চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন সুমিত্রা। কেন এত মন খারাপ লাগছে তিনি জানেন না। তাঁর নিরপেক্ষ ভূমিকায় ওরা বিশ্বাস করেনি, তাই কি? মুনমুনকে তিনি কতটুকু চেনেন? জননী বলেই হয়তো সবার চেয়ে কম। ওকি তবে পার্থকে ডাক দিয়ে মুখ ফেরাল? না না তা নয়। অন্তত তা নিশ্চয়ই নয়। যৌবনই যৌবনকে এমন হাতছানি দিয়ে ডাকে। ভুলিয়ে নিয়ে যায় মিথ্যে আশার আলেয়া দেখিয়ে—কাদা জলায়, জল-ঝাঁঝির দামে। তারপর দপ করে নিবে যায়। কারণটা প্রাকৃতিক, বৈজ্ঞানিক। আর কিছু নয়। মুনমুন কিছু করেনি, জ্ঞাতসারে কিছু করেনি।
মাথার ওপর একটা জেট প্লেনের আওয়াজ পেয়ে ছেলেমানুষের মতো জানলার কাছে ছুটে গেলেন সুমিত্রা। যেন তিনি ফিরে গেছেন বহুকাল আগেকার সেই ব্যাকুল কৈশোরে। আজই যে সেই তারিখ! আঠাশে জানুয়ারি। খুব নীচু দিয়ে যাচ্ছে প্লেনটা। ওতেই কি পার্থ আছে? চলে যাচ্ছে। অভিমান করে চিরদিনের মতো চলে যাচ্ছে?
পার্থ কি তাঁর জীবন থেকে এই দ্বিতীয়বার বিদায় নিল?
সমুদ্র
ছেলেবেলায় আমরা ছিলুম গরিব। কিন্তু একদম ছোটোদের ঐশ্বর্য সম্পর্কে ধারণাটা বড়োদের মতো নয় বোধহয়। তাই আমার ভাইবোনেরা, অন্তত আমি আর বিনু। জানতুম না যে, আমরা গরিব। বাবা গলা ছেড়ে হা হা করে হাসতেন। মা ছিলেন সন্ধ্যাপ্রদীপের শিখার মতো। আর, আমাদের বাড়ির যে অংশটা আমাদের ভাগে পড়েছিল সেখানে মাঠের মতো দালানের এক অংশ।
আর বিরাট উঁচু সিলিং-এর তিনখানা ঘর, আর জালিঘেরা ব্যাডমিন্টন খেলা যায় এমন বারান্দা—এরকমটা আমাদের কোনো বন্ধু-বান্ধবদের বাড়িতে আমরা দেখিনি। আসবাব ছিল কতকগুলো—আড়ে দিঘে মহাকায় এক আলমারি, ভীষণ ভারী একটা দেরাজ, পেতলের টপওয়ালা টেবিল আর পাঁচ-ছখানা অদ্ভুত আকারের চেয়ার। পায়াগুলো তাদের গড়িয়ে-আসা ঘন গুড়ের মতো। কালচে লাল, মেহগনি পালিশ। সবার ওপরে, আমাদের সবচেয়ে প্রিয় ছিল দালানে আমার চেয়েও বড়ো মাপের একটা সাদা পাথরের পরির মূর্তি। সে ডানা গুটিয়ে মুখ একটু নীচু করে নামছে। একটা পা মাটিতে, আর এক পা এখনও শূন্যে-তোলা পায়ের আধখানা ভাঙা। একটা পা অমন ভাঙা বলেই যেন পরিটা ছিল আমাদের খুব কাছের মানুষের মতো, যার জন্যে মন খারাপ হতে পারে।
কতদিনকার জিনিস সব, হিসেব জানি না, কখনও এসবে পালিশ চড়েনি, ঘরদোর কখনও রং হতে দেখিনি, কিন্তু সব কিছু ঝকঝক তকতক করত। বাবা মা আর দিদি মিলে ঝেড়ে ঝুড়ে সব কিছু এমনি রাখতেন। বাইরের থেকে বাড়িটাকে দেখিয়ে যদি বন্ধুদের বলতুম, এই আমাদের বাড়ি, তাহলে তারা মূৰ্ছা যাবার জোগাড় হত—তোরা এই বাঘ-বাড়িতে থাকিস? তোদের বাবা রাজা নাকি রে? একথা বাবা-মার সামনে বলার জো ছিল না। বললেই বাবার হাসিমুখ আঁধার হয়ে যেত, মায়ের মুখের চেনা আলোর শিখাটা দপ করে নিবে যেত আর পরে কোনো সময়ে দিদি কোনো একটা হাতের কাজ সারতে সারতে আনমনে ধমক লাগাত, বলার আর কথা পাস না, না রে টুনি? হুঁ, রাজা? রানি! রাজকন্যে হবার খুব শখ, না রে? ভগবান জানেন, রাজকন্যে হবার শখ আমার মোটেই ছিল না। রাজকন্যেদের রাজ্যে দৈত্য এসে সব পাথর করে দিয়ে যায়। রাজকন্যেকে উঁচু জলটুঙ্গি ঘরে জন্মের মতো ঘুম পাড়িয়ে রেখে দেয় সোনার কাঠি রুপোর কাঠি মাথায় পায়ে রেখে, জাগায় শুধু নিজের আকাট-বিকট মুখখানা দেখবার জন্যে। রাজকন্যে কি হতে আছে? আমার ভাই বিনুকে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করতুম—হ্যাঁ রে বিনু, দিদি আমাকে বল কেন রে! বাবাকে রাজা বললে বাবা কেন রাগ করে রে? বিনু আমার থেকে বয়সে ছোটো হলে কী হবে, বুদ্ধিতে ছিল অনেক পাকা, বলত, তুই জানিস না টুনি! আমাদের ঠাকুরদার ঠাকুরদা এই এত বড়ো বাড়ি, বাগান, ঠাকুরদালান সব করে গেছিলেন। ঠাকুরদার ঠাকুরদাকে সবাই রাজা বলত।
তো কি? ভালো তো!
দূর বোকা, ভালো কোথায়! মদ খেত তো ঠাকুর্দাদের সবাই। কেউ কোনো কাজ করত না। খালি পায়রা ওড়াত আর বেড়ালের বিয়ে দিত আর সায়েবদের পা চাটত। তাই তো আমাদের আজকে এই দুরবস্তা।
বিনুটা সে সময়ে বাংলায় ভীষণ ভালো হবার চেষ্টা করছে। দুরবস্তা তো কোন ছার অকুতভোয়, অদূরদর্শিতা ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেও ঘন ঘন স্কুলের মাস্টারমশাইদের মূৰ্ছার কারণ হচ্ছে। যাই হোক, বিনুর কথাবার্তা থেকে আমি বোকা মেয়ে খালি এইটুকু উদ্ধার করতে পারতুম, রাজা হওয়াটা খুব খারাপ, রাজারা খুব খারাপ লোক হয়, বোধহয় আমাদের পাড়ার হাতকাটা তেঁতুলদার চেয়েও খারাপ।
একমাত্র দুটো সময়ে আবছাভাবে বুঝতে পারতুম—আমরা গরিব, আমাদের যথেষ্ট পয়সা কড়ি নেই। পুজোর সময়ে আর বেড়াতে যাবার মরশুমে। পুজোর সময়ে আমাদের ঠাকুরদালানে ডাকের সাজ পরা দুর্গাপ্রতিমা পুজো হত, সারা কলকাতার লোক ভেঙে পড়ত ঠাকুর দেখতে, কিন্তু আমাদের দুটোর বেশি তিনটে জামা হত না। মা সারা ভাদ্র-আশ্বিন, সেই পঞ্চমীর দিন পর্যন্ত হাত মেশিনে সেলাই করত। বাড়ির সবার সায়া, পাঞ্জাবি, ব্লাউজ, ফতুয়া, ফ্রক, জাঙিয়া, শার্ট, প্যান্ট। শুধু নিজেদের নয়, সেই রায়বাড়ির বাসিন্দা নানান রকমের কাকা জ্যাঠাদের পরিবারের। এই ডাঁই জামা-কাপড়ের মধ্যে থেকে একটা অপূর্ব থাক থাক দেওয়া সোনালি রঙের খড়মড়ে ফ্রক বার করে হয়তো আমাকে ডেকে বলত, টুনি দ্যাখ দিকি নি পছন্দ হয় কিনা! আমি দৌড়ে আসতুম, অমন জামা পছন্দ না হয়ে পারে? বলতুম, মা এটা অষ্টুমির দিন পরব তো? ষষ্ঠী, সপ্তমী, নবুমি, এগুলো? মা আবার সেই ডাঁইয়ের মধ্যে হাত চালিয়ে একটা সাধারণ ছিটের সাদা সিধে ফ্রক বার করে বলত—এইটা ষষ্ঠীর দিন পরবি।
