যে যখন মায়ের কথা বলত এমনিভাবেই বলত। আর তখনই একমাত্র আমি শান্তশিষ্ট হয়ে বসে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো, সেসব কথা শুনতুম। সমস্ত দুষ্টুমি, দস্যিপনা, অবাধ্যতা ঘুচে যেত। আসলে আমার চোখের সামনে থেকে তখন অদৃশ্য হয়ে যেত যেন ঠাম্মা-পিসি-কাকা জেঠদের, দিম্মা-বড়োমাসি-দাদ সববার মুখ। বাড়ির দরজা জানলা-দেওয়াল যেন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে কোথায় মিলিয়ে যেত। মেঘ করে আসত চারদিক থেকে, ঘন নীল মেঘ, আর হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো এক অপূর্ব মূর্তি ঝলসে উঠত সেখানে। আমার চোখ, মন, সব স-ব দিয়েও আমি সে মূর্তির স্পষ্ট চেহারাটা দেখতে পেতুম না। মনে মনে বলতুম, মা আমি কেন তোমার মতো নয়? আমি কি কোনোদিন তোমার মতো হতে পারব না? অনেক সময়ে সে কথা মুখ ফুটে জিজ্ঞেসও করে ফেলতুম।
দিম্মা, আমি কি কোনোদিনও মায়ের মতো হতে পারব না? যখন অনেক বড়ো হয়ে যাব, তখনও না?
দিদিমা বলতেন, কেন পারবে না? চেষ্টা করো। সবার কথা শোনো, লেখাপড়া করো, চেঁচিয়ো না, ঝগড়াঝাটি কোরো না, লক্ষ্মী হয়ে যা দেওয়া হবে খেয়ে নেবে, সময়ে ঘুমিয়ে পড়বে, যে যা বলবে শুনবে…
সব শুনব? কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেও শুনব? কুমড়ো আর ঝিঙে খেতে বললেও খাব?
হ্যাঁ, সব শুনবে। সব খাবে।
আমার ধৈর্য থাকত না। মাথা ঝাঁকিয়ে বলতুম, তা হলেই আমার দুধে আলতার মতো রং, পদ্মপলাশের মতো চোখ, আর জোছনার মতো হাসি হয়ে যাবে? তাহলেই আমার গানের মতো গলা, মধুরের মতো কথা হয়ে যাবে? তা হলেই সবাই আমার ভালোবাসবে?
বাসবেই তো! লক্ষ্মী হও, তাহলেই সবাই ভালোবাসবে।
দিম্মা আমার আসল ইচ্ছের কথাগুলো কেমন এড়িয়ে গেলেন!
আর বাবা মানে রাঙাদা! বাবার কথা বলতে তো ভুলেই যাচ্ছি। বাবা আমার একটা কষ্টের জায়গা, টিপলে লাগে। বাবার কথা আমি বলি না। কাউকে জিজ্ঞেসও করি না। বাবা আমার দেখা জ্যান্ত মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর। কীরকম দুঃখী-দুঃখী উদাস চোখ, কিন্তু আবার ভীষণ গম্ভীর কথাবার্তা। যখন কথা বলেন ঝকঝকে দাঁত দেখা যায় ঘন তামাটে রঙের ঠোঁট দুটোর মধ্যে দিয়ে। বাবার পায়ের পাতা কী ফরসা। নখে যেন ছোটো ছোটো গোলাপি আয়না বসানো আছে, সুন্দর সাদা ফ্রেমে বাঁধানো। বাবা সকাল আটটায় টাইসুট পরে বেরিয়ে যান, রাত্তির দশটা এগারোটায় ফেরেন। একটু দাঁড়ান, ঠাম্মার সঙ্গে দু-চারটে কাজের কথা বলেন। তারপর নিজের ঘরে ঢুকে যান। একটু পরে ফের বন্ধ দরজা খোলে, ভেতর থেকে ভরভর করে আসে সিগ্রেটের গন্ধ। আমি নাক ভরে গন্ধটা উশশশ করে টেনে নিই। এটা রাঙাদার গন্ধ। মানে আমার বাবার।
পর্দার কোণটা একদিন মুঠো করে ধরেছি। অমনি ভেতর থেকে গম্ভীর গলা, কে? কে ওখানে?
আমি দুদ্দাড় করে পালাতে থাকি। পা পিছলে পড়ে যাই। ধড়াস করে শব্দ হয়। ভীষণ লাগে। কিন্তু আমি দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার সামলাই। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ে। ঠোঁট ফোলে। বাবা বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। পেছন থেকে একটা আলোর ঝলক, একটা গন্ধের ঝলক।
মা-আ—বাবা ডাকতে থাকেন, ঝুমা-আ, তিলু-উ-উ …..পড়িমরি করে সব ছুটে আসতে থাকে। আমি তখন মুড়ে-পড়া ডান হাঁটুটাকে প্রাণপণে সোজা করবার চেষ্টা করছি। ব্যথায় চোখ ফেটে জল আসছে, কিন্তু চিৎকার আসতে দিচ্ছি না। তবে আমার দিকে কেউ দেখল না, সবার দৃষ্টি রাঙাদার দিকে।
কী রাজেন? কী হয়েছে? কী হয়েছে রাঙাদা?
একটা বাচ্চাকে সামলে রাখতে পারো না? বাড়িতে এতগুলো লোক! দেখো তো! পড়ে গেছে। ভীষণ লেগেছে বোধহয়।
ওরকম দুদ্দাড় ও দিনরাত পড়ছে, যা দস্যি, ও সব আদিখ্যেতার কান্না, তুই যা। আমি দেখছি।
বাস রাঙাদা সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। এইবারে আমি হাঁ-হাঁ করে কাঁদতে থাকি।
বড়োপিসি বলে, এতক্ষণ তো চেঁচাচ্ছিলি না? যেই আমাদের দেখলি অমনি…কম সেয়ানা না কি তুই? শেয়ালেও তোর কাছে ছ্যাঁচড়ামিতে হেরে যাবে।
ছোটোপিসি বলে, বকুনি খাওয়াতে ওস্তাদ! মেয়ে তো নয় রাক্কসি একখানা! ঠাম্মা বলেন, আমি রাজার রুটির ময়দা আধমাখা করে রেখে এসেছি। আমার দাঁড়াবার জো নেই। ওকে তোল। দ্যাখ আবার কী ভোগান্তিতে ফেলল! কত করে বলছি একটা বিয়ে কর, বিয়ে কর, হাড় মাস আমার আলাদা হয়ে গেল।
গোড়ালি মচকে গেছে, ডান হাঁটুতে ভীষণ লেগেছে। পিসিরা দু-জনেও তুলতে পারল না, জেঠু এলেন। বললেন, এত চ্যাঁচাচ্ছে যখন নির্ঘাৎ ভেঙেছে।
পিসিরা বলল, ও ওইরকম আউপাতালি। চুনে-হলুদে গরম করে লাগিয়ে দিচ্ছি, ঠিক হয়ে যাবে। উঃ দু দণ্ড শান্তি দেবে না!
কাকু, কোথা থেকে এসে ফুট কাটল, এই আহ্লাদি! এখন দেড়মাস পা সোজা করে শুয়ে থাকবি। নইলে খোঁড়া!
আমি চেঁচিয়ে বললুম, বেশ করব দৌড়োব, দৌড়ে তোমার ঘরে চলে যায় তোমার বইপত্তর হন্ডুল-মন্ডুল করে দেব। তোমার চাদর বালিশ সব ছিঁড়ে দেব।
উঃ, বউদির মেয়ে যে কী করে এমন হয়!–কাকা বিরক্ত হয়ে বলল।
রাকুসি একটা, আসল রাক্কসি—ছোটোপিসির মন্তব্য।
তা আমি তো রাক্কসি, লকলকে জিভ বার করে মুখ ভেংচে পাশ ফিরে শুই। ওদের দিকে পেছন ফিরে। পায়ে আবার লেগে যায়। চোখ দিয়ে জল বার হয়ে আসে। সামনে আমার কেউ নেই, কিছু নেই, শুধু খানিকটা সাদা দেয়াল। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আমি চোখ বুজিয়ে ফেলি, হাতজোড় করে মনে মনে বলতে থাকি, হে দেয়াল! হে দেয়াল! তুমি কার?
