বাবা বললেন, অবিনাশদা, ও কিছু বলল?
ডাক্তারবাবু ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন, যতি, কিছু বলছ?
আমি পাঠাচ্ছি আমার বার্তা, আমার শরীর সেটা কিছুতেই ধরতে পারছে না।
ডাক্তারবাবু বললেন, ও শুধু গোঙাচ্ছে। তিনি ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ বার করলেন।
দিদিরা বলে আমি নাকি বুভুক্ষুর মতো ঘুমিয়েছিলুম, একটা হা-ঘুম, যো-ঘুম মানুষের মতো। একবারও নড়িনি, একবারও পাশ ফিরিনি। কী করে নড়বো? আসলে আমি তো কড়িকাঠের কাছে। ঘরে মৃদু সবুজ আলো জ্বলছে। মা আমাকে ছুঁয়ে শুয়েছিল। বাবা অন্য ঘর থেকে মাঝে মাঝে এসে দাঁড়াচ্ছিলেন। বেশ খানিকক্ষণ ধরে আমার বুকের ওঠা-পড়া দেখে মাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, কী গো? কী বুঝছ? ও ঘুমোচ্ছে না অজ্ঞান হয়ে আছে!
মা বলছিল কাঁদো-কাঁদো গলায়, আমি তো সেটাই বুঝতে পারছি না। শীলু, তোর কী মনে হচ্ছে?
ও ঘুমোচ্ছে মা, ডাক্তারবাবু ইনজেকশন দিয়ে গেলেন না?
তারই এফেক্ট বলছিস? বাবা যেন হাঁফ ছেড়ে বললে।
তা ছাড়া কী? তুমি শুতে যাও।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল না। দুপুরেও না। বিকেলে যখন পশ্চিমের জানলা দিয়ে রাঙা রাঙা রোদ ঘরের মেঝেয় এসে পড়েছে তখন আমার ঘুম ভাঙল। ঠিক সেই সময়টায় ঘরে কেউ ছিল না। আমি জেগে উঠে বুঝতে পারিনি ওটা বিকেল। ওপর থেকে দেখলুম একটা শূন্য ঘরে তক্তাপোশের বিছানার ওপর যতি শুয়ে আছে। গায়ের চাদরটা কোমরের কাছে। ঘরে রোদ। আমি ভাবলুম ভোর হয়েছে। পশ্চিমের জানলা দিয়ে যে সকালবেলার রোদ আসতে পারে না অতসব আমার খেয়াল ছিল না। বিশেষত আমি। আসল আমি রয়েছি কড়িকাঠে, উপুড় হয়ে দেখছি ঘরটা। কিন্তু পাশের বাড়িতে ঝাঁটার শব্দ জানলার ঠিক বাইরে টিউবওয়েলে, সকালে একটা মস্ত লাইন পড়ে যায়। তার হট্টগোল, চেঁচামেচি এইসব মেশানো থাকে সকালের হাওয়ায়। সেগুলো পাচ্ছিলুম না, তাই কেমন গা ছমছম করছিল। এ যেন অন্য কোথাওকার সকাল। একা, আমি একা। পাশ ফেরবার চেষ্টা করলুম, যেন একটা পাথরকে নাড়াচ্ছি এমনি শক্ত, ঠান্ডা হয়ে আছে শরীরটা। ছোড়দি ঘরে এল। ছোড়দির মাথায় কষে আঁট করে বাঁধা দুটো মোটা মোটা বিনুনি। একটা খয়েরি রঙের ডুরে শাড়ি, খয়েরির ওপর হলুদ ডুরে, ছোড়দির মুখে আলতো পাউডার, কপালে টিপ। এখন অর্থাৎ সকালে ছোড়দির চুল ভিজে এলো থাকার কথা, মুখ তেলতেলে, স্নিগ্ধ। আমার বিভ্রম আরও বেড়ে গেল। কীরকম মনে হল আমাকে ফেলে রেখে ওরা সবাই কোথায় চলে যাচ্ছে। ছোড়দি বোধহয় নিজের কিছু জিনিস ভুলে গিয়েছিল তাই একবারটির জন্য ফিরে এসেছে। যাক, তাই যাক। আমি এখন সব শেষের জন্য প্রস্তুত। যা ঘটার তো তা ঘটবেই। হঠাৎ মাথার মধ্যে মায়ের অর্ধেক কান্না অর্ধেক মমতামাখানো ডাক শুনতে পেলুম, যতি। যতি রে! ঘাড় সামান্য বেঁকিয়ে ছোড়দির দিকে চাইলুম। ছোড়দি আমার পাশে বসে পড়ে ঝলক ঝলক হেসে বলল, উঠেছিস? একখানা ঘুম দেখালি বাবা! কটা বাজে জানিস? সাড়ে তিনটে। বিকেল সাড়ে তিনটে। প্রায় চব্বিশ ঘন্টা ঘুমোলি। দাঁড়া দিদি মেজদিকে ডাকি। এইবারে, এই ছুতোয় ও চলে যাবে, প্রাণপণ চেষ্টায় আমি ছোড়দির আঁচলে একটাই দুর্বল টান দিলুম, বোস না ছোড়দি। বাঃ তোকে মুখ ধুতে জামাকাপড় ছাড়তে হবে না? খেতে হবে না? আগে মুখ ধুয়েই খেতে হবে। কীরকম চিঁচি করছিস দেখছিস না?
ছোড়দি ছুট্টে চলে গেল। আমার দিদি খুব গম্ভীর প্রকৃতির, দায়িত্বশীল, মায়ের চেয়েও যেন বড়ো, মেজদিও কতকটা তাই। কিন্তু ছোড়দি টুলটুল কথায় কথায় হাসে। হাসলে ছোড়দির ঝকঝকে দাঁত দেখা যায়, সামনে পেছনে বাতাস লাগা গাছের মতন ছোড়দি দোলে। ছোড়দির অদ্ভুত অদ্ভুত কথা আছে, আদরের ডাক আছে, সিঁড়ি দিয়ে লাফ দিয়ে দিয়ে নামতে নামতে বলে, মাং, দিদিং খিদিং পেয়েছেং। কখনং হবেং? ক্রিপস-মিশনং ব্যর্থং ব্যর্থং। অর্থাৎ ও ইতিহাস পড়ছিল। ক্রিপসমিশনের ব্যর্থতার কথা পর্যন্ত পড়েছে। আর পারছে না, এবার ওকে খেতে দিতে হবে। ভুলুকে ও কখনও বলে ভুলিওকাস দা সেকেন্ড। কখনও ভুল ভুলাইয়া, কখনও সাদাসিধে ভুল-মহারাজ। শুধু বলে না, চটকে চটকে উৎখাত করে দেয় একেবারে, যতক্ষণ না ভুলু ওঁমা। ওঁ দিদি দেখোঁ না বলে নাকি সুর ধরছে। অমন যে গম্ভীর দাদা এম, এসসি কয়ে রিসার্চ করছে, চোখে সোনালি চশমা, তাকেও ছোড়দি ছেড়ে কথা কয় না। কখনও বলবে গোপাল গোবিন্দ মুকুন্দ শৌরে কখনও বলবে, এই যে গ্যাপেলিও গ্যালিলিও আঁকটা কষে দিন তো { দাদার একটা অদ্ভুত শাসন আছে। বাঁ হাত দিয়ে, দাদা ন্যাটা তো! বাঁ হাতের শুধু তর্জনী দিয়ে গালের ওপর চড়াৎ করে মারে। ভীষণ লাগে। আমি অনেকবার খেয়েছি ছোড়দিও খেয়েছে। যে দাদার কাছে পড়তে যাবে সে-ই একবার না একবার খাবে। ওইরকম এক আঙুলের চড় খেয়েও ছোড়দি এক হাতে গাল চেপে বলবে, উফফ এ কী চড়কোভস্কি রে বাবা, মাথাটা যে গোগোল গোগোলোভিচ হয়ে গেল। আঁকগুলো প্যাঁক প্যাঁক করে পালিয়ে যাচ্ছে! ছোড়দি সবে শাড়ি ধরেছে। তাই ছোড়দিকে আমার কেমন অচেনা লাগে। বড্ড বেশি মেয়ে মেয়ে! আর মেয়ে দেখলেই আমি কুঁকড়ে যাই। মেয়েরা আমাকে দেখলে হাসে, নিজেদের মধ্যে কীসব চুপিচুপি বলাবলি করে, মেয়েদের ছায়া আমি পারতপক্ষে মাড়াই না। ছোড়দিটা ইদানীং ফ্রক-স্কার্ট ছেড়ে সেই ভয়ংকর মেয়েদের দলে ভরতি হয়েছে।
