ভালো লাগছে না—কোনোমতে বলে আবার সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, দেখি দুই দিদি তখনও সিঁড়ির মাথায় গুলতানি করছে। আমাকে উঠতে দেখে দিদি কী যেন বলতে বলতে আমার দিকে এগিয়ে এল। আর আমার ভেতর থেকে কতদিনের ঘেন্না, কষ্ট, রাগ, দুঃখ, খালি পেটে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরার অনিয়ম, সমস্ত হড়হড় করে বমি হয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল। ভীষণ কষ্টে আমি সিঁড়ি টপকে নীচে পড়তে থাকলুম। প্রচণ্ড লাগল মাথায়, তারপর সব কালো।
মাথাটা পরিষ্কার হতে চোখ মেলে দেখি অনেক জোড়া চোখ আমার ওপর। মাথার যেখানটায় লাগছে সেখানে ঠান্ডা কিছু চেপে ধরেছে কেউ। চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে কেউ। চোখ মেলতে দেখে মা আতঙ্কিত গলায় বলল, যতি, যতি, ও যতি, বমি করে অমন অজ্ঞান হয়ে গেলি কেন? খুব লেগেছে মাথায়? গা টা গরম গরম লাগছে। কখন থেকে শরীর খারাপ হল?
মা একটানা বকেই যাচ্ছে, বকেই যাচ্ছে। দিদি বলল, মা, ওকে এখন কথা বলিয়ো না। দাঁড়াও ওর জামা-টামাগুলো পালটে দিই। কী বিশ্রী গন্ধ বেরচ্ছে। বুলু বালতি করে জল নিয়ে আয় তো? আমার নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই। কথা বলবার চেষ্টা করলেও বলতে পারছি না। শরীরটা যেন কাঠের মতো শক্ত। আমি দেখতে পাচ্ছি বমিতে মাখামাখি কাঠের মতো আমার শরীরটা মেঝেতে পড়ে আছে। সেটাকে ঘিরে মা আর দুই দিদি। মেজদি জল নিয়ে এল, খোসা ছাড়াবার মতো করে জামাকাপড় ছাড়িয়ে নিচ্ছে দিদিরা, মুখটা কাত করে ভালো করে গামছা ভিজিয়ে ধুয়ে দিচ্ছে মুখ। আমার চোখ দুটো কড়িকাঠের দিকে চেয়ে আছে। গায়ে পাউডার দিয়ে দিল মেজদি। কোমরের ওপর চাদর চাপা দিয়ে দিদি আমার প্যান্ট খুলে নিল। পাজামা পরিয়ে দিল। পায়ের পাতাগুলো ঘষে ঘষে মুছিয়ে দিচ্ছে। কী বিশ্রী দেখতে আমাকে। ঠিক একটা পোড়া কাঠের টুকরোর মতো। কানগুলো মস্ত বড়ো বড়ো, লতপত করছে। মাথার পেছনের চুল খাড়া খাড়া। ঠোঁটের ওপর মুখের কালি যেন গাঢ় হয়েছে। এমন স্পষ্টভাবে নিজেকে আমি কী করে দেখতে পাচ্ছি? চোখের ওপর একটা আয়না ধরা আছে নাকি? তারপর দেখলুম মা ভয়ার্ত গলায় বলছে, বুলু, ডাক্তার ডাক, ও ওরকম কড়িকাঠের দিকে চেয়ে রয়েছে কেন? ও সাড়া দিচ্ছে না কেন? যতি, ও যতি। আমি তখন বললুম, মা যতি মানে কী, আমার নাম যতি কেন? তোমরা সবাই কেন আমার ওপর এত বিরূপ? কেন, আমি কী করেছি মা? দেখতে পেলুম মা আমাকে ঝাঁকাচ্ছে আর কাঁদছে, যতি, যতি রে, অমন করে চেয়ে আছিস কেন? আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস না? বুঝতে পারলুম মা আমার কথা আদৌ শুনতে পায়নি। তখন আমার খেয়াল হল আমি মাকে কথাগুলো বললুম রাস্তার দিকের জানলার কাছ থেকে, যদিও আমার কাঠের মতো শরীরটা পড়ে আছে দরজার কাছে মেঝেয়। দুই দিদি আর মা শরীরটাকে অনেক কষ্টে তুলে তক্তাপোশে শোয়ালে। দিদি বলল, মা কেঁদো না, পড়ে গিয়ে এরকম হয়েছে। কী যে মুশকিল, দাদার এখনও পাত্তা নেই। বাবা কখন আসবে কে জানে, বুলু তুই ও বাড়ি থেকে টুলটুলকে ডেকে নিয়ে ডাক্তারবাবুর কাছে যা। মেজদি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, টুলটুলকে আর ডাকবার সময় নেই, আমি যাচ্ছি। মেজদি এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। জানলার কাছ থেকে আমি আমার চোখ দুটোকে প্রাণপণে বুজিয়ে চেষ্টা করতে লাগলুম, মা ভীষণ ভয় পাচ্ছে। ক্রমাগত কাঁদছে আর দুর্বল গলায় বলে যাচ্ছে, যতি, যতি রে। আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস না! কী হবে এখন, শীলা, কী হবে? দিদি ক্রমাগত আমার শক্ত হাতে পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর বলছে, মা চুপ করো, কাঁদছ কেন, অসুখবিসুখ মানুষের হয় না?
আস্তে আস্তে জানলার কাছেই আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাৎ খেয়াল হল ঘরে বাবা, ভুলু, দাদা, ডাক্তারবাবু, পেছনে ছোড়দি, মেজদি। ডাক্তারবাবু আমায় নাড়ি দেখছেন, বাবার পরনে এখনও কোর্টের পোশাক। বাবা আমার পায়ের কাছে বসেছেন। পা দুটো নিজের কোলে তুলে নিয়েছেন। আমি শুনতে পাচ্ছি—বাবা তারস্বরে বলে চলেছেন, নারায়ণ নারায়ণ, দুর্গে দুর্গতিনাশিনী, এ কী বিপদ মা! বাবার ঠোঁট নড়ছে কি নড়ছে না। জানলার ধার থেকে এখন আমি ঘরের মাঝখান অবধি সরে এসেছি।
কী রকম দেখলেন অবিনাশদা?
আরে প্রেশার ভীষণ লো। একটা ফিটের মতো হয়েছে মনে হচ্ছে। ইঞ্জেকশন দিচ্ছি একটা।
খাটের পাশে দাঁড়িয়ে আছি আমি। একটু হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারব কান্নায় ভিজে মুখ মাকে। চোখ ছলছল করছে দিদির এতক্ষণ একলা একলা সমস্ত দায়িত্ব বহন করে। মেজদি উদ্বেগে বুকে আছে, ভুলু ভয়ের চোটে মুখে একটা আঙুল পুরে দাঁড়িয়ে রয়েছে খাটের মাথার দিকে। বাবা। অনেক দূরের মানুষ এখনও, যতির পা কোলে করে জপ করে চলেছেন? দাদা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, মুখ শুকনো। আমি প্রত্যেককে ছুঁয়ে ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করলুম, আমার নাম যতি কেন? যতি মানে বিরতি, ক্ষান্তি। বড়ো বিরক্ত হলে মানুষ তবে ক্ষান্তি চায়। বাবা মা আমি তোমাদের ভীষণ বিরক্ত করেছি, উত্ত্যক্ত করেছি, আমার হাত থেকে তোমরা মুক্তি চাও আমি জানি। এই তো তোমাদের কত আদরের বড়ো ছেলে রয়েছে গোপাল। শান্ত, সৌম্য মুখ চোখে সোনালি চশমা। তোমাদের সাধ পূর্ণ করতে কত জলপানি পায়, কত বড়ো বড়ো বই পড়ে, কত জানে। ওই তো তোমাদের বড্ড আদরের বড়ো মেয়ে শীলা, কী সুন্দর ফর্সা। ঠিক মায়ের চেহারা পেয়েছে বলে সবাই। বি. এ পাশ করে গেল গত বছর। যতি কোনোদিনও পারবে না। তোমাদের মেজ মেয়ে বুলু, বাড়ির আরেক ছেলের মতো, সব দিকে নজর আছে, সে-ও কত যত্নের। বিকেলবেলা মা যখন তিন মেয়ের চুল বেঁধে দেয়, তখন বোঝা যায় কত যত্নের, কত ভালোবাসার মেয়ে সব। চমৎকার গান করে, বড়ো বড়ো বই পড়ে, ভালো ভালো পাস করে। আর সব থেকে ছোটো ভুলু, ও তো আদরের দুলাল। সব সময়ে মায়ের পায়ে পায়ে, মায়ের কোলপোঁছা, কোলেরটি। এই চাঁদের হাটে যতি? ক্ষ্যামা দাও মা, বড়ো ঘেন্না, মুখে ব্রণ, বারো বছরেই গোঁফ উঠছে। কাঠি কাঠি পা, কোনো কিছু মাথায় যেতে চায় না, ভালো লাগে না কিছু, আমি আর স্কুলে যাব না। শরীরের যন্ত্রগুলোর মধ্যে দিয়ে শিরশিরে হাওয়ার মতো শব্দগুলো ফিসফিস করে বেরোল।
