ভদ্রলোককে আমার ভালো লেগেছিল বললে কম বলা হবে। যেন একটা টান। অনেক দিনের জমানো টান। আমার এই বাহান্ন-তেপ্পান্ন বছর বয়সের অবসরপ্রাপ্ত গেরস্থ জীবনে নতুন করে যে আর কিছু পাবার নেই তা আমার চেয়ে ভালো কে জানে! যে নিস্পৃহ নিষ্ক্রিয় ধরনের মন উত্তরষাটে আসার কথা, তা গ্রহের ফেরে উত্তর পঞ্চাশেই আমার এসে গেছে। এদিকে বনং ব্রজেৎ জাতীয় কোনো তাগিদও মনের মধ্যে টের পাই না। চারদিকে যেসব উপকরণ, ঘটনা, সম্পর্ক ছড়িয়ে আছে তার থেকেই আমার ব্যস্ত থাকার, ভালোলাগার জিনিসগুলো খুঁজে নিতে হয় এখনও। একমাত্র এই বাজনা। বাজনাটুকুতেই আমার নিজস্ব কিছু বাড়তি আনন্দ যা আমি অন্য কিছুতেই আর পাই না। এক সময়ে খুব বাজাতাম। বাইশ-তেইশ বছর বয়স যখন, তখন পাড়া বেপাড়ায় জলসা হলে উদ্বোধনী সংগীতের আশেপাশে উদীয়মান ভায়োলিন শিল্পী সোমেন্দ্রনাথ সরকারের নামটা থাকত। তারপরে জায়গা হল সংগতিয়া হিসেবে। কোথায় বিরহ, বিচ্ছেদ, মৃত্যুর সময়ে করুণ এফেক্ট দিতে হবে। নৃত্যনাট্যে, নাটকে। কখনও কখনও ফিলম ওসব জায়গায় আমার ডাক পড়ত। কিন্তু একক স্বাধীন শিল্পী হিসেবে বাজাবার আর সুযোগ পাইনি। তা নিয়ে আমার অবশ্য কোনো নালিশ নেই। কিন্তু সেরকম বাজাতেই বা পারলাম কই? ওই সুচরিতার মতোই আমি আমার পরিবারের ভি.জি যোগ। আমার কথা সুচি কতটা কী বুঝতে পারে জানি না, কিন্তু ওর কথা তো আমি সেই জন্যেই অত ভালো বুঝতে পারি। তা ছাড়া, এখনও বাজনা নিয়ে কেউ কোনোরকম কটাক্ষ করলে আমার বড্ড লাগে। আমার স্ত্রী করে। ওঃ, ওই তোমার প্যাঁও প্যাঁও আরম্ভ হল—একদিনের জন্যে অন্তত রেহাই দাও না। ছেলে কিছু বলে না, বলেনি কোনো দিন। কিন্তু ওর বন্ধুরা হয়তো এক দঙ্গল বাড়িতে আড্ডা মারতে এসেছে—মেলোমশাই, আপনার সেই ভায়োলিনটা? আছে এখনও। যেন আমিও প্রাগৈতিহাসিক, আমার ভায়োলিনও প্রাগৈতিহাসিক। কিছু বলি না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভীষণ রাগ হয়, যে রাগ কষ্টেরই ওপিঠ। তাই এইরকম যখন বেরিয়ে পড়ি, বেশির ভাগ সময়েই যন্ত্রটা আমার সঙ্গী হয়।
দীর্ঘ দশ এগারো কি তার চেয়েও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম আমার কারও সম্পর্কে কৌতূহল হল। একটা আকর্ষণই বলব। ভদ্রলোক বলে গেলেন, আমার ভালো লাগবে আপনারও লাগবে—কী রকম একটা প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন কথাটা। আমি কি তাহলে এই উত্তর-পঞ্চাশে একজন সমমনস্ক বন্ধু পেতে চলেছি?
দেওঘরে বহুবার এসেছি। যখন তখন আসি বমপাস টাউনের ফুলে-ভরা মালঞ্চমালা নামের বাংলোটায়। দেশি কেয়ারটেকার বংশীধর ও তার পরিবার আমাকে আকণ্ঠ চেনে। কখন কী দরকার বলবার প্রয়োজন পর্যন্ত পড়ে না। ভোরবেলায় বাংলো থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে ক্লক-টাওয়ারের মোড় পর্যন্ত চলে আসি। তারপর আরেকটি সড়ক ধরে উইলিয়ামস টাউনের পথ ধরে চলে যাই রামকৃষ্ণ মিশনের স্কুলের হাতা পর্যন্ত। এবার আস্তে আস্তে ফিরি। ততক্ষণে সূর্য উঠে গেছে। বংশীধরের চা তৈরি। চা এবং আনুষঙ্গিক। খাওয়াদাওয়া সেরে একটা বই নিয়ে আসি। বাংলা আর ইংরেজি কিছু পেপারব্যাক এখানে থাকেই, দু একখানা সঙ্গে আনি কি না আনি। পড়তে পড়তে ক্যানভাসের ইজিচেয়ারে চোখ জড়িয়ে আসে, মধুফুলের গন্ধমাখা হাওয়া বয়। এই চটকাটুকু ভাঙলে তবে চান। সে-ও বেশ সময় নিয়ে। এসব অঞ্চলের জলে হাওয়ায় কেমন একটা অপাপবিদ্ধ, সোঁদা সোঁদা টাটকা গন্ধ থাকে। শুধু নিশ্বাস নিতেই একটা অগাধ আরাম। বংশীধরের বউয়ের বাঙালি রান্নাও ঠিক বাঙালি রান্নার মতো হয় না। এই তফাতটুকুও আমার মন্দ লাগে না। অচেনার সঙ্গে বসবাসের রোমাঞ্চের এটাও যেন একটা অঙ্গ। আমার গিন্নি বলেন, দূর! এটা কি বাঁধাকপি হয়েছে না গোরুর জাবনা হয়েছে? মিষ্টি পড়েনি। কষা হয়নি। পাতাগুলো ড্যাবড্যাব করছে,! ও পার্বতী, এ কেমন বেঁধেছ? আমার কিন্তু এইরকমই ভালো লাগে। এখানে দুপুরটায় খুব পাখি ডাকে। এদের ভিটেয় দেখি বারোমাসই ঘুঘু চরে। কিন্তু ভিটেমাটি চাটি হয়ে যাবার কোনো লক্ষণ এখনও পর্যন্ত তো দেখি না! সন্ধেবেলা একটু বেড়াই। কাছাকাছি। কিন্তু অন্ধকার একটু গাঢ় হতে না হতেই আমার যন্ত্র আমার টানতে থাকে। চিবুক দিয়ে পরম সোহাগে যন্ত্র চেপে ধরে ছড় চালাই, এখানে কেউ শোনার নেই। গাছগুলো ছাড়া। বংশীধরের ফ্যামিলি হয়তো শোনে কিন্তু তারা তো বিচার করে না। সুতরাং এইখানেই সোমেন্দ্রনাথ সরকার উদীয়মান বেহালা-শিল্পীর প্রকৃত মুক্তি। এই অস্তায়মান কালে।
দিন দশেকের কড়ারে এসেছি। দশদিনই যে পুরোপুরি থাকতেই হবে এমন কোনো কথা নেই।
আবার দশ দিন পেরিয়ে গেলেও কিছু যাবে আসবে না। কিন্তু এবার দিন পাঁচেক কাটতে না কাটতেই ভেতরে একটা পালাই পালাই রব টের পাই। এমন নয় যে বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু হেথা আর নয়। মন যখন ভীষণ অস্থির হয়ে থাকে তখনও এইরকম হয়। আমার আবার মন উচাটনের কারণ কী? নিজের মনের ব্যবহারে নিজেই অবাক হই। অন্ধকার বারান্দায় জোনাক জ্বলা দেখতে দেখতে ভাবি। তারপর আস্তে আস্তে বোধোদয় হয় যে একাকিত্ব আর ভালো লাগছে না। সঙ্গপিপাসা পাচ্ছে। যাচ্চলে! যে একাকিত্বর জন্য তিনশো উনত্রিশ কিলোমিটার উজিয়ে আসা সেই একাকিত্বই আউট? সঙ্গপিপাসা ইন? আরও ভাবি। বাজাতে বাজাতে, বেড়াতে বেড়াতে ভাবি। অবশেষে ঘুমোতে ঘুমোতে টের পাই সঙ্গপিপাসার দোষ নেই। আসলে পছন্দসই সঙ্গী পাবার একটা সম্ভাবনাতেই এমন আকুলিবিকুলি। হরিসাধন লাহিড়িমশাই আমাকে টেলিপ্যাথিক ডাক পাঠাচ্ছেন। সুতরাং আর দেরি করি না, সংকোচও নয়, ঝুলি কাঁধে, বেহালা বগলে ওল্ড মিনা বাজার স্ট্যান্ড থেকে মধুপুরের বাস ধরি।
