ হাঙ্গামা!
প্রকাশদাদু বললেন, এইগুলো আপনারা ঠিক করেন না। সেবার বললুম একটা ই. সি. জি, ইকো-কার্ডিয়ো. টি এম টি. করিয়ে আনতে, তা সে তো করালেন না। মানুষটা একরকম বেঘোরে…।
ঠাম্মা চোখে আঁচল দিয়ে বললেন, কী করে বুঝব ভাই, দিব্যি ভালো মানুষ, মাঝে মাঝে চোখে সব আঁধার দেখে। এখন, সে তো আমরাও চব্বিশ ঘন্টাই দেখছি, দেখছি না?
ঠিক আছে। হেয়ার-লাইন ফ্র্যাকচার একটা হয়েছে মনে হচ্ছে পায়ের পাতায়, যদি বলেন আমি প্লাস্টার করে দিতে পারি।
কিছু গণ্ডগোল হবে না তো ক—জেই বললেন।
মনে তো হয় না।
শেষে আবার পা বেঁকে-টেকে যাবে না তো! বিয়ে দিতে পারব না তাহলে!
আমার ওপর ভরসাটা যখন এতদিন রেখেছ, তো আরও কিছুদিন রাখো!
উঃ দেড়মাস! মানে ছ সপ্তাহ, মানে ছ সাত্তে বিয়াল্লিশ দিন! পায়ে ভারী প্লাস্টার হাঁটু পর্যন্ত! আর চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকা! তেমন ব্যথা লাগত না আর! কিন্তু অধৈর্যে বিরক্তিতে আমি চ্যাঁচাতুম। মাঝে মাঝে পরিত্রাহি একেবারে।
সে দিনটা ছিল রবিবার। শুয়ে শুয়ে আমার খেয়াল থাকত না কী তারিখ, কী বার। অনেকক্ষণ গল্পের বই পড়ছিলুম, পাশ ফিরতে গিয়ে অসুবিধে হল, তখনই দপ করে মনে পড়ে গেল—ও মা! কেন আমি খালি খালি গল্পের বই পড়ব? কেন চুপচাপ থাকব? এমন এবং একা? কেন কেউ না কেউ আমার বিছানার পাশে থাকবে না। আমার তো অসুখ! বড়োপিসির তো সামান্য টাইফয়েড হয়েছিল, ছোটোপিসি কিংবা ঠাম্মা তখন ঠায় বিছানায় পাশে বসে থাকত না? কাকু বারবার এসে জিজ্ঞেস করত না? গল্প করত না? আর আমার যে পা-টাই ভেঙে গেছে? এটা বুঝি আর অসুখ নয়? তখন আমি আঁ-আঁ করে একটা চিৎকার দিয়ে উঠলুম। বাইরে পায়ের শব্দ। দৌড়ে নয়, কিন্তু বড়ো বড়ো পা ফেলে কেউ আসছে। কে রে বাবা। এ তো আমার চেনা শব্দ নয়। তারপরই দেখি সবেনাশ। দরজার চৌকাঠে রাঙাদার চেহারা। আমি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকারটা গিলে নিয়েছি।
কী হল? লাগছে খুব? থেমে থেমে বললেন।
আমি ভয়ে ভয়ে বলি, না, …
তাহলে?
আমি কোনো জবাব দিই না, শিটিয়ে শুয়ে থাকি।
স্বভাব, আর কী ক—বড়োপিসি ঢুকতে ঢুকতে বলল।
আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করিনি, জিজ্ঞেস করছি পুঁটুকে। কী হল? লাগছে না, তাহলে কাঁদছ কেন?
কাঁদিনি, চেঁচিয়েছি।
ভালো। তা চ্যাঁচালে কেন? অমন বিকট গলায়?
ওর গলাটাই অমন। হেঁড়ে, খ্যানখেনে। বউদির মেয়ের যে এমন গলা হয় কী করে?—বড়োপিসি গড়গড় করে বলে গেল?
তোমার কমেন্ট আমি শুনতে চাইনি ঝুমা, পুঁটু জবাব দাও।
তখন বলি, আমার একা-একা শুয়ে থাকতে আর ভাল্লাগছে না।
তোমরা কেউ ওর কাছে একটু বসতেও পার না? আশ্চর্য! একটা দিন রোববার, তা-ও বাড়ি থাকবার জো নেই।
রাঙাদা বেরিয়ে গেলে পিসি আমায় চাপা গলায় ধমক দিল, তোকে তো ভোম্বল সর্দার দিয়ে গেলুম। তখনই তো এলুম ঘরে। রাঙাদাকে মিছে কথা বললি?
পাঁচটা ছটা আটটা পাতা পড়েছি। আর ভাল্লাগছে না।
আমার আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই। তোর কাছে বসতে হবে? জানিস তিন মাস পরে আমার একটা মস্ত পরীক্ষা!
তো এখানে বসে পড়া করো না।
তুই তো খালি কথা বলিস, বিরক্ত করিস।
কথা বলব না, বিরক্ত করব না।
সত্যি-সত্যি আমি বড়োপিসিকে একটুও বিরক্ত করিনি। যে-ই পাশ ফিরিয়ে পিসি বালিশটা আমার পায়ের নিচে ঠিকঠাক বসিয়ে দিল, আমি সামনের দেয়ালের দিকে চেয়ে রইলুম। খাট, তারপর ফাঁকা, একদিকে বড়োপিসি, একটা চেয়ারে বসে পড়ছে, জানলার দিকে মুখ। আরও খানিকটা ফাঁকা, পাশ-দেয়ালে মস্ত বড়ো আলমারি, তার ওদিকে দেয়াল। দেয়ালটা আমার সবচেয়ে বেশি বন্ধু। কিন্তু আমাদের বাড়ির এই সব মুখগুলোকেও আমি ভীষণ ভালোবাসি। ওই যে বড়োপিসি জানালার পাশে বসে কী পড়ছে, চুলগুলো ঝুলে পড়েছে সামনে, চুলের ফাঁক দিয়ে বড়োপিসির গাল, গালে একটা মাছির মতো আঁচিল, নাকের ডগাটা স্পষ্ট। এখন পিসির মুখে কোনো বিরক্তি নেই, বকুনি নেই। আমার ইচ্ছে করছে পিসি একবারটি এপাশ ফিরে আমার দিকে তাকাক, একবারটি বলুক, লক্ষ্মীসোনা! আমি তো একেবারে লক্ষ্মীসোনার মতোই চুপটি করে রয়েছি। তাহলে বলছে না কেন? কেন বলছে না? বললে তো আমিও পিসিকে আদর করে দেব। কিন্তু পিসি একবারও আমার দিকে তাকায়ই না। ছোটোপিসিকেও তো আমার ভীষণ ভালোবাসতে ইচ্ছা করে? কিন্তু ছোটোপিসি আবার আর এক। দলবেঁধে ওর বন্ধুরা এসেছিল সেদিন। আমি অতগুলো পিসি দেখে ছুটতে ছুটতে গেছি, আমার হাতে নরম ভালুক পুতুল ছিল, জামার পেছনে তিনটে বোতাম ছিল না, কাঁধ থেকে খসে পড়ছিল তাই খালি পায়ে অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছি, পা ধুলোয় ভরা। আমি জানি এইরকম করে বাইরের লোকের সামনে যেতে হয় না। কিন্তু কী করব, আমাদের আলনায় যে আর জামা ছিল না! ওদিকে অতগুলো পিসি।
