দরজা দিয়ে গামলা-মগ-গামছা-তোয়ালে আরও কী কী নিয়ে মেজদি-ছোড়দি ঢুকল। মেজদি বলল, যতি, নিজে নিজে দাঁত-টাত মাজতে পারবি তো?
আমি দেখলুম কনুইয়ে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে উঠতে পারছি। মুখ-টুখ ধুয়ে ছোড়দির কাঁধে ভর দিয়ে কলঘরে যাচ্ছি, ছোড়দি বলল, জটিয়াবাবা কথা বলছিস কেন রে? রাগ করেছিস আমার ওপর? আমার চোখ জ্বালা করছে। কলঘরে ঢুকে চোখের জল লুকোই। দোতলায় ধরা জল। কল থেকে যদি জল পড়ত তো কলটা খুলে রেখে আমি খানিকটা শব্দ করে কেঁদে নিতে পারতুম। নিজের এইসব প্রবৃত্তিতে আমার নিজের ওপর ঘেন্না আরও বেড়ে যায়। ছেলেরা, আমার বয়সের ছেলেরা কাঁদে না। দাদাকে দেখেছি, ফার্স্ট ক্লাস ফসকাতে ভীষণ মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু দিদিদের মতো কান্নাকাটি করেনি। কেমন গুম হয়ে ছিল অনেকদিন। যখন জ্যাঠামশাই মারা গেলেন, বাবা জ্যাঠামশাইকে ভীষণ ভালোবাসতেন, শ্মশান থেকে এসে দাঁড়ালেন—মুখটা যেন ঝলসে গেছে। সেই কালচে ভাব বাবার মুখে এখনও আছে। কিন্তু কাঁদতে দেখিনি। আমি যে কোনোমতেই আমার বাবার মতো, দাদার মতো নই হতে পারছি না—এটাই প্রমাণ করে মানুষ হিসেবে আমি কত নিকৃষ্ট। ভালোবাসবার মতো, পছন্দ করবার মতো আমার মধ্যে কিছু নেই। মেজদি দরজায় টোকা দিচ্ছে যতি, হল? সাড়া দে একটা। অনেক কষ্টে গলা পরিষ্কার করে বললুম, যাচ্ছি। নিজের গলাটা নিজের কানেই হতকুচ্ছিত লাগল। তিন চারটে স্বর বেরোচ্ছে যেন। কী করে আমি তাড়াতাড়ি করব। জুতোর মধ্যে পা-গলানোর মতো আমার নিজেকে যে শরীরের মধ্যে গলাতে হয়।
বাবা, বাবা আমার সঙ্গে কথা বলছেন! বা বা। কী ভীষণ ভয় পাই বাবাকে, সম্রম করি। আমার মতো একটা অবাঞ্ছিত উৎপাত, কুরূপ, নির্গণের সঙ্গে বাবা আলাদা করে কী কথা বলতে চেয়েছেন? ভয়ানক ভয়ে প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে আমি দাঁড়িয়ে আছি।
বোসো যতি—বাবার চেম্বার এটা। রাত নটা। সবেমাত্র শেষ মক্কল, সেইসঙ্গে মুহুরি কাকা চলে গেলেন। অতবড়ো গদিওলা চেয়ারে আমার হালকা শরীরটা রাখতে আমার ভয় করছিল। এত হালকা আমি … যদি আবার …।
শরীরটা এখন কেমন বোধ করছ?
মুখ নীচু করে বলি, ভালো।
সত্যিই মাসখানেকের ওপর আমি বাড়িতেই আছি। অহরহ ফলের রস, দুধ, ছানা, ডিম খাচ্ছি। তাকিয়ে দেখি আমার বাইরের চেহারাটা একটু একটু চকচকে হয়েছে বটে। চোখের সেই গর্তে-বসা ভাবটা নেই আর। গাল-টালগুলো অত কালো নেই। চুল কাটা হয়নি অনেকদিন। মাথার পেছনের কতকগুলো চুল কীরকম খাড়া থাকত। এখন সেগুলো বসে গেছে। চুলগুলো বড়ো হয়ে ঘাড়ের কাছে কেমন একটু পাকিয়ে গেছে। কিন্তু এ সবই তো বাইরের ভেতরে আমি প্রায় সেই একইরকম কৃষ্ণকায়, কাষ্ঠকঠিন, নির্বান্ধব, যতি দা ডার্ক। রাতের আঁধার, সবুজ বাতির লক্ষ্মণের গণ্ডির প্রান্ত থেকে রোজ উঁকিঝুঁকি মারে। আমার আসল জায়গা, আমি জানি, সবুজ আলোর বৃত্তের ওপারে, ওই অন্ধকারে, অজানায়। যা পাচ্ছি, আমার প্রাপ্য বলে পাচ্ছি না, নারীজাতির চরিত্রে অসীম করুণা, তাই তার থেকে আমার মতো অভাজনও কিছু পায়। নিজস্ব কোনো গুণে নয়।
বাবা গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, খোঁজ নিয়ে জানলাম গত তিন চার মাস তুমি স্কুলে যাওনি, কোয়ার্টারলি পরীক্ষাটাও মিস করেছ, কেন? কেনটা বাবা খুব ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলেন যেন বাবাকে আমি যতটা লজ্জা পাচ্ছি, ভয় করছি, বাবা তার চেয়েও ভয় লজ্জা আমাকে পাচ্ছেন। আমি কিছুই বলতে পারছি না। যে চেয়ারে আমি বসে আছি, তারই পাশে আমি দাঁড়িয়ে আছি অসহায়, উদাসীন।
পড়াশোনা করতে ভালো লাগছে না যতি? তোমার প্রোগ্রেস তো খারাপ নয়?
এই সময়ে দাদা বাড়ি ফিরল। সে টেবিলের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে গেল। বাবার দিকে একবার, আমার দিকে একবার চাইছে। চোখে খুব দুশ্চিন্তা। সুইং-ডোরটা খুলে আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকে এল বড়দি। পেছনে মেজদি, ছোড়দি, মা-ও। ওরা কি আড়ালে কোথাও অপেক্ষা করছিল? দিদি বলল, যতি, আজ তোকে বলতেই হবে স্কুলে তোকে কে এমন কী বলেছে যে স্কুলে যাবার নাম করে … মেজদি বলল, যতি, তোকে যদি বদমাশ লোকে ধরত। তুই যদি হারিয়ে যেতিস …ও কি রে তুই কাঁদছিস? আমার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল পড়ছিল ভীষণ জ্বালা করে। আমি দেখতে পেলুম মা আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে, ছোড়দি কাঁদছে। বাবা বললেন, ঠিক আছে। শরীরটা ঠিক কয়ে নাও। দেখি কী করা যায়।
আমি তখন উঠে দাঁড়াচ্ছিলুম। পাতালের দেবতা আমাকে দু-হাতে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন। তাই আমার হাতে হাত, পারে পা, চোখে চোখ, কানে কান সব খাপে খাপে বসে যাচ্ছিল। কাটা দরজাটা দিয়ে ভেতরবাড়িতে যেতে যেতে শুনতে পাচ্ছিলুম বাবা আস্তে করে বলছেন, আর মনটা যতি, মনটাকেও ঠিক করো। বাবা হয়তো আর বলেননি, কিন্তু গুনগুন করছিল আমার কানের সন্নিকটে বাবার গলা, মন, মন, মনটা যতি মন।
সবর্ণ
সবেমাত্র আলোটা জ্বেলে দিয়ে সারাদিনের পর একটা পত্রিকা হাতে একটু গা এলিয়েছেন সুমিত্রা, ঝপ করে বিদ্যুৎ পিঠটান দিল। সদর দরজায় কড়াটাও সঙ্গে সঙ্গে যেন ষড়যন্ত্র করেই খটাখট নড়ে উঠল। বাইরের ধোঁয়াশার পিঠে ভর দিয়ে উঁচিয়ে আছে মধ্য পৌষের দমচাপা হিমেল সন্ধে। কাজের লোক, মুনমুনের বাবা কেউ এ সময়টা বাড়ি থাকেন না, শুধু তিনি আর মেয়ে। এই পরিস্থিতিতে দরজার কড়া নড়া-টড়া একেবারেই মনঃপূত নয় তাঁর। বহুবার শিবনাথকে বলেছেন। একটা ম্যাজিক-আইয়ের ব্যবস্থা করতে। সন্ধে হোক আর যাইহোক, কড়ানাড়া মানুষটার আবছা আদলও তো বোঝা যায়। তা এসব তুচ্ছ বৈষয়িক কথাবার্তায় সে ভদ্রলোক কান দিলে তো! মাইক্রো অথবা ম্যাক্রো এই দুই চরম জগতেই তাঁর ইন্দ্রিয়াদির ক্রিয়াকলাপ সীমাবদ্ধ। মধ্যবিত্ত ব্যাপার চট করে শ্রুতিগোচর হয় না।
