আর?
আবার কী? দেখছিস না কতজনের কত ফরমাশ, এই সব সেরে আর কখনও করতে পারি? নড়া ব্যথা হয়ে গেল যে রে!
এমনিতে খুব মাতৃভক্ত হলেও, আমি নড়া-ব্যথার কথায় ভুলতুম না। কেঁদেকেটে একশা করতুম। কারণ আমার চোখের সামনে তখন ভাসছে খুড়তুতো দুই বোন পুতুল-বীথির পাঁচ দুগুণে দশটা করে ফ্রক, কোনটা ফ্রিল দেওয়া, কোনোটার কুকুরের কানের মতো কলার, কোনোটাতে সিল্কের ওপর মিকি মাউস, এক একটায় একেকরকম চমক। তাদের পাশাপাশি আমি ওই সোনালি অর্গ্যান্ডির ফ্রক পরে রোজ!
কেন তুমি এত জনের এত জামা করবে? কেন খালি আমার বিনুর আর দিদির আর তোমার আর বাবার করবে না! কেন? কেন? কেন? আমার সেই নেই আঁকড়া কান্নার মধ্যে মা সেলাইকলের ওপর গালে হাত দিয়ে চুপটি করে গম্ভীর মুখে বসে থাকত। দিদি জোর করে আমাকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যাবার চেষ্টা করত, আর ঠিক এমনই সময়টা বাবা এসে দাঁড়াতেন, কী হল? টুনি এত কাঁদছে কেন? ও কি, বুলা, টুনিকে ওমনি করে এক পা ধরে টানছিস কেন?
দ্যাখো না বাবা, টুনি মাকে কাজ করতে দিচ্ছে না, পুজোর আর ঠিক পনেরো দিন বাকি! এ সবই তো আমাদের শেষ করতে হবে, না কি।
দিদি মাকে সাহায্য করত। বোতাম বসানো, বোম-ঘর করা, হেম-সেলাই করে দেওয়া, সিল্কের জিনিস তৈরি করার সময়ে টানটান করে ধরে বসে থাকা, সব। বাবা সমস্ত শুনে গম্ভীর হয়ে যেতেন। পরদিন দুপুরবেলা গলদঘর্ম হয়ে কোথা থেকে ফিরে এসে ডাকতেন, টুনি-ই, টুনটুনি-ই, টুন-টুনটুনি-ই আমি ছুটে যেতে হাতে একটা বাক্স ধরিয়ে দিয়ে বলতেন, দ্যাখো তো টুনি, পছন্দ হয় কি না ক বাক্সের ভেতর থেকে বেরোত সাদা-ধবধবে সুইস-সিল্কের লেস-দেওয়া স্বর্গীয় ফ্রক, তার জায়গায় জায়গায় ছোট্ট ছোট্ট এমব্রয়ডারির ফুলের গোছা।
ফ্রকটা তুলে নিয়ে তার ভেতরে নাক ডুবিয়ে আমি শুধু সেই গন্ধটুকু নিতুম প্রাণ ভরে, হারিয়ে যেতুম গন্ধটার ভেতর। আমি তখন একটা খুশির পুতুল, ডুবে যাচ্ছি সুখের সাগরে। আর ঠিক সেই সময়ে মা এসে দাঁড়াত, এ কী গো? এ ফ্রক কোত্থেকে আনলে? এ যে অনেক দাম! কোত্থেকে?
নিউ মার্কেট।
ইসসস! কত নিল?
সুন্দর তো বটেই! দামটা কত সুন্দর সেটাও আমার জানা দরকার!
পঁয়তাল্লিশ টাকা।
কী বললে? পয়তাল্লিশ টাকা? এতে যে ওর তিনখানা ফ্রক হয়ে যেত গো! কোথা থেকে…
আঃ, চুপ করো না এখন।
এর পরেও আছে জুতো, মোজা, রিবন, পুজোর কদিনের নানা বায়না…, মা কথা শেষ না করে চলে যেত।
রাত্তিরে দিদি গায়ে হাত বুলোত বুলোতে বলত, টুনি, বাবার না একটা খুব দরকারি জিনিস কেনার ছিল, সেটা বাদ দিয়ে তোর অত দামি ফ্রকটা কিনে এনেছে। তুই কাল বাবাকে বলবি ফ্রকটা ফেরত দিতে, বলবি ওটা তোর পছন্দ নয়, হ্যাঁ?
কী করে মিছে কথা বলব? আমার যে জামাটা খুব পছন্দ দিদি? বাবা দরকারি জিনিসটা অন্য টাকা দিয়ে কিনুক না!
দিদি বলত, বলবি সাদা জামা আমার পছন্দ না, তুই আর জামা নিবি না!
আমি তখন কাঁদো-কাঁদো হয়ে বলতুম, তোমরা সবাই বিচ্ছিরি। আমার জামাটা এত পছন্দ, তবু ওটা অপছন্দ বলতে বলছ। পুতুল, বীথি, পরি, দীপু, মঞ্জু সবাই একেক দিন একেকটা জামা পরবে। সববাই। খালি আমি…। কথা শেষ করতে পারতুম না, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকতুম। কান্নার আওয়াজে মা ঘরে ঢুকে বলত, বুলা। টুনি কাঁদছে কেন রে? বকেছিস?
দ্যাখো না মা আমি নাকেকান্না চড়াবার আগেই দিদির হাত কঠোরভাবে আমার মুখ বন্ধ করে দিত, মা একটুখানি দাঁড়িয়ে থেকে বলত, বুলা, ওকে বকিস না। ছেলেমানুষ…
পুজোর কদিন ভারি মজা। বুড়ির মাথার পাকা চুল, হাওয়া মেঠাই, পাঙ্খ বরফ, লম্বা বেলুনের চ্যাঁ চোঁ, গ্যাস বেলুন। ঠাকুরদালানে ঝাড়বাতির নীচে ডাকের সাজ পরে ঠাকুর ঝলমল করছে। কোনো একজন কাকিমা ডেকে বলছে, টুনি এই সিল্কের জামা তোকে কে দিল রে?
কে আবার দেবে? আমার বাবা। বাবার গর্বে ঝকমকে মুখ আমি দৌড়ে হারিয়ে যাচ্ছি বন্ধুদের ভিড়ে আমার ডাকের সাজে। সাদা ধবধবে সিল্ক, তাতে সরু লেসের পাড়, চকচকে সুন্দর লজেন্স-লজেন্স গন্ধঅলা এমব্রয়ডারির নানান রঙের ফুলের গোছা। টুনি—টুনি-ই, বীথি ডাকছে বুঝি। কী সুন্দর তোর এই জুতোটা! আইরিন এর নাম। বাটার নতুন জুতো, বাবা কিনে দিয়েছে। আমার বাবা! সগর্বে বলতে বলতে আমি দৌড়ে নামব, ঠাকুরদালানে চামড়ার জুতো পরে ওঠা বারণ। তার সামনের চত্বরে হাজার মুখের মেলা, তারই মধ্যে কোনো কোনো চোখ আমার ওপর, আমার ফ্রকের ওপর আটকে যাবে, কেউ হয়তো বলে উঠবে, ফ্রকটা কী সুন্দর, দেখেছ? মিনুকে এই রকম একটা…
নতুন কস্তাপেড়ে শাড়ির আঁচল মাথায় দিয়ে, পায়ে-আলতা মা চলে যাচ্ছে ঠাকুরদালানের দিকে। হাতে পেতলের ভারী থালায় কত কী রহস্যময় পুজোর জিনিস। বাবা কোরা কাপড়ের খুঁট গায়ে জড়িয়ে ঠাকুরমশাইয়ের পেছনটিতে বসে, বিনুর হাত থেকে ফিরোজা রঙের গ্যাস বেলুনটা হুউশশশ! ধনেখালির হলুদ ডুরে শাড়ি পরে দিদি এসে দাঁড়াচ্ছে। আমার দিদি, আরও অনেক দিদি। খুড়তুতো, জাঠতুতো, পাড়াতুতো। কেউ সিল্ক, কেই অর্গ্যাণ্ডি, কেউ বেনারসিই। মহা সমারোহে সন্ধিপুজো শুরু হয়ে গেল। সেই ধুমধামের সন্ধিপুজোর ধুনো-গুগগুলের চোখ-আঁধার করা আবছা পর্দার মধ্যে থেকে ঘোমটার ভেতর মায়ের ভক্তিন, অনিন্দ্য মুখখানা মাঝে মাঝে দেখা দিয়েই হারিয়ে যাচ্ছে। কে যেন বলছে, বুলার শাড়িটা বড্ড খেলো। পুজোর কাজে নষ্ট হয়ে যাবে বলে পরেছে না কি রে? কে যেন তার জবাব দিচ্ছে, দূর, কোথা থেকে দামি শাড়ি পাবে! …কথাগুলো তাদের পুরো অর্থ নিয়ে আমার ছোট্ট মাথায় ঢুকছে না, কিন্তু শরীরে কেমন একটা আসোয়াস্তি, রাগে দুঃখে আস্তে আস্তে কান গরম, মাথা ফাঁকা! আমার দিদির শাড়িটা খেলো! মানে বাজে? কেন? কত সুন্দর দেখাচ্ছে যে দিদিকে! শাঁখে ফু পাড়ছে দিদি সমানে, গালগুলো গোল টোপর হয়ে ফুলে উঠছে, কপাল, নাক, থুতনি সব দুগগা ঠাকুরের মতো লাল! কোথায় চললি টুনি? কে যেন পেছন থেকে বলছে চেঁচিয়ে। ঢাক বাজছে ঢোল বাজছে তুমুল হুল্লোড়ে, কাঁসর বাজছে কাঁই না না কাঁই না না। আমি গরিব, আমরা গরিব, দিদির শাড়িটা খেলো, বিনুর হাফপ্যান্ট ঝলঝলে, বাবার খালি গায়ে কোঁচার খুঁট, এই পুজো, এই হই-চই এসব পুতুল বীথিদের জন্যে, মঞ্জু-দীপুদের জন্যে, মাধুদি, নীলমাসি, নতুন কাকিমা, গীতালিদিদের জন্যে। আমি চলে যাচ্ছি সাদা সিল্কের ফ্রকের ঠাট্টা শুনতে শুনতে আমাদের উঁচু ঘরের অসীম নিঃশব্দ পরিসরের মধ্যে আমার কান্না লুকিয়ে ফেলতে।
