অগত্যা জানলা দিয়ে মুখ বাড়লেন সুমিত্রা। কে? গলার আওয়াজে যদি জানান দেয়।
আমি! নীচ থেকে উত্তর এল।
কোন আমি রে?
আমি পার্থ, কাকিমা।
গলা শুনে বুঝতেই পেরেছিলেন। তবু নিশ্চিন্ত হয়ে নিলেন। বাইরে এখন নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। সাবধানের মার নেই।
আজ সন্ধেতেই পার্থ এমন হুড়মুড়িয়ে এসে পড়বে ভাবেননি সুমিত্রা। সকালবেলা কলেজ যাবার মুখে কাগজটা দিয়ে গিয়েছিল। গুণাবলির বিস্তৃত বিবরণ। ওর নিজের। একটা ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দরকার। দেবেন ওর কোনো মাস্টারমশাই। লিখে, টাইপ করে নিয়ে যেতে বলেছেন, দস্তখত করে স্ট্যাম্প বসিয়ে দেবেন। তাই সুমিত্রার দ্বারস্থ হয়েছিল। ভালো করে গুছিয়ে লিখে দিতে হবে জিনিসটা। তা এখনও কাগজটা ভালো করে দেখবার সুযোগই পাননি তিনি। চারটে ক্লাস ছিল পরপর। তারপর মাঝখানে একটা মাত্র অফ দিয়ে আরও একটা। ডিপার্টমেন্টে লোক কম। এ সময়টা বিদায়ি সেকেন্ড ইয়ার আর প্লাস টু নিয়ে তাঁরা নাস্তানাবুদ হচ্ছেন। মুনমুনকে চেঁচিয়ে বললেন দরজাটা খুলে দিতে, তারপর হারিকেনের আলোয় খুব ক্লান্ত চোখে কাগজটা মেলে ধরলেন।
হায়ার সেকেন্ডারিতে স্টার মার্কস। অঙ্ক এবং দুটো বিজ্ঞানে লেটার। এম টেক-এ ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। এদিকে আবার মাউন্টেনিয়রিং-এ ট্রেনিং নিয়েছে। সাঁতারে সার্টিফিকেট আছে। বাববাঃ, এত সব এরা করে কখন? ছেলে ভালো জানতেন, ডিবেটে স্কুলের প্রতিনিধিত্ব করেছে বহুবার। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে আরও এত গুণ তো সত্যিই জানা ছিল না। এতটা চৌখশ দেখলে মনেও হয় না। লম্বায় বেশ ছাড়ালো হলেও ছেলেটার মুখে চোখে একটা মেয়েলি লাবণ্য, কর্কশকান্তি হয়নি এখনও। যুবক নয়, বরং যেন সেইসব কাকপক্ষধর কিশোর স্নাতকের মতোই দেখায় ওকে—ডিগ্রিলাভের আগে আচার্যের প্রসাদ-লাভের আশায় যারা গুরুগৃহের সবরকম আবদার-অত্যাচার হাসিমুখে সহ্য করত। অথচ ফাইনাল পরীক্ষা পাস করেছে তাও আজ বছরখানেকের ওপর হয়ে গেল। নিজের ছেলে নেই বলেই কি এ ছেলেটার ওপর কেমন একটা ঝোঁক সুমিত্রার?
মুনমুনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঘরে ঢুকল পার্থ। এশিয়ান গেমসের ফলাফল নিয়ে খুব উত্তেজিত দুজনেই। সুমিত্রা বললেন, তোর কাজটা এখনও হয়নি রে! দেখবার সময়ই পাইনি সারাদিন। পাঁচ-পাঁচটা ক্লাস ছিল।
তাতে কি হয়েছে? অপ্রস্তুত হয়ে বলে উঠল পার্থ। আমি আপনাকে তাড়া দিতে আসিনি কাকিমা, কাল কিংবা পরশু হলেও চলবে।
কী কাজ রে? মুনমুন জিজ্ঞেস করল। এবং শুনেই ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিল কাগজটা। পরক্ষণেই চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, আরিস সাবাস। তোর নম্বর দেখে যে আমার মাথা ঘুরছে? লেটারই মেরেছিস তিন-তিনটে? অঙ্কেতেও? নাঃ গুরুদেব লোক তুই, পায়ের ধুলো দে।
আঃ মুনমুন! আজকালকার মেয়েদের এইসব চ্যাংড়া-চ্যাংড়া পুরুষালি বুলি একদম পছন্দ হয় না সুমিত্রার।
পার্থ বলল, কেন, তুই কত পেয়েছিলি?
শুনলে তোরও মাথা ঘুরবে, তবে উলটো বাগে।
বল না কত?
সুমিত্রাই বললেন, কত আবার পাবে, পঞ্চান্ন না ছাপ্পান্ন।
পার্থ বলল, বাঃ বাঃ। চমৎকার পেয়েছিস তো! মেয়েরা অঙ্কে একটু কাঁচাই হয়, বাংলা–টাংলা হিস্ট্রি-টিস্ট্রি পড়বে, ক্ষতি কী?
মুনমুন রেগে বলল, আর আমাদের ফার্স্ট গার্ল যে বিরানব্বই পেয়েছে, তার বেলা? আমি কাঁচা বলেই অমনি সমস্ত মেয়ে-জাতটাই অঙ্কে কাঁচা হয়ে গেল? সাধে কি তোকে হাঁদা বলি!
পার্থ বলল, রাগ করছিস কেন! কথাটা আমার না, সমাজবিজ্ঞানীদের। রীতিমতো স্ট্যাটিসটিক্স নিয়ে দেখা গেছে। আমি শুধু কোট করছি, বুঝলি বুন্ধু!
ঝগড়া করতে করতেই বেরিয়ে গেল দুজনে। মুখে একটু অন্যমনস্ক হাসি নিয়ে অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকলেন সুমিত্রা। এ তো ভালো! ছেলেবেলায় ওরা রীতিমতো চুলোচুলি করত। এখন আর পার্থর মাথায় মুনমুনের হাত পৌঁছোয় না। অন্তত এক হাত উঁচু। তাই-ই বোধহয় সম্পর্কটা খুনসুটিতে দাঁড়িয়েছে। সুমিত্রারা ছিলেন চার ভাই বোন। চুলাচুলি করবার লোকের অভাব ছিল না বাড়িতে। ছোটোবেলায় মারামারির চিহ্ন এখনও তাঁর হাতে আর পিঠোপিঠি ভাইয়ের গালে রয়ে গেছে। ভাইবোনের এইসব বাল্যকালীন চুলোচুলির স্মৃতিও যে কত গুপ্তসুখের বন্ধ দরজা মন্ত্রবলে খুলে দিতে পারে তা তাঁর অজানা নেই। চেষ্টা-চরিত্র করেও মুনমুনের একটা সঙ্গী জোটাতে পারেননি তিনি। প্রথম সন্তানই বহু কষ্টের। ডাক্তার বলেই দিয়েছিলেন আর আশা নেই। তা নয়তো গড়পড়তা মায়ের মতো একটি পুত্রসন্তানের আকাঙক্ষা তাঁর ছিল বইকি! মুনমুনের বাবা অবশ্য বলেন, ভালোই হয়েছে। বিয়ে দিয়ে দোব, চুকে যাবে। বদসঙ্গে পড়ল কি-না, পলিটিক্সের খপ্পরে পড়ল কি-না দেখতে হবে না। যেন মেয়েরা আর বদসঙ্গে পড়ে না, রাজনীতি করে না।
কতই আর বয়স হবে পার্থর। মুনমুনের চেয়ে জোর বছর তিনেকের বড়ো। শক্ত হাত পা চ্যাটালো বুক। কিন্তু মুখটা বড়ো সুকুমার। র্যাফেলের দেবদূতদের মতো অপাপবিদ্ধ। পরদিন অফ পিরিয়ডে বসে যত্ন করে সার্টিফিকেটটা লিখে ফেললেন সুমিত্রা। ছেলেটা বড়ো হবে মনে হয়, হোক। ক্ষমতা আছে, উচ্চাশা আছে, চেষ্টাও আছে। ওর উত্তরোত্তর উন্নতির নাটকে তাঁর এইটুকু পরোক্ষ ভূমিকা থাক। কাকিমা কাকিমা করে। সেই এতটুকুনি বয়স থেকে দেখছেন। মাঝে হস্টেলে থাকতে কিছুটা চোখ-আড়াল হয়েছিল। কিন্তু এখন যেন সেই ফাঁকিটুকু উশুল করে নিতেই এ বাড়িতে দিবারাত্র গতায়াত। সবকিছু শলাপরামর্শ, আলাপ আলোচনা-হয় কাকাবাবু, নয় কাকিমা। নিজের বাড়িতে মানসিক রসদের জোগান পায় না, এ সন্দেহও নেহাত অমূলক নয়।
