জসিডি এসেছি, গিরিডি এসেছি, কিন্তু মধুপুরে আমি এই প্রথম। জায়গাটা দেখলাম স্টেশন রোড় বাদ দিলে তেমন ঘিঞ্জি নয়। প্রকৃতি তো একরকম হবেই। কিন্তু মধুপুর এখনও অনেক ফাঁকা, স্বাভাবিক। বিশেষ করে এই হল্লাটার এলাকাটি। হল্লাটারের মোড় পেরিয়ে বাহান্ন বিঘে শুরু। রাস্তার ধারে বাড়ি টাড়িগুলোর বেশিরভাগই ভগ্ন দশা। তবু তারই মধ্যে কোথাও একটা-দুটো পলাশ মেটে রঙের ফুলে আকাশ আলো করে দাঁড়িয়ে আছে। দু-তিনটে য়ুক্যালিপ্টাস যেন ঠিক রুপোর থাম। ওই তো মাঝখানে বিরাট ইঁদারা আমার প্রথম ল্যান্ডমার্ক। কে টিলি সাহেবের বাংলোর নাম করি। অমনি কেটলি সাহেব? বলে শনশনিয়ে প্যাডল মেরে আমার পৌঁছে দেয় রিকশাওয়ালা। চমৎকার কাচটাকা বাংলোটি। ফুলে ফুলে ভরা বাগান। তবে আমার গন্তব্য তো কেটলি সাহেবের বাংলো নয়! তার পাশে মধুপুরের লালধুলো মাখা ঈষভগ্ন মুরারিকুঞ্জ। পড়ন্ত রোদে গায়ে পাঞ্জাবি চড়াতে চড়াতে বেরিয়ে আসছেন হরিসাধনবাবু। স্মিত হেসে বললেন, এলেন তাহলে?
এত্তেলা পাঠালেন। কী করি বলুন?
স্নানাহার হয়েছে?
ও সব হাঙ্গামা তো চুকিয়েই বেরিয়েছি। বাঃ বেশ জায়গাটি।
এই মুরারিকুঞ্জ কিন্তু মোটেই আমার বমপাস টাউনের মালঞ্চমালার থেকে কোনো অংশেই ভালো নয়। তেমন দেখাশোনা হয় না এটা স্পষ্ট। কিন্তু আমার কেমন মনে হল বাড়িটির একটা বিশেষ জলহাওয়া আছে যেটা আমার পক্ষে বেশ স্বাস্থ্যকর। যেন অনেকক্ষণ ধরে তার বাঁধতে বাঁধতে এইমাত্র সবগুলি সুরে বলে উঠল। হরিসাধনবাবুর ব্যক্তিত্বের জন্যই এটা হল কিনা বলতে পারি না। সন্দেহ নেই ভদ্রলোকের একটা প্রভাববলয় গোছের কিছু আছে। আমার মন আমার ভেতরের চাহিদাগুলোর সঙ্গে মানিয়েই যেন উনি তৈরি। ভালো। অনেক রকমের অভিজ্ঞতাই তো হল জীবনে! এবার এই আধবুড়ো বেলায় আর এক অপরিচিত আধবুড়োর জন্যে টান! জীবনে কখনও তেমন সত্যিকারের বন্ধু পাইনি। আমার মতো গুজগুঁজে লোকের নাকি বন্ধু হয়ও না, এ কথাও একাধিক প্রিয়জনের কাছ থেকে শুনেছি। তা এইবারে আমার সেই বন্ধুত্ব লাভের ফাঁকা কোটাটা বোধহয় পূর্ণ হতে চলল।
বুধুয়া…ভারী গম্ভীর স্নেহমাখানো গলায় উনি ডাকলেন।
একটা অল্পবয়সি সাঁওতাল ছেলে এসে দাঁড়াল। ঠিক একটি বাংলা লোককথার রাখাল ছেলে। গোরু তাড়াবার পাচনবাড়ি আর দুপুর যাপনের বাঁশের বাঁশিটি হাতে ধরিয়ে দিলেই হয়।
দ্যাখ, ইনি আমার বন্ধুলোক। মালপত্র ভেতরে নিয়ে রাখ। কলঘরটা দেখিয়ে দে আর ভালো করে চা কর।
আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, যান হাত মুখ ধুয়ে আসুন। আমি এখানে অপেক্ষা করছি।
দাওয়ার ওপর দুটি বেতের গোল চেয়ার। ইদারার চমৎকার জলে হাত মুখ ধুয়ে দাওয়ায় এসে দ্বিতীয় চেয়ারটা দেখাই, বলি, কী ব্যাপার! হাত গুনতে জানেন নাকি?
উনি বললেন, প্রতিবেশী দু-একজন এলে আসেন। আমরা অনেক দিনের বাসিন্দা তো? তবে—আমার দিকে চেয়ে বললেন—মাথার মধ্যে একটা অন্য প্রতীক্ষা ছিলই, বুঝলেন তো? …তা আর বুঝিনি, না বুঝলে আর এতটা পথ বাসের ঝাঁকুনি খেতে খেতে আর ধুলো মাখতে মাখতে চলে আসি?
দিনগুলো অতঃপর চমৎকার কাটতে থাকে। অভ্রের কুচি ছড়ানো কালো আকাশের তলায় কখনও বসে, কখনও হাঁটতে হাঁটতে কথা হয়। অনেক রাতে চাঁদ ওঠে। পুরো রাস্তাটা, রাস্তার মোড়ে যুগল শিরীষ, টিলি সাহেবের কাচের বাংলো কিছুই তখন আর এ জগতের থাকে না।
হরিসাধনবাবু মানুষটি অকৃতদার। ঠাকুরদাদার কয়লাখানি ছিল। সোনার চামচ মুখে জন্মেছিলেন অর্থাৎ। কিন্তু সে সব ওঁর বাবার আমলে চুকেবুকে যায় যা বুঝলাম। বাবা মানুষটি আলালের ঘরে দুলাল ছিলেন। অতি শৌখিন, বিলাসী, অলসও বটে। নিজের বাবার দোষ-ঘাটের কথা আর উনি স্পষ্ট করে কী বলবেন। কিন্তু বাবার রকমসকম দেখেই বোধহয় উনি বিয়ে থার মধ্যে যাননি। এটা অবশ্য আমার অনুমান। এক ভাই এক বোন। বোনের স্বভাবতই বিয়ে হয়ে গেছে। কলকাতা আসানসোলে খান দুই বাড়ি আর এই মুরারিকুঞ্জ, এটুকুই এঁর ভাগে পড়েছে। এভাবে খবরগুলো জানতে পারিনি অবশ্য, কোনো কৌতূহলও দেখাইনি। কথায় কথায় একটু একটু করে খবরগুলো প্রকাশ হয়ে পড়েছে। ঠাকুরদাই ছিলেন মুরারিমোহন। ঠাকুরদার ওপর হরিসাধনবাবুর অগাধ শ্রদ্ধা। এই ঠাকুরদা এবং মা ওঁকে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে বড়ো করেছেন। তবে জীবনে কাজ বলতে উনি দুটি করেছেন। এক দেশবিদেশে ঘুরে ঘুরে গুণীদের গানবাজনা শোনা এবং সে নিয়ে লেখালেখি। আর দ্বিতীয় হল—সেতার বাজানো। সংগীত নিয়ে লেখাজোখা করেছেন। আমার খুব শখ এ ধরনের বই পড়ার। কই আমি…আমি আশ্চর্য হয়ে যাই। হরিসাধন লাহিড়ির লেখা কোনো বইয়ের কথা আমি মনে করতে পারলাম না।
উনি কুণ্ঠিত গলায় বললেন, আমার আবার লেখা, তাও আবার আপনার চোখে পড়বে! অখ্যাত প্রকাশক, যেমন তেমন করে ছেপেছে। ভাষা-ভাব এসবের কী-ই বা আমি জানি। তবে কী জানেন? অনেক অখ্যাত কিন্তু খানদানি গুণীর কথা আছে বইগুলোতে ডায়েরির মতো করে। সেগুলো সংগীতপ্রিয় মানুষের কাছে…
আছে আপনার কাছে…
এখানে নেই। কলকাতার বাড়িতে আছে।
আমি ভাবছিলাম। ডায়েরির মতো করে লেখা দেশবিদেশের ভ্রমণকাহিণি তার মধ্যে গান, গুণী…কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে ব্যাপারটা! বলি, আচ্ছা, সেই মহারাষ্ট্রর গনেশপুরী নামে একটা গ্রামে নারায়ণ কেরকার বলে এক সরোদিয়া…
