ঘুম যখন ভাঙল তখন চারদিক আলোয় ফটফট করছে। একফালি পুবের রোদ ঠিক আমার ডান চোখের ওপর ধারালো ছুরির ফলার মতো পড়ে আছে। কোথাও কোনো একটা পাখি রোদের ঝলকে দমে না গিয়ে তীব্র মিষ্টি সুরে ডেকেই যাচ্ছে, ডেকেই যাচ্ছে।
মুখ হাত ধুয়ে এসে বসি। হরিসাধনদা রোজকার মতোই বসে আছেন নিজের চেয়ারে। বুধন আমার সাড়া পেয়ে চা আর চিড়েভাজার প্রাতরাশ এনে রাখল। আমি বললাম, দাদা একটু পায়ের ধুলো দিন। করেন কী! করেন কী ক—উনি আমার হাত ধরে ফেললেন।
আমি বলি, কাল যা হল, তা যদি স্বপ্ন না হয় তাহলে প্রণামটা না করতে দিয়ে আপনি আমাকে একটা মস্ত করণীয় থেকে বঞ্চিত করছেন।
উনি আস্তে আস্তে বললেন, প্রণাম? নিশ্চয়ই করবেন। কিন্তু সেটা এখানে নয়। উনি উঠে পড়লেন। ওঁর পেছন পেছন ঘরে ঢুকি। সেই জাজিম, সেই বেদি, তার ওপর সেতারটি শোয়ানো, পাশে আমার ভায়োলিন। উনি বললেন এই আসনে প্রণাম করুন। এ আসন পণ্ডিত গম্ভীরনাথজির। আপনি কাল যা শুনেছেন আর যা বাজিয়েছেন তা পণ্ডিতজির আশীর্বাদ। অমন ঘটে, খুব মাঝে মাঝে, আপনার অদৃষ্টে ঘটে গেল। বেশ কিছুদিন হয়ে গেল। সে সব কথা এখন স্বপ্নের মতোই মনে হয়। সত্যি কি শুনেছি? সত্যি বাজিয়েছিলাম? সত্যি এমন কোনো ঘটনা ঘটেছিল, কেসের ডালাটা খুলে আমার তন্বী যন্ত্ৰিণীর দিকে চেয়ে প্রশ্ন করি, যা শুনেছিলাম সে কি সত্যি? আর একবার অমনি করে বাজো না যন্ত্র! যন্ত্র আমার দিকে নিস্পলক চেয়ে থাকে। তার মেহগনি শরীরে বোবা কষ্ট। হরিসাধনদার সঙ্গে আমার কখনোই তো আর দেখা হয়নি কিনা! সপ্তাহ দুই পরে ওঁর কালীকুণ্ডু লেনের বাড়িতে গিয়ে শুনি হঠাৎ মারা গেছেন। মধুপুরেই ওঁর অন্ত্যেষ্টি হয়ে গেছে। জানাল ওঁর ভাগনে।
সুরূপা-স্বরূপা
জ্ঞান হয়ে থেকে আমি আমার মাকে দেখিনি। শুনেছি, আমি জন্মেছি বলেই মা মারা গেলেন। দুদিন যায়—তিন দিন যায়, আমার ঠাম্মা চোখ গোল্লা গোল্লা করে বলেন, তাপর আমাদের চোখের সামনে অমন লক্ষ্মীর প্রতিমা বউ আমার চোখ বুজল। আমি বলি, তাহলে ব-পিসি হবার সময় তুমি কেন চোখ বোজনি?
ঠাম্মা ঢোঁক গেলেন, ভুরু কুঁচকে বলেন, বাপ রে, মেয়ে তো নয় উকিল ব্যারিস্টারের বাপ। নাও, এখন বোঝাও। আরে তোর মায়ের যে আগে থেকেই একটা বুকের দোষ ছিল! আমার ধাঁধা লেগে যায়। তা হলে সেই বুকের দোষটাই তো মাকে মেরেছে, আমি তো মারিনি। তবু কেন সকলে আমাকে মা-খাকি বলবে! কেন বাবা আমার ছায়া মাড়াবেন না!
আমি কালো, আমার গায়ে খড়ি, আমার চুল খ্যাংরাকাটির মতো। আমার চোখ হাতির চোখ, নাক বড়ি, ঠোঁট যেন দশ পয়সা। আমি একটি ঢিপসি। পিঁপড়ে কামড়ালেও চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করি, কথা শুনি না, যেটা বারণ করা হবে সেটাই আমি করব, অবাধ্য, অসভ্য, আমাকে আদব শেখানো আর ভস্মে ঘি ঢালা একই কথা। তার ওপর আমি ঝগড়াটি, এতটুকু সহ্য নেই। কেউ একটা কথা বললে আমি দশটা কথা শুনিয়ে দিই, কেউ যদি একটা চড় মারে, আমি তাকে শুইয়ে ফেলে তার ওপর চড়ে বসি, ধারালো দাঁত দিয়ে কামড়ে দিই বুকের মাংস ঠিক যেন ভীম, দুঃশাসনের রক্তপান করছি। হ্যাঁ এই একটা জিনিস আমার আছে, প্রচণ্ড গায়ের জোর। রাগলে না কি আমার হাতির চোখই ভাঁটার মতো হয়ে যায়, জ্বলতে থাকে, তখন আমি যা সামনে পাব ভাঙব চুরব ফোঁস ফোঁস করে ফুসব, যেন জাত-গোখরো।
সবাই বলে অমন মায়ের যে এমন মেয়ে কী করে হয়! তার সাত চড়ে রা ছিল না, মুখে সবসময়ে হাসি, মিষ্টিমধুর কথাবার্তা! দেখলে চোখ জুড়িয়ে যেত!
তা সে তো আমি দেয়ালে টাঙানো ফোটো-ফ্রেমের মধ্যে, টেবিলের ওপর সবসময় দেখি। ঠিক যেন ঠাকুর দেবতা! আমার দিম্মা পাঁশকুড়োয় থাকেন, বলেন, ফোটোর বাইরের মা ফোটোর মায়ের চেয়েও সুন্দর ছিলেন। মাটিতে পা ফেললে মনে হত পদ্মফুল ফুটে উঠল। কথা কী! যেন মধু ঝরছে! আমার মাসিরাও ফরসা, পিসিরাও তো কালো নয়, কিন্তু মায়ের কাছে সবাই কালো। পিসিরাই বলে মা যখন বউ হয়ে এসে দুধে-আলতায় পা রাখলেন, দুধে-আলতায় থেকে মায়ের পা আলাদা করা যায়নি। পিসিরা সব মুখ লুকিয়ে ফেলেছিল। জেঠু, যিনি সবসময়ে টেবিল-চেয়ারে পড়াশোনা করেন তিনি বলেন, পুঁটু কাউকে বোলো না, বেশি খাটো নয়, বেশি লম্বা নয়, মোটা নয়, রোগা নয়, তোমার মা ছিলেন পদ্মিনী নারী। পদ্মপলাশের মতো চোখ, পাখির ডানার মতো ভুরু, বাঁশি-হেন নাক, মুক্তা-জিনি দাঁত, জ্যোৎস্নার মতো হাসি। ওঁরা স্বর্গের পরি, দেখলে আমাদের মতো মানুষের মাথার ঠিক থাকে না। মানুষ ওঁদের ধরে রাখতে পারে না। চন্দননগরের বড়োমাসি বলেন, তোর মা শুয়ে থাকলে মনে হত ভোরের প্রথম সূর্যের আলো পড়ে রয়েছে, বসে থাকলে মনে হত রূপকথার পাতা থেকে একটা ছবি কেটে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। চলত না যেন হালকা হাওয়ায় পাখির মতো উড়ত, আর চুল? সে এক ঢেউ-খেলানো মিশমিশে কালো জলপ্রপাত।
বড়োমাসি আর দিদিমা বলাবলি করতেন, ভেবেছিলুম কোনো রাজবাড়িতে বুঝি রানি হয়ে যাবে। তা আমাদের মতো লোকের কপালে আর…!
মা নাকি ছিলেন ভদ্র, বিনীত, হাসিমুখ, সবার কথা ভাবতেন, সবাইকে সুন্দর দেখতেন, ভালোবাসতেন, তাই সব আত্মীয়স্বজন কুটুম পাড়াপড়শিও ছিল তাঁর আপনজন। কোনোদিন মুখের ওপর কাউকে একটা কথা বলতেন না। আমার একেবারে উলটো।
