হরিসাধনবাবুকে আমার প্রথম থেকেই চোখে পড়েছিল। খদ্দরের ধুতি পাঞ্জাবি পরা মানুষ তো আজকাল তেমন একটা দেখা যায় না! তার ওপর এমন শান্ত সৌম্য ধরনের চেহারাটি। পুরুষমানুষ অথচ চাঁদের আলোর মত গায়ের রং। প্যাসেঞ্জার ট্রেন, অনবরত নামা-ওঠা, ধাক্কাধাক্কি ট্রেনের আওয়াজ ছাপিয়ে উত্তেজিত রাজনীতি, হাজারো ঢঙের হকারের চিৎকার। তারই মধ্যে যেন ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছেন, কিন্তু কিছু দেখছেন বলে বোধ হল না। চোখে ওটা সানগ্লাস বোধহয় নয়, ফটোক্রোম্যাটিক চশমাই। একটা আবছা আড়াল থেকে ওঁর চোখ দুটো খুবই মগ্ন, মায়াবী বলে মনে হল। আমার ছটফটে স্বভাব। মনে মনে যতই একাচোরা হই মুখে আমি খুব মিশুক। স্টেশনেই একখানা বাংলা কাগজ কিনেছিলাম, একটু পরেই পাশের ভদ্রলোকের সঙ্গে সেটা বদলাবদলি করি সেই সঙ্গে দিনকাল সম্পর্কে মতামতও। এই চা-এই চা করে বার দুই তিন লেবু-বিটনুন দেওয়া চা ও হয়ে গেল। ওঁর কিন্তু হেলদোল নেই। ট্রেনে উঠে চা-কফি খায় না এমন প্যাসেঞ্জার আমি আজও দেখিনি। এঁর কি চা টা চলে না? তাই হবে। তার কিছুক্ষণ পরেই মনে হয় ভদ্রলোক কোনো কারণে বিষণ্ণ, আত্মমগ্ন হয়ে আছেন। আপনজন কেউ মারা-টারা গেছেন হয় তো! কিংবা কারও দুরারোগ্য ব্যাধি! হয়তো ছেলের বউ কিংবা নিজের পত্নীর সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না। এসব তো আজকাল ঘরে ঘরে। এভাবে ভাবছি দেখে নিজেই কিছুক্ষণ পরে লজ্জা পেয়ে যাই। আশ্চর্য পরচর্চার স্বভাব তো! মুখে করছি না, মনে মনে তো করছি! আপনমনে থাকা বড্ড শক্ত কাজ।
একটি হকার তখনও এক গোছা ছুরি-ছোরা দিয়ে কতরকম কাজ করা যায় তারস্বরে তার ব্যাখ্যান করছে। ওদিক থেকে ঝালমুড়ি তৃতীয়বার এসে গেল, যাদের হাতে ঠোঙা ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছিল এবার তাদের থেকে দাম সংগ্রহ করছে, পঞ্চাশ টাকার নোট নিয়ে এক খদ্দেরের সঙ্গে মুড়িঅলার লাগধুমাধুম লেগে গেছে এমন সময়ে একটি অন্ধ ছেলেকে নিয়ে রোগা মুখ-চোখ-বসা এক মার্কামারা ভিখারি উঠল। উঠেই অসম্ভব চড়া সুরে পূর্ণদাসি স্টাইলে ফুকরে উঠল, ও-ও-ও-ও। ছেলেটার হাতে একটা কাঁসি, নিপুণ হাতে ব্যাটা বাজাচ্ছে সেটাকে।
এ লাইনে আসাযাওয়া করছি মন্দ দিন হল না। বাউল দেখিনি কখনও। এ-ও অবিশ্যি বাউল নয়। কিন্তু গাইছে নিখুঁত স্টাইলে। বাচ্চাটাও ধরছে মাঝে মাঝে। সরু মোটা গলার বুনুনিতে গাইছে বড্ড ভালো। টপাটপ পয়সা পড়ছে ওদের টিনের কৌটোয়, কুড়ি পয়সা, পঁচিশ পয়সা, পঞ্চাশ পয়সা, হঠাৎ দেখি লোকটার হাতে একটা আনকোরা পঞ্চাশ টাকার নোট। দিলেন আমার সামনের ভদ্রলোক। আমি অবাক হয়ে চেয়ে আছি দেখে একটু লজ্জা পেলেন, আশেপাশে সবাই-ই অবাক। বললেন, স্টেজে উঠতে পারলে ওর এর চেয়ে বিশগুণ তো রোজগার হতই। আমি নিজেও খুশি হয়ে দুটাকার একটা কয়েন দিয়েছিলাম। কিন্তু আজকালকার দিনে ট্রেনে ভিখারিকে পঞ্চাশ টাকা! নাঃ, ভদ্রলোকের দিলের তারিফ করতেই হয়। তবে স্বভাবতই সবচেয়ে অভিভূত হয়ে গেছে ভিখারিটি। বললে, বাবু আর কী গান শুনবেন, ফরমায়েশ করুন আজ্ঞে?
উনি হাসিমুখে বললেন, কী শোনাবে বলো!
আজ্ঞে ফিলমের গান বাংলা হিন্দি…বলতে না বলতেই অন্ধ ছেলেটি গেয়ে উঠল যব ভি কোই লড়কি দেখুঁ মেরা দিল দিওয়ানা বোলে ওলে ওলে এ ওলে…তীক্ষ্ণ ধারালো গলায় পার্ফেক্ট একেবারে।
আই, এক ধমক খায় ছেলেটি। ভিখারি বলে, বলুন না বাবু রাগপ্রধান, কেসিকেল…যা বলবেন সব গেয়ে দেব।
ভদ্রলোক বললেন, থাকো কোথায়? এ লাইনে নতুন মনে হচ্ছে।
তা এক পকার নতুনই বলতে হবে, তবে আমাদের আর থাকা না থাকা, যখন সেখানে যেমন…কেসিকেল একখানা শুনুনই না বাবু। লিলুয়ার জাহাজবাড়িতে জলসা হল, তখনই তুলেছিলাম। —লোকটি অবলীলায় রেকর্ড চালাবার মতো একটা বৃন্দাবনি সারং ধরে ফেলল। উচ্চারণ এত এলানো যে কথা স্পষ্ট ধরা যায় না। বৃন্দাবন, মুরলী ইত্যাদি ইত্যাদি। ওর ছেলেটিও দু-তিনখানা চালু ফিলমি গান গাইল। তারপর ওরা ভদ্রলোককে নমস্কার করে আমাদের বিদায় জানিয়ে পরের স্টেশনে নেমে গেল।
আমি বললাম, আপনাকে পঞ্চাশ টাকার গান শুনিয়ে গেল।
ভদ্রলোক একটু লজ্জা পেলেন, কৈফিয়ত দেবার সুরে বললেন, কী জানেন। গুণী মানুষ দাম চুকিয়ে দিতে না পারলে শান্তি পায় না। এই দেখুন না, একসময়ে রাজা-রাজড়া নবাব-বাদশারা দরবারে গুণীদের তনখা দিয়ে রাখতেন। ধনীদের খেয়াল মেটাতে তাঁরা তো নিজেদের বিলিয়ে দিয়ে গেছেন। কার্পণ্য তো করেননি। সব রাজাই কিন্তু সমঝদার হতেন না।
আমি বললাম, আপনি নিজেও গুণী মানুষ, গানবাজনা করেন মনে হচ্ছে?
উনি হেসে বললেন, সে তো আমারও আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, ওই কেসটা কীসের? ভায়োলিনেরই তো?।
আমি লজ্জা পেয়ে বলি, দূর আপনিও যেমন! একটা শখ, অক্ষম লোকের একটা নেশা, যেমন এই চা সিগারেট…
তা যদি বলেন নেশা না হলে কি আর সংগীত হয়? নেশাটিই হওয়া চাই। না কি বলুন সমর্থনের জন্যে আমার দিকে তাকান উনি।
নেশা হলেই কি আর হয়? ক্ষমতা চাই, একটু আধটু ন্যাক নয়, রীতিমতো ট্যালেন্ট। না হলে সব গুবলেট—আমি হাসি।
উনি কিন্তু কৌতূহলী হয়ে ওঠেন।—কী রকম?
আমি বলি, দেখুন অল্প বয়সে অনেকেরই কোনো কোনো বিষয়ে একটু আধটু ক্ষমতা ধরা পড়ে। কেউ বাড়ির লোকেদের স্কেচ করে ফেলছে, কেউ হয়তো পাড়া ক্রিকেটে দশ রান দিয়ে তিনটে উইকেট তুলে নিয়েছে, কেউ বা আবার মান্না দে, মহম্মদ রফিকে নকল করে গাইতে পারে। এইগুলোকে সত্যিকারের প্রতিভা ভেবে তবে বাবা-মা কি সে নিজে যদি আশা করে সে একটা এরাপল্লী প্রসন্ন, কি মহম্মদ রফি, কি নন্দলাল বোস হবেই তবে খুব মুশকিল। দুরাশার খেসারত দিতে তখন সারা জীবনের সুখশান্তির দফা একেবারে গয়া।
