কর গে না শ্রদ্ধা। আমি কি তোকে বারণ করেছি?
তোর ওই ডাঁট আমি ভাঙব।
সুমিত্রা যেদিক থেকে এসেছিলেন সেদিকেই নিঃশব্দে ফিরে গেলেন। যেন পরের বাড়ির দোরগোড়া থেকে। এদের এতো বাগবিতণ্ডা কীসের? কীসের লড়াই। বাবা-মা এসব কী?
যাই-ই হোক, ব্যাপারটা যে একান্ত ব্যক্তিগত এটা তিনি বুঝেছেন। এবং বুঝে স্তম্ভিত হয়ে গেছেন। আর, ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপারের ওপর চড়াও হতে তাঁর রুচিতে বাধে। সে নিজের মেয়ে হলেও। উনিশ-কুড়ি বছর বয়স তো হল। ও-ও তো এখন একটা পরিপূর্ণ মানুষ!
একটু বাদে বাড়ি না ফিরলে উভয় পক্ষই অপ্রস্তুতে পড়বে। কী দরকার! মোড়ের দোকান থেকে বেশ সময় নিয়ে কয়েকটা মশলা-দেওয়া মিঠে পান সাজালেন তিনি। সেগুলো সংগ্রহ করে খুব বিলম্বিত লয়ে বাড়ি ফিরে দেখলেন সদর খোলা। পার্থর গলা আর শোনা যাচ্ছে না। মুনমুন বসবার ঘরের সোফায়, হাতে একটা বই। বললেন, সন্ধের মুখে দরজা খুলে রেখেছিস যে বড়ো? কতবার বারণ করেছি না?
জবাব দিল না। উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এল। আড়চোখে দেখলেন মুখটা থমথম করছে। বইটা আদৌ পড়ছে বলে মনে হল না। একটু পরে সেটাকে যাকে যথাস্থানে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিঃশব্দে ওপরে চলে যেতে দেখলেন। সম্ভবত নিজের ঘরে। একটু পরে শিবনাথ যখন ফিরলেন তখন বাড়িটা এত অস্বাভাবিক ঠান্ডা যে ভদ্রলোক জিজ্ঞেসই করে ফেললেন, আজ এত চুপচাপ যে! সুমিত্রাই উত্তর দিলেন, হইহই করবার কে আছে বলো। কথাটায় একটা আলতো খোঁচা। যেন হইহই করে সন্ধের ঝোঁকে বাড়ি জমিয়ে রাখবার ভারটা শিবনাথই নিত্য নিয়ে থাকেন। হইহই করবার কেউ না থাকবার জন্যে তিনিই দায়ী। কিন্তু বাবার ঠিকই নজরে পড়েছে মেয়ের মুড ভালো না। এক সন্তানের বাবা-মার অনুভবশক্তি আর পাঁচজনের চেয়ে প্রখর হবেই।
বকাঝকা করেছ নাকি?—রাত্রে শুতে এসে বললেন সুমিত্রাকে। নীল আলোয় বালবটার দিকে চেয়ে জবাবের অপেক্ষা না রেখেই বলে গেলেন একটানা, বকাঝকা করে কোনো লাভ হয় না, বুঝলে? এক জিনিস নিয়ে খিটখিট করাটা ঠিক না। আরও বিতৃষ্ণা এসে যাবে। আর ছেলে-মেয়ে যে বাবা-মার প্রোটোটাইপই হবে এমন কোনো কথা নেই, বুঝলে?
সুমিত্রা শুধু ঘাড় হেলিয়ে বুঝিয়ে দিলেন বুঝেছেন। এ ভদ্রলোক ধরেই নিয়েছেন পড়াশোনা নিয়ে মায়েতে-মেয়েতে কথা-কাটাকাটি হয়েছে। মেয়ে বকুনি খেয়েছে। সুতরাং…কথা বাড়িয়ে আর লাভ কী! এ ভদ্রলোক সারা জীবন ধরেই অনেক কিছু ধরে নিচ্ছেন। এভাবেই চলে আসছে। চলুক। ছেলেমেয়ে মানুষ করার ব্যাপারে ইয়ুঙের মত কী বিড়বিড় করে সেইসব আওড়াতে আওড়াতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লেন শিবনাথ। অনেক সাংসারিক কর্তব্য করা হয়েছে আজ। একটি নিটোল নিদ্রাসুখ উপার্জন করে ফেলেছেন।
এভাবেই ঘর-বার, ভিতর-বাহির, জটিল-সরল সব অঙ্ক মেলাবার দায় সুমিত্রারই। সংশয়, উদ্বেগ, দ্বিধা, বেদনা কোনো কিছুর কথাই বলার কেউ নেই। নিষ্প্রদীপ মঞ্চে, শূন্য প্রেক্ষাগৃহে নির্জন সংলাপ।
কাজেকর্মে সচেতন মন থেকে প্রায় মুছেই গিয়েছিল ঘটনাটা। মুনমুনও মোটামুটি স্বাভাবিক। কলেজ যাচ্ছে, গানের পরীক্ষা দিয়ে এল। পার্থর মা আর বড়দি হঠাৎ এসে উপস্থিত। এ কথা সে কথার পর পার্থর মা বললেন, ছেলের বিদেশ যাওয়া তো প্রায় ঠিক। যাওয়ার আগে মুনমুনের সঙ্গে বিয়েটা চুকিয়ে দিতে চাই আমরা। তারপর ও বউকে সঙ্গেই নিয়ে যাক। কি পড়াশোনা শেষ করবার জন্য এখানেই রেখে যাক, সে ওদের অভিরুচি।
একেবারে চমকে উঠলেন সুমিত্রা। এ সম্ভাবনাটার কথা তো কখনও মনে হয়নি! প্রস্তাবটা তো খারাপ না। কিন্তু ইনি এমনভাবে কথাটা বলছেন যেন বিবাহ ব্যাপায়ের লক্ষ কথার নিরানব্বই হাজার নশো নিরানব্বইটা কথা হরেই গেছে। শেষ কথাটা আজ এইমাত্র হল। তাঁকে নীরব দেখে পার্থর বড়দি বলল, আজকাল তো জাতপাত কেউ তত মানে না, বিশেষ করে আপনাদের মতো উচ্চশিক্ষিত পরিবারে, না কি বলুন কাকিমা! পার্থর ওকে বড্ড পছন্দ। আর আপনি তো জানেনই ও আর পাঁচটা সাধারণ ছেলের মতো নয়।
সুমিত্রার এবার মনে হল ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট-টিকেট সব বাজে। আসলে পার্থ নিজের গুণপণার কথা কাকিমাকে কৌশলে জানাবার জন্যেই দিয়ে গিয়েছিল কাগজটা। বা রে ছেলে! ভারী চালাক তো! দেখলে মনে হয় ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না, কিন্তু কার্যসিদ্ধির উপায়-টুপায়গুলো ভালোই জানা মনে হচ্ছে। মনে মনে ঈষৎ প্রশ্রয় এবং তারিফের হাসিই হাসছিলেন, সহসা আগের দিনেই সংলাপটা মনে পড়ে গেল। ঠিক ধরতে পারেননি, কিন্তু কোথাও যেন একটা চড়া বেসুর বেজেছিল। অন্যমনস্কভাবে বললেন, পার্থকে আমি খুবই পছন্দ করি। কিন্তু মেয়ের তো নিজস্ব মতামত হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ করি। ওর বাবাকেও বলা দরকার। উত্তরে পালগিন্নি তাঁর বড়ো মেয়ের দিকে চেয়ে যেন কী এক গোপন রসিকতায় হাসলেন, মুখে বললেন, তা করবেন বইকি। আমিও তো কর্তাকে বলিনি এখনও।
মুনমুন ফিরল ওঁরা চলে যাবার বেশ খানিকটা পরে। সুমিত্রা তখনই কিছু বললেন না। এখন মেয়ে অন্য মুডে আছে। গুনগুন করে তিলঙ-ঠুংরি ভাঁজছে। এইভাবেই গুনগুন করতে করতে এঘর-ওঘর করবে খানিক, বাবার টেবিল গোছাবে, ধূপ জ্বালাবে গোছা গোছা, ফুলদানির জল পালটাবে, এটা নাড়বে, ওটা টানবে। এখন থাক। ঘন্টাখানেক পর জিজ্ঞেস করলেন কথাটা, তোর সঙ্গে পার্থর কোনো কথা হয়েছে?
