লীলাদি বলল, বুলা, ব্যু মাস্ট টেক আ হলিডে।
দিদি হেসে বলল, পরের বার লীলা, পরের বার, ডোন্ট মাইন্ড! আমি জানি দিদি যাবে না। দিদি ভীষণ ঘরকুনো। অবশেষে অনেক আলোচনার পর ঠিক হল আমি আর বিনু যায়। মহানন্দে আমাদের বাক্স গুছোনো হল। আমার আর বছরের সাদা সুইস ফ্রক তো, এখনও তেমনি সুন্দর আছে। সোনালি অর্গান্ডির ফ্রকটাও। তারপর স্টেলাকাকিমা আমাদের জন্য কত রকমের জামা এনেছেন, তাদের বলে ড্রেস। বিনুকে আর চেনা যাচ্ছে না। আমিও যখন লম্বা স্ন্যাক্স পেন্টুল আর নকশা করা টপ পরে ছোটো চুলে পনিটেল বেঁধে ফিটফাট হয়ে গেলুম, দিদি আদর করে বলল, দ্যাখ তো টুনি, এবার তোকে কেমন ছবির বইয়ের খুকুর মতো দেখাচ্ছে! আমি আর বিনু মহা গর্বে উৎফুল্ল হয়ে দু পকেটে হাত গুঁজে ট্যাকসিতে উঠে পড়লুম। ভীষণ তাড়া। ওদিক থেকে মিতালি ছুটতে ছুটতে আসে, তনিমা, তনিমা কোথায় যাচ্ছিস রে?
সমুদ্র দেখতে সমুদ্র। গোপালপুর অন সি। আলো-আলো মুখে বলতে থাকি।
ট্রেন চলেছে সুইশশ করে, শব্দ নেই। মোটা গদির মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। কী সুন্দর ঠান্ডা। দু হাত জড়ো করে বুকের কাছে ধরেছি। লীলাদি অমনি গোলাপি রঙের তিনকোনা শাল আমার গায়ে জড়িয়ে দিল। তার কোনো ওজন নেই, অথচ কী সুন্দর গরম। কাচের বাইরে কিছু দেখা যায় না। খালি আমাদেরই ছবি। কামরার। মধ্যে আলো, স্টেলাকাকিমার লালচে সাদা মুখ, লীলাদির লাল ব্লাউজ, কালো স্কার্ট, সুভাষদার সোনালি চশমা, বিনুর ছটফটানি। কামরা জুড়ে ওদের অবিশ্রান্ত উত্তেজিত ইংরেজি, যার একবর্ণ বুঝতে পারছি না। বাস্কেট থেকে নাম-না-জানা সুগন্ধের খাবার, স্পেনসেস নামের হোটেলের নাম লেখা বাক্স, তারপর একটা পুরো বাক্স জুড়ে দুলতে দুলতে ভুলতে ভুলতে ঘুম। ঢুলতে ঢুলতে কখন জাগি, কখন আবার ঘুমের মধ্যে গুলিয়ে যাই, নিজেই জানি না। এমন ঘুম কখনও ঘুমোইনি। এমন দোলা কখনও দুলিনি। এমন জাগাও কখনও জাগিনি। সিঁদুরের গোলার মতো সূর্য। মাঠের পরে মাঠ, ডোবা, খাল, বিল, নদী, নালা ঢকাটক ঢাকাঢ়ক, পুল, সূর্য পানকৌড়ি, সাদা বক, কালো ফিঙে, সূর্য, মাঠগুলো দূরে সরে যায়, আবার কাছে চলে আসে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্য।
বিনু চলেছে, টুনি চলেছে, টুনি চলেছে, বিনু চলেছে। লীলাদি কোলে বইয়ের পাতায়, বিনুর হাতে লঞ্জেসছানা, মেমকাকিমা সাহেবকাকা, সুভাষদাদা, খবর পড়ে, লাফিয়ে নামে লাফিয়ে ওঠে, টুনি চলেছে অনেক দূরে, বিনু চলেছে অনেক দূর, পুরনো শহর পুরনো বাড়ি, নোংরা গলি, ধ্যাত্তেরিকা, ঘ্যাঁঙর চরকা ঘ্যাঙর,। ইদুজ্জোহা ইদ-উল-ফিতর, টুনি-বিনুর পেরথম টুর, দেখতে দেখতে বেরহামপোর।
হোটেলের গাড়ি এসেছে টুনিদের নিয়ে যেতে। মস্ত বড়ো ভ্যান গাড়ি যেতে যেতে অবশেষে তার চাকা বসে যায় বালিতে। টুনিতে বিনুতে চুপিচুপি বলাবলি করে—ঠিক যেমন ট্রেনের গদিতে ওরা ঢুকে যাচ্ছিল, তেমনি গাড়িটা বালির গদিতে ডুবে যাচ্ছে। বলতে বলতে ওরা হেসে ওঠে। ফুটকুনকাকু বলেন, হাসলি কেন রে টুনটুনিটা? কাকিমা বলেন, ছুটোরা শুদুশুদু হাসে, কোনও কেনো নাই। তারপর হঠাৎ দিগবলয়ে এক অবাক দৃশ্য, অবাক শব্দ। টুনি-বিনু বিস্ময়ে চুপ, একদম চুপ। সুভাষদা লাফিয়ে নামছে। হু হু করে ছুটে যাচ্ছে ক্যামেরা নিয়ে। কাকিমা দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ওহ ইটস ওয়ান্ডারফুল। লীলাদি বলে, ইটস বেটার দ্যান ব্রাইটন। ফুটকুনকাকা টুনি-বিনুর দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে বলেন, দেখতে হবে তো, কাদের দেশের সমুদ্দুর!
সেই হোটেলটাও অবাক। অবাক তার ঘরদোর, বাথরুম, বিছানা, জানলা, বারান্দা, তার লাউঞ্জঘর, খানাপিনা, পামগাছের সারি। কিন্তু সবার থেকে আশ্চর্য ওই সমুদ্দুর। তার সামনেটা যেন গঙ্গাজলের সঙ্গে সাবানের ফেনা মেশানো, আরেকটু দূরে অদ্ভুত সবুজ, যেন তার তলায় আলো জ্বলছে, তার তারপর নীল, নীল চিকচিকে ময়ূরকণ্ঠী নীল। বালির পাড়ে কত বালিয়াড়ি। মাথায় বসে সবুজ নীল, নীল সবুজ ডিঙি ভেসে যায়। ভেসে ফিরে আসে। দূরে ট্রলার। এখানে চান করো না, পাথর আছে। বিনু শুনছে না, সুভাষদার সঙ্গে কালো পাথরের ওপর বসে বসে হাসতে হাসতে ঢেউ খাচ্ছে। টুনির অত সাহস নেই। সে কাকুর ছোটো প্যান্টের কিনারা ধরে জলে নামে। হুশ করে মাথার ওপর দিয়ে ঢেউ চলে যায়, উঠতে না উঠতে আবার ঢেউ। সারাদিন, সারা বিকেল। সেই বিশাল পারাবারের তীরে টুনিরা করে খেলা। অদ্ভুত ভোলা পোশাক পরে, সাদা-হাত সাদা-পা, লীলাদি, মেম-কাকিমা, বালির ওপর রোদ পোয়ায়, জলে নেমে যায়, ভালুকের মতো রোঁয়াওলা নরম তোয়ালে জড়িয়ে উঠে আসে, মাথায় কেমন চুল-ঢাকা টুপি।
খেলতে খেলতে কাছাকাছি হলে বিনু কুলকুল করে হাসে, দ্যাখ টুনি আমরা কেমন বিলেতে এসেছি। টুনি যদি বলে, ভ্যাট! বিনু তখন আঙুল তুলে দ্যাখায়, ওই দেখ কত্ত মেম, কত্ত সায়েব। সত্যি। বালুবেলায় স্টেলাকাকিমা লীলাদির মতোই আধশোয়া হয়ে থাকে কত মেম, চোখে সানগ্লাস, ঢেউয়ের মাথায় লাল-নীল ছোটো প্যান্ট পরে নাগরদোলা খায় কত সাহেব! টুনিরা কাঁটা চামচে খায়, কোলে ন্যাপকিন পেতে। ঠিক কেয়াফুলের মতো ন্যাপকিন গেলাসে থাকে। গাল না ফুলিয়ে, শব্দ না করে খেতে শিখিয়েছে লীলাদি। বেয়ারারা সেলাম করে। তাদের মাথায় পেখমঅলা টুপি। কিন্তু যখন খুব বেশি বিলেত বিলেত লাগে তখন টুনি হাঁ করে ফুটকুনকাকার আর বিনুর তামাটে মুখের দিকে চেয়ে থাকে। রাত্তিরবেলায় লীলাদির পাশের খাটে শুয়ে সমুদ্রের গর্জন শোনে। কেমন অচেনা, অজানা, বিলেত-বিলেত। টুনি কি সত্যি-সত্যি তবে নিজের দেশ, নিজের শহর কলকাতা ছেড়ে বহুদুরে বিলেতে চলে এসেছে? ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে যায়, জানলা দিয়ে থইথই জল দেখা যায়। হুশশশ করে বালির ওপরটা ফেনায় সাদা করে দিয়ে ফিরে যাচ্ছে। ব্যালকনিতে বসে লীলাদিদের হ্যাটম্যাটক্যাটের মধ্যে বসে বসে ব্রেকফাস্ট। কিছুকিছু এখন বুঝতে পারা যায়।
