আপনি পড়েছেন?
আমি বলি, দাঁড়ান দাঁড়ান পণ্ডিত গম্ভীরনাথ সেতারের সিদ্ধশিল্পী যাঁকে শেষ বয়সে পা জখম হয়ে যাওয়ায় লোকে ল্যাংড়া পণ্ডিত বলত?
এইবার হরিসাধনবাবু জোড় হাত কপালে ঠেকালেন, বললেন, আপনি পড়েছেন তাহলে?
আমি বলি, হ্যাঁ, আমার মামাতো বোন সুচরিতার বাড়িতে হঠাৎ হাতে এসেছিল, কিন্তু সে তো আপনার লেখা বলে…
উনি হেসে বললেন, মাথা খারাপ? নিজের নামে লিখি কখনও! পর্যটক নাম নিয়ে লিখেছিলাম। যাক আপনি পড়েছেন… সমস্ত মুখে ওঁর খুশি ছড়িয়ে পড়ল, বললেন, আপনার সঙ্গে তাহলে শেয়ার করা যায়।
আপনার কাছে নিশ্চয়ই কপি আছে। এবার ফিরে গিয়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব। আর একবার ভালো করে পড়ব। খামচা খামচা পড়েছি তখন, ভালো লাগছিল খুব।
যাঁদের কথা লিখেছি তাঁরা সব অখ্যাত, কিংবা নিজেদের এলাকার মধ্যে একটা ছোট্ট মহলে পরিচিত। শেখান, বাজান বা গান, অত নাম ডাক পয়সাকড়ি কিছুরই তোয়াক্কা করেন না। তাঁদের কথা জানতে পেরেছি এটাই লাভ। এটাই ও লেখার আসল মূল্য।
আমি বলি, না, না খুব ডিটেইলে আমার মনে নেই ঠিকই। কিন্তু এই কেরকার, ওই গম্ভীরনাথ, কতকগুলো সুন্দর টুকরার মতো গেঁথে আছে মনে। আচ্ছা সত্যি ওঁকে ল্যাংড়া বলত বলে উনি রাগে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন? আচ্ছা ছেলেমানুষ তো!
তাই বটে—হরিসাধনবাবু হাসলেন, গানের অগাধ পণ্ডিত হলে কী হবে, ছেলেমানুষের মতোই মান-অভিমান ছিল। আসলে দেখতে খুব সুপুরুষ ছিলেন তো! টকটকে রং, কাটা কাটা নাক মুখ, আকৰ্ণবিস্তৃত চোখ। রুপোলি চুল একটু ঢেউ খেলানো, দীর্ঘকায়। কপালে সিঁদুরের ফোঁটাটি পরে যখন আসরে বসতেন মনে হত একটি লম্বা প্রজ্বলিত মোমবাতি। রূপ নিয়ে ছিল খুব গর্ব। পাটনায় থাকতেন। গঙ্গায় চান করতে গিয়ে একবার ভীষণ পড়ে গেলেন। একটি পা হাঁটু থেকে কাটা গেল। আর যায় কোথা! একটা ঝোপড়পট্টির পাশে থাকতেন, সেখানকার বাচ্চারা ল্যাংড়া পণ্ডিত ল্যাংড়া পণ্ডিত বলে অস্থির করে দিতে লাগল। ক্রমে বড়োরাও ধরল। প্রথমটা ছেলেদের সঙ্গে রাগারাগি, চ্যাঁচামেচি। তারপর একদিন এক বস্ত্রে গৃহত্যাগ করে গেলেন। লিখে গেলেন ম্যায় যা রহা হুঁ। বাস।
আচ্ছা! একেবার নিরুদ্দেশ?
নিজের লোকেদের কাছে তাই। এসে উঠলেন আসানসোল এক রইস ভক্তর কাছে। তাঁর সঙ্গে কড়ার হল, কাউকে কোনোমতেই তাঁর খবর জানাতে পারবেন না। আসরে উনি ক্রাচ নিয়ে কিছুতেই উঠবেন না। সে নাকি বহোৎ শরম কি বাত! তবে ভদ্রলোকের নাতিকে উনি গড়ে পিটে নিজের মতো ওস্তাদ বানিয়ে দেবেন। এই অনর্থক ইগোর আবদার মেটাতেই তাঁর আশ্রয়দাতা গুণগ্রাহী ভদ্রলোক অগত্যা পণ্ডিতজিকে নিয়ে তুললেন নিজের এক নির্জন বাগানবাড়িতে। আর নাতিটিকে ভরতি করে দিলেন পণ্ডিতজির খিদমতগারি বলুন খিদমতগারিতে, শাগরেদি বলুন শাগরেদিতে।
এবং আপনিই সেই নাতি।
তবে? হাসিমুখে বললেন উনি, এবং সেই বাগানবাড়িটিই এই মুরারিকুঞ্জ।
বলেন কী—আমার শরীরের মধ্য দিয়ে কেমন একটা রোমাঞ্চের শিরশিরানি বয়ে যায়। এই মুহূর্তে আমি দাঁড়িয়ে আছি সংগীতের অজানা ইতিহাসের এক অজ্ঞাতবাসের পাতায়?
হরিসাধন বললেন, আমাদের কালী কুণ্ডু লেনের বাড়িতে, আসানসোলের বাড়িতে কত জলসা বসেছে। ওই পরিবেশ, তারপরে আরাম-বিলাস, এতে বাবার অল্প বয়সটায় খুব ক্ষতি হয়ে যায়। ঠাকুমা এ জন্য ঠাকুরদাকেই দোষ দিতেন। আমার ছোটোবেলায় এঁদের এমন ঝগড়া আমি বহু শুনেছি। ঠাকুরদা বলতেন, যা আমার অমৃত, তা যে আমার ছেলের গরল হয়ে দাঁড়াবে, কী করে বুঝব বলল। মূলত বাবার কাছ থেকে সরিয়ে রাখবার জন্যই উনি আমাকে এই মধুপুরের মুরারিকুঞ্জে পাঠিয়ে দেন। ইচ্ছে ছিল বাজনটাও ভালো করে শিখি। সেই বছর আষ্টেক বয়সেই আমি সেতার-টেতার ভালোই হ্যান্ডল করতাম নাকি! মা-ও আসতেন। কিছুদিন থেকে চলে যেতেন। এখানে আমার একজন গৃহশিক্ষকও থাকতেন। তাঁরই কাছে পড়াশোনা করতাম। আর…
বলুন। থামলেন কেন? অমন গুরুর একটিমাত্র শাগরেদ।
ও কথা বলে আমাকে লজ্জা দেবেন না… বলে উনি বিষণ্ণ মুখে এমন করে চুপ করে গেলেন যে সে নীরবতার সম্মান না রেখে আমি পারলাম না।
এসব কথা অবশ্য এক দিনে হয়নি। হরিসাধনবাবু কথা বলেন খুব থেমে থেমে, প্রত্যেকটি কথা যেন অনিচ্ছুক স্বরযন্ত্রের মধ্যে থেকে টেনে বার করছেন। হা-হা করে উনি হাসতেও জানেন না। ওঁর সংস্পর্শে আমারও ফড়ি, অযথা কথা, চ্যাঁচামেচি এসব বন্ধ। ভোরবেলা আমি অভ্যাসমতো একটু বেড়িয়ে আসি। চমক্কার জায়গাটা। প্রাণভরে নিশ্বাস নিই। বুকে যেন নতুন করে জোর আসে। উনি কোনোদিনই আসেন না। অনেক ভোরে ওঠেন টের পাই। নিস্তব্ধ জায়গা একটু হাঁটাচলার শব্দ, কাশির আওয়াজ এসব স্পষ্টই বোঝা যায়। কিন্তু আমি যখন বেরোই, তখন ওঁর ঘরের দরজা দৃঢ়ভাবে বন্ধ থাকতেই দেখি। কী করেন কে জানে! সাধনভজন হতে পারে। কিন্তু উনি যখন বলেন না, আমি তখন জিজ্ঞেস করা সমীচীন মনে করি না। যখন ফিরি, তখন উনি স্নান সেরে ফিটফাট তৈরি। ভেতর দিকের দাওয়ায় দুটি ফোল্ডিং চেয়ার পড়ে, একটি ফোল্ডিং টেবিল। তার ওপরে চা এবং জলখাবারের ব্যবস্থা। তখন চা খেতে খেতে গল্প হয়। আগের দিনের কাগজটা হাতে পাই তখন। রাজনীতির খবর নিয়ে দু-একটা মন্তব্য, অন্য কোনো ভালো নিবন্ধ থাকলে দুজনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ি। উনি হয়তো বললেন, থার্ড লেটারটা পড়ুন দাদা, ঠিক বলেছে।
