ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল মুনমুন। কানের সোনার মাকড়ি দুটো দুলে উঠল। কপালের ওপর কোঁকড়া চুলের গুছি বিদ্রোহের ভঙ্গিতে উড়ছে। কেন?
ওর মা আর দিদি মানে সীমা আজ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল।
ইসসসস।
তোরা যদি ঠিক করে থাকিস, আমার দিক থেকে কোনো আপত্তি হবে না।
তুমি কি পাগল হয়েছ মা?
কেন বল তো? পাগলের কি হল?—বিমূঢ় হয়ে বললেন সুমিত্রা, ছেলে তো ভালোই, খুবই ভালো।
তিনি আশা করেছিলেন অশ্রু, লজ্জা, স্বস্তি। কিন্তু মেয়ে বলল, তুমি ভাবতে পারো ওদের ওই তিন শরিকের বাহান্ন ডালপালার বাড়িতে আমি ঘোমটা মাথায় সবার বউমা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি!
না ভাবার কী আছে? পরিবেশ তো জীবনে বারবার বদল হয়ই, আর হওয়াটাই স্বাস্থ্যকর, কার চরিত্রের কোথায় জোর, পরিবেশ না পালটালে তো বোঝা যায় না মুনমুন। মানুষ তো আর সাজিয়ে রাখার কাচের পুতুল নয় যে এক আলমারি থেকে আর একটা আলমারিতে যাওয়াই তার ভালো!
তাই বলে নাড়গোপাল শ্বশুর?
ছি! এভাবে ভাবা ঠিক নয় মুনমুন!
আর কি ভাবে ভাবব তাহলে?
সে কথার জবাব না দিয়ে সুমিত্রা বললেন, এতো ভালো ছেলে কিন্তু পাওয়া মুশকিল। শুধু কেরিয়ারের জন্য নয়, যুগ পালটে যাচ্ছে, ছেলেরা আজকাল বিশ্বাসের যোগ্য প্রায়ই হয় না। আর তা ছাড়া ও তো বাইরেই চলে যাচ্ছে, যদিও কারও জন্যেই মা-বাবাকে ত্যাগ করার কথা আমি ভাবতে পারি না।
নাড়গোপাল পালের ছেলেকে বিয়ে করলে আমার বাবার মানটা কোথায় থাকবে শুনি?
মেয়ের কথার ধরন শুনে অবাক হলেন সুমিত্রা। মেয়ে তো নয় যেন মেয়ের ঠাকুমা। কোত্থেকে এতো জাত্যভিমান হল এর এই যুগে, এই বয়সে! খুব সম্ভব পিতামহীর প্রভাব। নিষ্ঠাবতী, রক্ষণশীল ব্রাহ্মণঘরের বিধবা ছিলেন শাশুড়ি। যেমন বুদ্ধিমতী, তেমনি কর্মঠ। কিন্তু বংশ আর বিদ্যার অভিমান ছিল বড্ড। মুনমুনকে কি তিনিই এমনি করে ভাবতে শিখিয়ে গেছেন? স্বামী-স্ত্রী দুজনেই তো বেরিয়ে যেতেন। নাতনিকে তো ঠাকুমাই এক রকম মানুষ করেছেন।
দু-দিন পর একটু লাজুক লাজুক মুখে এল পার্থ। মুনমুন অদৃশ্য। সুমিত্রাই গল্পগাছা করলেন, চা দিলেন, যেন মাঝখানে অন্যরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। একটু হতাশের মতো এদিক-ওদিক তাকিয়ে শুকনো মুখে ছেলেটা চলে গেল।
সমস্ত ব্যাপারটাই সুমিত্রার কাছে রহস্যময়। এই এত ভাব! এত ঘনিষ্ঠতা। এই বয়স! পরিবার, সমাজ তাদের রক্তচক্ষুর শাসন উঠিয়ে নিয়েছে। বিচারে-ব্যবহারে প্রায় সিকি শতাব্দী আগে যখন ওঁকে জোর করে পিঁড়িতে তোলা হয়েছিল তখনকার সঙ্গে কত তফাত! মুনমুনকে বললেন, পরিবার, জাত ইত্যাদি ছাড়া আর কিছু আপত্তি আছে তোর?
ক্যাবলা।
তাই বুঝি ডিবেটে প্রাইজ পায়, পাহাড়ে চড়ে!
মাকুন্দ।
তোদের দুজনে তো বেশ ভাব ছিল!
বন্ধু হিসেবে মেশা এক, বিয়ে সম্পূর্ণ অন্য জিনিস মা।
আমি ভালো বুঝি না, আর একটু বুঝিয়ে বল মুনমুন।
বড়দির ছেলের পইতে হবে, মিন্টুর ছেলের পইতে হবে, আমার ছেলের হবে না, না? বাপের বাড়ির কাজে-কর্মে কী পরিচয় হবে আমার? পালেদের বাড়ির ছোটো বউ? তোমার কি এতটুকুও প্র্যাকটিক্যাল সেন্স থাকতে নেই মা? আর এত কথা বলছই বা কেন? পার্থ কি তোমাকে তার উকিল রেখেছে?
কথাগুলো ঝড়ের মতো বলে মুনমুন চোখ-মুখ লাল করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। যেসব কথা একদিন অভিভাবকদের মুখ থেকে নিরুপায় শুনেছেন, সেইসব হতাশাজনক, মনুষ্যত্বের সত্য মূল্য নিরূপণে পরাঙ্খ, মানবতাবিরোধী কথাবার্তা আজ এক যুগ পরে আত্মজার মুখে পুনরাবৃত্ত হতে দেখে কেমন আতঙ্কিত, বিহ্বল হয়ে মুখ ঢাকলেন সুমিত্রা। কোন মন্ত্রে এক প্রজন্মে ভূমিকা এমন পালটে যায়! মুনমুন তবে কার মেয়ে হল? আচারান্ধ পিতৃপুরুষের? তাঁর নয়?
যাক, যারই হোক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন তিনি, ভালোবাসলে কখনও এমন কাটা কাটা, হিসেবি কথাবার্তা বলতে পারত না। কথাটা সোজাসুজি জিজ্ঞেস করা যায়নি। যতই আধুনিক মা হন। তাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এত প্রশ্ন করা। যাক আচরণেই বোঝা যাচ্ছে। প্রশ্ন বাহুল্য। ব্যাপারটা একতরফাই।
নিজমুখে কোনো কথা জানাতে খারাপ লাগল। মুনমুনের মত নেই জানিয়ে একটা চিঠি ছেড়ে দিলেন। শিবনাথকে কিছু বলবার দরকার মনে করলেন না।
পার্থর সঙ্গে দেখা হল দুদিন পরই। একই পাড়ার এ-মোড় ও-মোড়ে থাকা, দেখা না হওয়াই আশ্চর্য। তাঁকে দেখেই উলটোদিকের ফুটপাথে চলে গেল। সুমিত্রা তা সত্ত্বেও রাস্তা পার হলেন, কাছাকাছি দিয়ে খুব কোমল গলায় বললেন, কী রে পার্থ, কাকিমাকে কি ভুল বুঝলি? মাটির দিকে চোখ রেখে শুকনো ঠোঁট দুটোকে শুধু প্রসারিত করল পার্থ। উত্তর দিল না। গালে ওর র্যাফেল-তুলির সে ডৌল যেন ভেঙে গেছে। মাথার উড়ো চুলের বাবুই-বাসায় একবার হাতটা ছোঁয়াবার প্রচণ্ড পিপাসা পেল সুমিত্রার। কিন্তু সব পিপাসাই কি মেটে? কোনো পিপাসাই কি মেটে?
আজ সীমার অর্থাৎ পার্থর বড়দির চিঠি এসেছে। লিখেছে :
আমার ভাই মুনমুনের চেয়ে অনেক চৌখশ মেয়ে পেতে পারত কাকিমা। কিন্তু ভালোলাগার ওপর তো কারও হাত নেই। পার্থ তো বোকা নয়! কারও ওপর জোর করার ছেলেও ও নয়! মুনমুনকে ও কি এতই ভুল বুঝল? ভালো করে খোঁজ নিয়ে দেখবেন তো? অনেকেই অনেক কিছুর সাক্ষী আছে, কাকিমা। আর, এই সিদ্ধান্তই যদি ও নেবে, আর একটু সংযত আচরণ করলেই কি ঠিক হত না? পার্থ চাকরি নিয়ে কানাডা চলে যাচ্ছে। আঠাশে জানুয়ারি। বড্ড সিরিয়াস ছেলে। জানি না আর ফিরবে কি-না। ভায়ের এই খামখা কষ্টটা আমাদের বুকে বড়ো বেজেছে। মুনমুন কি ভালো করল? আপনারা কি ভালো করলেন?
