ফুটকুনকাকা-কী স্টেলা, লীলা, এখন কেমন লাগছে?
কাকিমা-খুব ভালো। ফীলিং অ্যাট হোম।
কাকা—তাহলে বলো জোড়াবাগান তোমাদের ভালো লাগেনি।
কাকিমা—ডোরাবাগান ইজ অল রাইট। কিন্তু এখানে এসে শাড়ি খুলে ফেলতে পেরে, আর অত লোকের কিউরিয়সিটির বাইরে এসে আমার স্বস্তি হচ্ছে।
লীলাদি-আসলে ড্যাড, ভালো লেগেছে, কিন্তু বিদেশে অ্যাডভেঞ্চারের মতো। ফুটকুনকাকা—তাহলে বুঝে দ্যাখো, তোমাদের জন্যে সারা জীবন বিদেশে পড়ে থাকতে আমার কেমন লাগে! আর এই এক সপ্তাহের কলকাতা-মল্লিকবাড়িই বা আমার কেমন
লেগেছে!
কাকিমা—আয়্যাম রিয়ালি সরি ফর য়ু।
সুভাষদা—আমি ঠিক করেছি গ্রাজুয়েশনের পর ইন্ডিয়া টুর করব, ইয়োরোপ। নয়। ওই সব সরু সরু গলি আর বড়ো বড়ো ছাদ আমাকে দারুণ ফ্যাসিনেট করেছে। মানুষরাও। আঙ্কল, আন্টির মতো মানুষ আমি দেখিনি। সাধারণ মানুষেরাও অদ্ভুত। কিছু কিছু লোক আছে জাস্ট একটা ল্যাকির মতো, কেউ কেউ আবার দেখবে যেন গড, কুকুর-বেড়াল কিংবা ইন্যানিমেট অবজেক্টের মতো মানুষও দেখেছি।
ফুটকুনকাকা—তোমরা বিনু-টুনির সঙ্গেও কথা বলো। ওরা লেফট-আউট ফীল করবে।
লীলাদি-ওঃ, তাও তো বটে। টুনি, এখানে তুমার কেমন লাগছে?
টুনি—ভীষণ ভালো।
-বিনু তুমার?
বিনু—আমি বড়ো হয়ে বিলেত যাব। বিলেতটা তো এখানকার মতো?
সুভাষদা—সোবটা আছে না বিনু। কিছু কিছু আছে।
ফুটকুনকাকা (হেসে)—ভালো, সুভাষ আসছে ইন্ডিয়ায়, বিনু যাচ্ছে ইংল্যান্ডে। বেশ একটা ইয়ুথ একসচেঞ্জ প্রোগ্রাম করা যায়। টুনি, লীলা, তোমরা কী করবে, বলো? ওহ লীলা তো আবার…
এবার ওরা চারজনেই কোন লুকোনো কারণে ভীষণ হাসতে থাকছে। বিনু কিছু বুঝে হাসতে হাসতে ব্যালকনির রেলিং-এর দিকে ছুটে গেছে। টুনির হাতে মিলক শেক, গোঁফে ফেনা লেগে গেছে, ন্যাপকিন দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছে লীলাদি। গোপালপুরের এই বিলেত অবশেষে তার কাজুবাগান, বালিয়াড়ি, আরামের হোটেলবাড়ি এই সব নিয়ে দূরে সরে যাচ্ছে। দূরে সরে যাচ্ছে নীল সমুদ্দুরের ওপর কালো কালো কাস্তের মতো ডজনে ডজনে নৌকা, রাত্তিরে কালো জলের ওপর বাতিঘরের ঘুরে ঘুরে টর্চ ফেলা, ট্রলারের আলো, ঢেউয়ের মাথায় ফসফরাসের নাচ। পড়ে থাকছে অনেক পেছনে গোপালপোর অন সি, বেরহামপোর নীল সমুদ্দুর, সবুজ সমুদ্দুর, টুনির চোখ গলছে চুপিচুপি। ফিরে চলেছে, ফিরে যেতেই হয়, নজরমিনার থেকে হাওয়া-বেলুন ওড়ানো দেখা আর হবে না, আর হবে না ঢেউয়ের চূড়ায় পৃথিবীর রানি হওয়া, জলকন্যে হওয়া, বিশাল সমুদ্দুর চলে যাচ্ছে, কাছে চলে আসছে পুরোনো শহর, পুরোনো বাড়ি, পুরোনো জীবন। ছেড়া মলাট, ফাটা বেঞ্চি, কালির দাগ। খ্যাংরা ঝাঁটা ঝুরো গোঁফ, টাকমাথা, টিউবয়েলের ঘটাং ঘটাং, হ্যাঁচচো হাঁচি, ফিচকে হাসি। মোড়-জটলা, বস্তি-ঝগড়া, সরু গলি।
টুনি-বিনুকে নিয়ে বাঘবাড়ির চওড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন ফুটকুনকাকা। ধরা গলায় বলছেন বাবার হাত ধরে, আসছি মেজদা, আবার কবে দেখা হবে জানি না।
লীলাদি বললে, থ্যাংস ফর দা ওয়ান্ডারফুল এক্সপিরিয়েন্স জেঠিমা, বুলা আইল মিস ইউ।
কাকিমা বললেন, মেডডি, আমাদের কানে চোলে আসুন একবার।
সুভাষদা বলল, বিনু-টুনি উই মাস্ট মীট সুন।
নেমে যাচ্ছে সবাই। এবার ট্যাক্সি। তারপর এয়ারপোর্ট হোটেল। তারপর প্লেন।
এখানে এখন জালি-ঘেরা বারান্দায় নতুন শীতের উসুম-কুসুম সকাল। এখানে এখন মোটা মোটা কত কালের পুরোনো কড়িবরগার নীচে নতুন টুনি নতুন বিনু। আর পুরোনো মা, পুরোনো দিদি, পুরনো বাবা। বিনুর হাতে ঝিনুক থলি, টুনির মাথায় বেতের টুপি। বাবার কাঁধে কোঁচার খুঁট, মা হাসছে, দিদি হাসছে চিকন হাসি, বাবা ডাকল, বিনু! বিনু। হাতের থলি খলবলাচ্ছে বিনায়ক। বাবা ডাকছে, টুনি-ই, টুনটুনিই-ই। বাবার ছড়ানো দুই হাতের মাঝখান দিয়ে ঝপপাং করে ঝাঁপিয়ে পড়ছে টুনি। বাবার খোলা বুকের সঙ্গে সেঁটে গেছে টুনির মাথা, টুনির কান। কান পেতে শুনছে পুরোনো বুকের মধ্যে গুমগুম গাগুম গুম। অবিকল সেই গভীর ডাক। নীল সমুদ্র। সবুজ সমুদ্র। ভেতরের এক অপরূপ অন্ধ আলোড়ন ঢেউ হয়ে ছুটে আসছে। ভেঙে পড়ছে। টুনির গালের বেলাভূমি তাই ফেনায় ফেনা।
সিদ্ধ পাষাণ
হরিসাধন লাহিড়ির সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল ট্রেনে।
পুরী-পাটনা এক্সপ্রেসে টিকিট পাইনি। আমার তো আগে থেকে কিছু ছকা থাকে না! ইচ্ছে বলুন, বাই বলুন, চাগলেই বেরিয়ে পড়ি। আসানসোল বৈদ্যনাথধাম-ঝাঁঝাঁ প্যাসেঞ্জার একটি অতি বিরক্তিকর ট্রেন। কিন্তু সোজা দেবগৃহ অর্থাৎ দেওঘর যেতে হলে আর উপায়ই বা কী! সঙ্গে তেমন বোঁচকাকুঁচকি নেই, একটা অ্যাটাচিতেই আমার সব কিছু ধরে যায়। উঠে জানলার ধারে গুছিয়ে বসি। বমপাস টাউনে আমার মামার বাড়ির দিকের এক কাজিন সুচরিতাদের একটি উৎকৃষ্ট বাংলো আছে। দেখাশোনার একটি মালিও আছে। সুযোগ পেলেই সুচরিতাকে একটি ফোন করে দেওঘর কেটে পড়ি। সুচরিতাই দূর পাল্লা থেকে খবরাখবর যা দেওয়ার দিয়ে দেয়।
বছর তিনেক হল স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে বসে আছি। ছেলেটা অল্প বয়সেই দাঁড়িয়ে গেছে। এক্ষুনি বিয়ে থা করতেও চাইছে না। তার মা এখন তাকে নিয়ে খুবই ব্যস্ত। আমি সুতরাং নিঝঞ্ঝাট। একা একা ঘুরে বেড়ানোর আমার মস্ত মওকা। সহকর্মীরা বলেছিল, কেন শুধু শুধু যাচ্ছেন সোমেনদা, আপনাকে অন্তত এরা যেতে বাধ্য করতে পারে না। এখনও এগারোটা বছর…। আমি মুখে কিছু বলিনি। বলিনি সময় থাকতে কদর থাকতে থাকতেই কেটে পড়া বুদ্ধিমানের কাজ। এ-ও বলিনি এই বিশ্রী একঘেয়েমির জীবন আমার আর ভালো লাগছে না। কোনোদিনই লাগেনি অবশ্য। ভাবিনি তো এভাবেই দিনগত পাপক্ষয়ে জীবন কেটে যাবে! কত রকম আশা-আকাঙ্ক্ষা, কত স্বপ্ন…সবই তো সংসারের চাপে জলাঞ্জলিই দিতে হয়। তবে এসব কথা বলেই বা লাভ কি! ভেবেই বা কি লাভ? তেমন কিছু হওয়ার হলে হয়তো তেমন ক্ষমতা নিয়েই জন্মায় মানুষ?
