মুনমুনকেই বললেন বিকেলবেলা, দিয়ে আসবি এটা? এক ঝটকা দিল মেয়ে, আমি পারব না।
কেন গানের স্কুলে তো যাবিই?
সে তো উলটো দিকে। তা ছাড়া আমার ভালো লাগে না। নিজে এসে নিয়ে যাক না।
সুমিত্রাকেই উঠতে হল অগত্যা। মুনমুন আছে আছে বেশ আছে। কিন্তু ও মেয়ের নাকে হ্যাঁ করা কোনো যন্ত্রের কর্ম নয়। তা নয়তো তাঁর সংসার মাথায় করে রাখে মেয়ে। ঘরদোর গুছোনো, সব টিপটাপ। কাজের লোক না এলে অর্ধেকের ওপর কাজ ও একাই করে দেয়। স্বভাবটাই সুগৃহিণীর। কিন্তু এই এক দোষ। বড্ড জেদি। কিন্তু মুখে না বললেও পার্থর দরকারটা জরুরিই। প্রতিদিন তাড়া দিতে আসতে ওর সংকোচ হতেই পারে। বাইরে যাবার খুব চেষ্টা করছে বলছিলেন শিবনাথ। দুটো তিনটে ভালো চাকরির অফার ছেড়ে দিয়েছে। স্বাভাবিক। এ বয়সে ভালো কেরিয়ারের ছেলে সবাই বাইরে যেতে চায়। ইন্টারভিউও বোধহয় দিয়েছে দু-একটা।
পার্থর মায়ের সঙ্গে ভালোই আলাপ আছে তাঁর। সঙ্গী না হলেও প্রতিবেশিনী। ছেলেবেলায় যখন পার্থ সারাক্ষণ সুমিত্রাদের বাড়িতেই পড়ে থাকত এবং অনেক সময় রাত্তিরেও বাড়ি যেতে চাইত না, তখন উনি এসে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে যেতেন। সেই সূত্রেই আলাপ। তা নয়তো দুজনের জগৎ সম্পূর্ণ আলাদা। সুমিত্রার থেকে বয়সেও বেশ বড়। বড়ো তিন মেয়ের বিয়েই হয়ে গেছে। পার্থ সবার ছোটো।
গেলে খুব খাতিরযত্ন করেন পার্থর মা। এত বেশি যে সময়ে সময়ে অস্বস্তির কারণ হয়। আজকেও যেতে যেন হাতে চাঁদ পেলেন ভদ্রমহিলা, আসুন আসুন, কি সৌভাগ্য, কার মুখ দেখে উঠেছিলুম আজ?
আপ্যায়নের ধ্রুপদি ধরনে হেসে ফেলে সুমিত্রা বললেন, আমি তো মাঝে মাঝে আসিই। আপনিই বরং…
কোথায় আসেন দরকার ছাড়া? সে ভাগ্যি কি আর করেছি! আর আমি! আমার কথা বাদ দিন। সংসারের ঘানি ঘুরিয়ে যাচ্ছি। জ্ঞাতি-গুষ্টি নিয়ে সংসারটি তো নেহাত ছোটো নয়। সময় কোথায়? অভ্যাসও নেই। উনি তো আবার ওই একরকম। জানেনই তো! পছন্দ-অপছন্দ সব সেই একশো বছর আগে গিয়ে বসে আছে।
এঁর এই উনিটিকে দেখলে সত্যিই বড়ো আশ্চর্য লাগে। পার্থ, শুধু পার্থ কেন, তার দিদিদেরও জনক বলে মনে হয় না। ছেলেমেয়েরা বোধহয় সব মাতুলক্রম হয়েছে। একতাল ভুঁড়িসুষ্ঠু চলন্ত পানতুয়ার মতো আকৃতি। ঠোঁটের কোণ দিয়ে সদাসর্বদা পানের কষ গড়াচ্ছে। পড়াশোনা খুব সম্ভব এপাশ ওপাশ। কাজকর্মও কিছু করেন না। তিন ভাই মিলে দিদিমার বিষয় পেয়েছেন, তারই আয়ে চিরকাল চলে এসেছে। পাড়ার দুষ্টু ছেলেরা নিত্যগোপাল নাম বদলে রেখেছে নাড়গোপাল। জনান্তিকে এই নামই চালু।
কাগজটা পার্থর মা-র হাতে দিয়ে সুমিত্রা বললেন, আপনার সন্তানভাগ্য কিন্তু সত্যিই ঈর্ষা করবার মতো!
মুখটা মুহূর্তে উদভাসিত হয়ে গেল ভদ্রমহিলার। এ কথা সত্যি। আমি হাজার মুখে স্বীকার করছি ভাই। আমার ছেলেমেয়েদের উপযুক্ত বাপ-মা আমরা নই।
ছি, ছি, এসব কি বলছেন।
সবাই বলে। না বললেও আমরা জানি কিন্তু আপনারই সন্তানভাগ্য খারাপ কীসে? অমন ঢলঢলে ঢোলকলমি ফুলের মতো মেয়ে আপনার? গলা কী, যেন মধু ঝরছে! যায় বাড়ি যাবে, আলো করবে।
তবেই হয়েছে। কথাবার্তা যদি শুনতেন! যে শুনবে আর ওপথ মাড়াবে না।
বিনয়ী বাপ-মায়ে এটুকু বলেই থাকে ভাই। পার্থর মা হাসলেন।
সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। চা না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়লেন না উনি। গুচ্ছের দুধ এবং চিনি দেওয়া প্রায় বড়োবাজারি চা। সঙ্গে কচুরি, রসগোল্লা। খাবার জন্য এমন ঝুলোঝুলি করতে লাগলেন যেন ব্যাপারটার ওপর ওঁর জীবনমরণ নির্ভর করছে।
বাড়িতে পৌঁছোতে পৌঁছোতেই আশপাশ থেকে শাঁখের ফু শুনতে পেলেন সুমিত্রা। মধ্য-কলকাতার এ অঞ্চলে এখনও লোকে সন্ধ্যার মঙ্গলশঙ্খ ভোলেননি। তাঁদের বাড়িতে শাশুড়ি যাবার পর থেকে বেকার পড়ে আছে শাঁখটা। তার মনে থাকে না। ঠাকুরদেবতার সাবেক ছবিও সব তুলে ফেলেছেন। ভেতরের কোনো তাগিদ নেই। শুভাশুভের ধর্মাধর্মের সাবেক ধারণাগুলো পুরোনো পাঁজির মতো ধীরে ধীরে বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু শুনলে ভালোই লাগে। ঠাকুরদালানের কোলে দাঁড়িয়ে ভটচায্যি বাড়ির এমনি কত শত সন্ধ্যার মুখ শঙ্খ বাজিয়ে গেছে। চৌকাঠে পড়েছে স্বপ্ন-সাধের মাঙ্গলিক জলছড়া। অনুষঙ্গ সবই সৃখবহ নয়। তব ভালো লাগে। ব্যথামিশ্রিত কেমন এক ধরনের শান্ত ভালো-লাগা। অভিজ্ঞতার রসায়নে ভালোমন্দ সব সংহত হয়ে যাওয়ার ভালো-লাগা।
সদর দরজা ভেজানো ছিল। ঢুকতে ঢুকতে বাইরের ঘরে পার্থর গলা শুনে চমকালেন সুমিত্রা। গলায় ঝাঁঝ।
কীসের এতো ডাঁট তোর?
কীসের, তুই-ই বল না, মুনমুনের ধারালো গলা।
তবে শুনে রাখ, তোর ও ডাঁট আমি আইডেনটিফাই করতে পেরেছি, ওটা জাতের ডাঁট। তুই মধ্য ভারতের ঠাকুরসাহেবদের সগোত্র। এখনও যে মেন্টালিটি থেকে এদেশে মানুষ হরিজন পোড়ায় তোর মধ্যেও সেই একই মেন্টালিটি।
তাই নাকি? সবই তো জেনে গেছিস তা হলে। যা ভাবিস ভাব। ডাঁট তো আমি ইচ্ছে করে কাউকে দেখাতে যাইনি। তুই কেন খোঁচাচ্ছিস?
শিবকাকার থেকে আমি কম কীসে রে?
বাবার কথা তুলছিস? মুনমুনের গলায় সক্রোধ বিস্ময়। তুললি ভালোই করলি। আমার বাবার মতো বাবা, আমার মায়ের মতো মা আর কটা আছে এ পাড়ায়?
দ্যাখ মুনমুন, শিক্ষাদীক্ষা, স্ট্যাটাস দিয়ে বাবা-মার বিচার করতে নেই। বাবা-মা আমাদের সবারই শ্রদ্ধা-ভালোবাসার জিনিস।
