ভদ্রলোক মুখটা নামালেন, হাতের নখগুলো যেন পরীক্ষা করছেন, তারপর মুখটা তুললেন, কোনো নির্দিষ্ট দিকে দৃষ্টি নেই, আস্তে আস্তে বললেন, ঠিকই, ঠিকই…। কিন্তু কী করে এই তফাতটা ধরা সম্ভব বলুন তো! অনেকেই দেখেছি, ছোটোতে আশ্চর্য ক্ষমতা দেখায়, সত্যিকারের খাটাখাটনি মানে যাকে বলে সাধনা সেটা ঠিকমতো করে গেলে…।
কথাটি উনি শেষ করলেন না।
প্রতিভা মানে যে নিরানব্বই ভাগ ঘাম ঝরানো, আর এক ভাগ মাত্র প্রেরণা কি ক্ষমতা…এ তো সত্যিই অনেকেই বলে থাকেন–আমারও মনে পড়ে।
ধরুন সংগীত-বাদ্যে বড়ো বড়ো ওস্তাদদের অনেকের পরিশ্রমের কথা তো আমরা শুনেইছি। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, আলি আকবর খাঁ সাহেব, বিলায়েৎ খাঁ সাহেব এঁদের পরিশ্রম তো অমানুষিক—উনি বললেন।
আমি যোগ করি, বিজয় মার্চেন্ট শুনেছি আয়না মোড়া ঘরে সারারাত শ্যাডো প্র্যাকটিস করতেন। তবে না পার্ফেকশন।
উনি বললেন, এঁরা সফল হয়েছেন তাই এঁদের নাম শুনি। কিন্তু আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না, কত মানুষ আছেন যাঁরা অতটাই পরিশ্রম করেছেন। ক্ষমতাও ছিল। কিন্তু কী যেন একটা ছিল না তাই…এখন কী সেই জিনিস যাতে প্রতিভা ও ন্যাক-এ তফাত করে? কী করে বোঝা যাবে?
আমি জবাব দেবার চেষ্টা করলাম না। কেন না জবাব তো আমার জানা নেই। উপরন্তু দুজনেই একই প্রশ্নের জবাব খুঁজছি! আমার নিজের ছেলের কথা মনে হল। মাত্র সাত বছর বয়সে ছেলেটা দিব্যি দাবা খেলত! অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন—ওকে তৈরি করো। খেলা শেখাও, ক্লাবে পাঠাও, প্রতিযোগিতার নাম দাও। আমি শুনিনি। রমু ঠিক আর পাঁচটা ছেলের মতো পড়েশুনে খেলে-ধুলে বড়ো হয়েছে। স্ত্রীকেও সাবধান করে দিয়েছিলাম, খবর্দার ওর মাথায় দাবার ভূত চাপিয়ো না। খেলছে খেলুক। কিন্তু মাথায় যেন পোকা না ঢোকে যে ভবিষ্যতে ওকে গ্র্যান্ডমাস্টার হতেই হবে।
ছেলের বেলায় সাবধান হতে পেরেছি। কেননা সুচরিতার গল্পটা আমার জানা ছিল। আমার সেই মামাতো বোন যার শ্বশুরের বমপাস টাউনের বাড়িতে আমি বেড়াতে যাচ্ছি। সুচরিতার নাচ-গান দুটোতেই স্বাভাবিক পটুতা ছিল। চলা ফেরায় চমৎকার একটা ছন্দ। এর ওর দেখে এমন সুন্দর নাচত, যে প্রথম সুযোগেই মামা-মামিমা ওর নাচ শেখার বন্দোবস্ত করলেন। এটা ওটা শিখে ভরতনাট্যম শুরু করেছিল। প্রচুর পরিশ্রম। ওরও, ওর মা মানে আমার মামিমারও–সেই কোন রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিট থেকে টানতে টানতে ডোভার লেন। সপ্তাহে তিন দিন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। গুরু বদল করা হল। নতুনজন বললেন, এ কী! ও নাচবে কি মা! ওর পা যে ভেতর দিকে সামান্য বাঁকা। এ রকম শারীরিক ত্রুটি নিয়ে নাচের পেছনে সময় নষ্ট না করাই ভালো। ভরতনাট্যমও হল না, ওর স্বাভাবিক ছন্দটাও গেল। ওরা তখন ঠিক করলেন ওকে গান শেখাবেন। ভোরে দুঘন্টা, সন্ধের দুঘন্টা বাঁধা রেওয়াজ। নামকরা শিক্ষক। সুচরিতা এখনও ছোটোখাটো পারিবারিক অনুষ্ঠানে গান করে থাকে। বিয়ের বাসর, বিবাহবার্ষিকী, জন্মদিন…। ও আমাদের পরিবারের লতা মঙ্গেশকর ধরুন। কিন্তু অনেক চেষ্টা চরিত্র করেও ও এর চেয়ে বেশি কিছু আর করতে পারেনি। নাম-যশ-প্রতিষ্ঠার কথা বলছি না। স্রেফ গানের গুণাগুণের কথাই বলছি—জানো সোমেনদা— আমাকে একদিন দুঃখ করে বলেছিল, কত চেষ্টা করি ঠিক যেন মনে হয় সামনে একটা খাড়া পাঁচিল, সেটা আর কিছুতেই টপকাতে পারি না। এ যে কী কষ্ট। নিঃশব্দে কাঁদছিল ও। কী সান্ত্বনা দেব ওকে!
কপাল, বুঝলি, সুচি, কপাল!
বাজে কথা বোলো না। আমার এটুকুই ক্ষমতা ছিল তাই এটুকুই হয়েছে। বড়োরাই আমাকে মিসগাইড করলেন—এত ভালোগাস, তত ভালো গাস। তত ভাল গলা। আমার গাইতে ভালো লাগত। আমি তো আমার সীমার কথা জানতাম না। জানার কোনো দরকারও ছিল না। তা না এই রেওয়াজ, সেই ট্রেনিং। হুঁঃ।
বলছিস কী রে? ট্রেনিংগুলোর মধ্যে দিয়ে তুই কত শিখেছিস বল তো! এসব গুরুমুখী বিদ্যা। না শিখলে তাল, লয়, রাগ-রাগিণী, রাগের চলন এসব কিছুই জানতে পারতিস না।—এটা আমি ওকে ভোলাবার জন্যে বলিনি। সত্যি যা মনে করি তাই বলেছি। নিজে না-ই হতে পারলাম বড়ে গোলাম, ভীমসেন, হবার চেষ্টা করছি বলেই তো তাঁদের আরও ভালো বুঝতে পারি। তবে এ সবে সুচরিতা সান্ত্বনা পেত না। জলসা-কনফারেন্সে যাবার অভ্যেসটাও ওর আস্তে আস্তে চলে গেল। টিকিট কেটে আনলে বলত, দূর আমার ভালো লাগে না। যা আমি কিছুতেই গলায় তুলতে পারছি না, অন্য একজন অবলীলায় তা করে দিচ্ছে শুনলে আমার কেমন যন্ত্রণা হয়। হিংসুটে বলিস আর যাই বলিস।
একটু বেশি বয়সেই বিয়ে হয়েছে সুচরিতার। তিরিশ-টিরিশ। এতগুলো বছর। বেচারি খালি গান নিয়েই পড়ে ছিল। ব্যাঘাত হবে বলে বিয়েতে রাজিই হচ্ছিল না। কে জানে সুচরিতার এখনও সেই কষ্ট আছে কিনা! হয়তো ছেলে মেয়ে স্বামী সম্পদ এসব পেয়ে ভুলে গেছে। কিংবা হয়তো ভোলেনি। ভোলা যে শক্ত সেটুকু তো আমি বুঝিই।
যাক, এইভাবেই হরিসাধনবাবুর সঙ্গে আমার আলাপ হয়। দুজনেই দেওঘরে নামি। আমি চলে যাই সাইকেল রিকশাতে বমপাস টাউন। উনি বাস ধরে চলে যান মধুপুর। যাবার সময়ে বললেন, বাড়ির ঠিকানাটা আপনাকে দিয়ে রাখলাম। যদি ঘুরতে ঘুরতে একবার গিয়ে পড়েন, আমার তো ভালো লাগবেই, একটু থেমে দৃঢ়ভাবে বললেন, আপনারও লাগবে।
