দিদিও ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। হাসিমুখে বলল, আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি বাবা, তুমি ভেবো না। সাহেবকাকা আর স্টেলাকাকিমা থাকবে আমাদের ঘরে, তোমাদের ঘরে থাকবে লীলা আর সুভাষ, বৈঠকখানার তক্তপোশে বিনু আর তুমি, মেঝেতে বিছানা করে আমি মা আর টুনি।
বাবা বললেন, দেখলে তো, হয়ে গেল! বুলা না হলে কিছু হয়? বলে বাবা মধুক্ষরা দৃষ্টিতে দিদির দিকে চাইলেন।
জন্মে থেকে, বোধহয় আঁতুড়ঘর থেকে শুনছি—সাহেবকাকা, সাহেবকাকা, ফুটকুন ফুটকুন! এ বাড়ির এক ছেলে, আমাদের জ্যাঠতুতো, না খুড়তুতো, না কী কাকা, ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে নাকি আর ফেরেননি, ওখানেই মেম বিয়ে করে রয়ে গেছেন। তাঁর সাহেব ছেলে, মেম মেয়ে। তাঁর বাবা রেগেমেগে তাঁকে ত্যাজ্য করে দিয়েছেন। নিজের লোকেদের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, খালি মেজদা-মেজবউদি বলতে সাহেবকাকা অজ্ঞান। নিয়মিত চিঠি লিখে খোঁজখবর নেন, সে বোধহয় আজ সতেরো আঠারো বছর হয়ে গেল। সেই সাহেবকাকা, মেমকাকি আসছেন।
আমার আর বিনুর তো বুক গুড়গুড় করতে লেগে গেল। বাবা কোথা থেকে টাকাকড়ি জোগাড় করে বাথরুমে একটা কমোড আর একটা ছোট্ট বেসিন বসালেন। আমি আর বিনু চুপিচুপি হেসে গড়াগড়ি খাই। সাহেব মেমরা উবু হয়ে ড্যাশ বসতে পারে না। চেয়ার চাই। তাকে বলে কমোড। হিহি! হিহি! আমাদের হাসি আর ফুরোতেই চায় না। তবে হাসির মধ্যে একটু ভাবনাতেও পড়ে গেছি। সাহেব দাদা-দিদিদের সঙ্গে কথা বলব কী করে? দু ভাইবোনে মুখস্থ করতে থাকি —হোয়াট ইজ ইয়োর নেম? মাই নেম ইজ মিস টানিমা মল্লিক, মাই নেম ইজ মাস্টার বিনায়ক মল্লিক। হোয়্যার ডু ইউ লিভ? আই লিভ অ্যাট জোড়াবাগান ইন ক্যালকাটা। তারপর বাসস্থানের প্রশ্নোত্তরটা দরকার লাগবে না বুঝে দুজনে আবার হাসতে থাকি। হুইচ ক্লাস ডু ইউ রীড ইন? আই রীড ইন ক্লাস ফোর, আই রীড ইন ক্লাস থ্রি। বলতে বলতে বিনুটার ধৈর্য শেষ হয়ে যায়, সে হাত পা ছুড়ে বলে ওঠে হ্যাট, ম্যাট, ক্যাট, কুট, শুট, দ্যাট, র্যাট, ফাই, হাই, নাই, হাউ, কাউ, হাঁউ, মাউ, খাঁউ বলতে বলতে দুপাটি দাঁত বার করে, বগলে রবারের বল নিয়ে দে ছুট। বাবা একদিন শুনে ফেলে হেসে বাঁচেন না, বললেন, তোদের অত ইংরেজি বলতে হবে না, তোরা বাংলাতেই কথা বলবি, হড়বড় না করে একটু স্পষ্ট করে, ধীরে ধীরে বলবি, তাহলেই বুঝতে পারবে। সাহেব নাম হয়ে গেলে কী হবে! ফুটকুন কোনো দিন সাহেব ছিল না। হবেও না।
চিকচিকে সিল্কের শাড়ি পরা, ঘাড়ের কাছে নুটু-টু খোঁপা বাঁধা স্টেলাকাকিমা চারদিকে তাকিয়ে বললেন, এত উঁচু গর, একর্ম আর্কিটেকচার, বিউটিফুল স্ট্যাচুজ, এ তো ক্যাসল-এ থাকে। তুমরা এ বাড়ি পাবলিক শো-এর জন্য ওপন করে ডাও না কেনো? আমাদের ওখানে কোতো একম বাড়ি ডিউক, ব্যারনরা পাবলিকের জন্যে ওপন করে দিচ্ছেন, তাইতে মেইনটেন্সের খরচা উঠে আসে।
ফুটকুনকাকা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, স্টেলা তুমি আর এখানে তোমার ইংরিজি পাটোয়ারি বুদ্ধি নাই খেলালে। ইতিহাসের পাতা এখানে জীবন্ত হয়ে রয়েছে ডারলিং, মিউজিয়ম হয়ে নেই।
স্টেলাকাকিমা বলেন, পাটুয়ারি কী বললে? কুনও গালি নোয় তো!
বাবার দিকে তাকিয়ে একচোখ টিপে ফুটকনুকাকা বললেন, কী যে বলো! তোমাকে বাংলা গ্রামারটা এখনও শেখাতে পারলুম না। বারোয়ারি পুজো বলছিলুম না। আমাদেরটা যদিও মল্লিকবাড়ির পুজো, এখন বারোয়ারিই হয়ে গেছে। কতজন শরিক এখন মেজদা?
কথা ঘোরাতে পেরে ফুটকুনকাকা খুব খুশি। বাবা বললেন, সাঁইত্রিশ জন।
লীলাদি বলল, টুনি! হাউ কিউট . শী ইজ এ লিটল রেড রাউডিং হুড?
ওরা কেউ কিছুতেই সেদ্ধ খাবে না। সুভাষদা তার বাবার কথা শুনে বলল, ড্যাড বোরাববার একটু সেলফিশ থাকছে। আমরা সোব কাবো৷ স্টেলাকাকিমা বললেন, মেডডি, কালি জাল ডিয়ো না।
এইভাবেই বিশাল বাড়ির অলিগলি আনাচ-কানাচ লম্বা-চওড়া দালান, জমাদারের ঘোরানো সিঁড়ি, তিন চারটে ফুটবল খেলার মাঠের মতো ছাদ আর এ কোণে ও কোণে বিস্ময়বালক-বিস্ময়বালিকা এঞ্জেলের মূর্তি, দেওয়ালগিরি, প্রাচীন পট, ফোটোগ্রাফ এবং সর্বোপরি দুর্গাপুজো দেখতে দেখতে আমাদের ফুটকুন কাকাদের পরিবারের সঙ্গে ভীষণ আলাপ হয়ে গেল। আমার দিদি বুলা লীলাদির ভীষণ বন্ধু, সুভাষদার সঙ্গে বিনুর গলায় গলায় ভাব, দুজনে খালি ছাতে উঠে ঘুড়ি ওড়ায়, আর বেড়ায়। উত্তর কলকাতার সব প্রাচীন সরু গলিঘুজি, সুভাষদার দেখা চাই। আর আমি স্টেলাকাকিমার আদুরে। তিনি খালি বলেন মেডডি তুমার এই টুনি ডল আমি নিয়ে যাবো।
মা বলে, যাও না নিয়ে। যা কিচিরমিচির করে!
সত্যি কিন্তু। তোখোন আর নো করতে পারছে না।
মা হাসত। আমি ভাবতুম ভালোই তো। ফুটকুনকাকাদের কী সুন্দর বাগানঅলা বাড়ি। বাকিংহাম প্যালেস, টেমস নদী, টিউব ট্রেন। আমি যাব, লীলাদির মতো টুকটুকে ফর্সা হয়ে যাব, মেমসাহেব একেবারে, কত জামাকাপড়, কত বেড়ানো ….. ভালোই হবে বেশ।
ফুটকুনকাকা বললেন, পুজোর পর টিকিট কাটছি গোপালপুর অন সি। তোমরা স স্কুলে আমাদের সঙ্গে চলো। বাবা হাঁ হাঁ করে উঠলেন—একাদশীর দিন থেকেই অফিস ফুটকুন, কোনো উপায় নেই। মা হেসে বলল, তবেই বোঝ, তোমার দাদাকে দেখাশোনা করবার একটা লোক চাই তো! তুমি বরং বুলা, টুন্টি বিনুকে নিয়ে যাও!
