পুজো ফুরিয়ে গেলে আবার সব ভুলে যাই। তখন দিদির অনেক যত্নে তুলে রাখা মলাট দেওয়া বই স্কুলব্যাগ, টিফিনকৌটোয় ঘুগনি, বাবার কাছে অঙ্ক ইংরিজি, বিকেলবেলায় মণিমেলা, দিনগুলো সব একে অপরকে হারাবার জন্যে দুদ্দাড় ছুটত, আমিও তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতুম। আর সারাদিন ছোটার ক্লান্তিতে, আনন্দে রাতের কোলে, মায়ের কোলে দিদির কোলে ঢলে পড়তুম অবাধ সুন্দর শীতল-বিস্মরণের অথই দিঘিতে।
কিন্তু গরমের ছুটি, পুজোর ছুটি, বড়দিনের ছুটির সময়ে গরিব-বিছেটা আবার আমায় কটাস কটাস করে কামড়াত। পুজোর সময়ে না হয় সব শরিকে মিলে মল্লিকবাড়িতে বিখ্যাত একশো বছুরে পুরোনো পুজো, কোথাও যাওয়া যাবে না। গরমের ছুটিতে না হয় বাবার আপিস, বড়োসায়েব কিছুতেই ছুটি দিতে চায় না, কিন্তু বড়োদিন? তখন যে কলকাতায় ঝুড়ি-ঝুড়ি কমলালেবু, থইথই করছে আকাশনীল। এখানে সেখানে চড়ইভাতি! স্কুলের বন্ধু মিতালি বলত, তনিমা, তোরা শীতে কোথাও যাবি না? আমরা এবার গিরিডি যাচ্ছি। উশ্রী জলপ্রপাত আছে, খু-উ-ব সুন্দর জায়গা! কেয়া বলত, আমরা যাচ্ছি হাজারিবাগ, জঙ্গল দেখব, বাগানে লুকোচুরি খেলব আর রোজ মুরগি, রোজ …। শিপ্রা বলত, দূর, হাজারিবাগ, গিরিডি ওসব তো হাতের কাছে, ট্রেনে চড়লি নেমে পড়লি। কোনো মজাই নেই। আমরা যাব, দু-রাত্তিরের পথ, দিল্লি! লালকেল্লা দেখব, কুতুবমিনার দেখব, তাজমহল দেখব চাঁদের আলোয়, বাবা বলেছে।
আমি অবাক হয়ে ভাবতুম কুতুবমিনার! কুতুবুদ্দিন আইবক তৈরি করেছিলেন, ইলতুতমিস শেষ করেন সেই কুতুবমিনার! লালকেল্লা! যার ভেতরে ময়ূর সিংহাসন, দেওয়ান-ই-খাস, দেওয়ান-ই-আম! ওসব তো পুরোনো-হয়ে যাওয়া ইতিহাস বইটার পাতায় থাকে! দেখা যায়! ওদের দেখা যায়! আর তাজমহল? কালের কপোল তলে শুভ্র সমুজ্জ্বল সেই তাজমহল? সেইটা দেখবে শিপ্রা? যে রোজ ইস্কুলে আমার পাশে গা ঘেঁষে বসে থাকে, আমার ঘুগনি খায়, আমাকে গোলাপজাম খাওয়ায়, সেই শিপ্রা?
বাবা! বাবা! এবার বড়োদিনের ছুটিতে আমরা কোথায় যাবো? বাবা অবাক হয়ে চেয়ে বলতেন—অ বুলা। দেখ তো ছোট্ট টুনটুনি পাখিটা কী যেন কিচিরমিচির করছে।
না বাবা, সত্যি বলো না, শিপ্রারা যাচ্ছে, মিতালিরা যাচ্ছে। সবাই যাচ্ছে যে!
সবাই চলে যাচ্ছে? তাহলে তো সারা কলকাতাটাই গড়ের মাঠের মতন ফাঁকা হয়ে যাবে রে! সুষ্ঠু আমরা কজন? বেড়াব, খালি বেড়াব।
উ-ঠাট্টা নয়, বলো না!
দিদি হঠাৎ তার বাটনা-বাটা হলুদ হাত ছোটো লাল গামছায় মুছতে মুছতে এসে দাঁড়িয়েছে।
বাবাকে বিরক্ত করছিস কেন রে টুনি। দেখছিস না হিসেবের কাজ করছে!
বাবাকে, মাকে ভয় পেতুম না, কিন্তু দিদিকে বিলক্ষণ।
ও দিদি, বাবাকে বলো না বড়োদিনের ছুটিতে আমাদের দিল্লি নিয়ে যাবে! লালকেল্লা দেখব, তাজমহল … বলো না!
দিদি গম্ভীরভাবে বলত, তোর কোন বন্ধু যাচ্ছে?
শিপ্রা তো! শিপ্রা যাচ্ছে!
তাই ওমনি তোকেও যেতে হবে। লোকে যা যা করবে তোকেও ঠিক তাই তাই করতে হবে? বাঃ। লোককে নকল করে যারা তাদের কী বলে জানিস?
ভয়ংকর কিছু বলে নিশ্চয়ই। আমি আর কথা বাড়াতে সাহস পাই না। কিন্তু কান্না গিলে নিতে নিতে ভাবতে থাকি—দিল্লি যাওয়াটা তো খারাপ কাজ নয়। কোনোমতেই নয়। তাহলে? রাত্তিরে ঘুমের ঘোরে মায়ের গলা শুনি,সত্যি, কাছাকাছি, খুব কাছাকাছি থেকেও যদি… দিদির গলা—
তুমি চুপ করো তো মা! এই করতেই বাবার প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে … ছোটোরা তো ওরকম অবুঝপনা করবেই …! আবার ঘুমিয়ে পড়ি। ছোট্ট একটা বিছে বুকের ভেতরে নিয়ে। বিছেটা কুটুস কুটুস কামড়াবে, গর্তের মধ্যে সেঁধোবে, আর ঘুমের মধ্যে কে যেন বলতে থাকবে তোদের টাকা পয়সা নেই, তোরা কী করে … তোর বাবার টাকাপয়সা নেই, তোরা কী করে …। ট্রেনের চাকার ঘ্যানঘেনে আওয়াজের মতোই সারা রাত সেই শব্দগুচ্ছ আমার আধ-ঘুমন্ত অভিমানী মাথার মধ্যে গুমগুম করে বাজবে। আমি যাচ্ছি, আমি ট্রেনে চড়েছি ঠিকই। কিন্তু সে ট্রেন দিল্লি যায় না, হাজারিবাগ যায় না, উশ্রী যায় না, এক নিদারুণ দুঃখের দেশে, নেই-নেই গরিবের দেশে নিয়ে যায়। সেখানে বাবাদের টাকা থাকে না, দিদিদের শাড়ি খেলো হয়, খাটো শাড়ি শেমিজ পরে রাতুল-চরণে-আলতা মায়েরা অবিশ্রান্ত ঘুরে বেড়ায় কাজের পাকে।
সেবার কিন্তু বাড়িতে ভারি একটা আনন্দের ব্যাপার ঘটল। বিদেশি টিকিট মারা নীলচে নীলচে চিঠি আমাদের বাড়িতে মাঝে মাঝেই আসত। একদিন ওই রকম একটা চিঠি নিয়ে বাবা ঝলমলে মুখে দালানের শেষে রান্নাঘরের মুখে এসে দাঁড়ালেন, ওগো শুনছ। ফুটকুন আসছে যে!
মা তোলা উনুনে দুধ বসিয়েছিলেন, উঠে দাঁড়িয়ে আরও ঝলমলে মুখে বলল, ফুটকুন ঠাকুরপো? সত্যি!হ্যাঁ গো! সবাই। ফুটকুন। স্টেলা, ছেলেমেয়ে। মা ব্যস্ত হয়ে বলল, আমাদের এখানে? সে কি গো? মেমসায়েব … তার সাহেব মেম ছেলেমেয়ে … কোথায় থাকবে? কী খেতে দেব!
বাবা হাসিমুখে বললেন, তবে শোনো ফুটকুন কী লিখেছে
প্রিয় মেজদা, এবার দেশের এবং আমাদের বাড়ির সাবেকি পুজো দেখাতে ফ্যামিলি নিয়ে দেশে যাচ্ছি। তোমার কাছেই থাকব। অন্য কোথাও তো আমাদের জায়গা হবে না! আমাদের থাকা নিয়ে একদম উদ্বিগ্ন হবে না। আমি লাউশাকের চচ্চড়ি খাব মটর ডালের বড়া দিয়ে, লাউচিংড়ি, পটোল ভাজা, মৌরলামাছের বাটি চচ্চড়ি … যদি সম্ভব হয়, আর এরা খায়। আলুসেদ্ধ, বিন আধসেদ্ধ, কাঁচা টম্যাটো, কাঁচা গাজর। শুধু জলটা একটু ফোঁটানোর ব্যবস্থা করবে। পুজোটা কাটিয়ে আমরা একটু বাইরে বেরোব। তারপর ফিরে আসব। তিন সপ্তাহের ছুটি। মেজবউদির চরণে আমার প্রণাম দিও। বুলা কত বড়ো হল? তোমার ফুটকড়াই দুটোকে তো আমি দেখিইনি। ইতি তোমাদের ফুটকুন।
