যতি নয়? তাহলে তখন যতি বলে ডাকতেই বাসের মধ্যে সাড়া দিলে যে!
আমার নাম ব্ৰতী। আমি শুনেছি ব্রতী।
তাহলে আমাকে দেখে বাস থেকে নেমে পড়লে কেন? এই গলির মধ্যে ঢুকেছিলে কেন? লুকোবার জন্যে নয়?
আমি বললুম, আমি একটা ঠিকানা খুঁজছি। খুব দরকার। আমার বাবার খুব অসুখ, মা পাঠিয়েছে, এক জ্যাঠামশাইয়ের বাড়ি। তাই …।
মিথ্যে কথা বলা হচ্ছে? বাবার অসুখ? মা পাঠিয়েছে? কী নাম তোমার বাবার?
গা-ভরতি ঘৃণা নিয়ে আমি উচ্চারণ করলুম, অভয়পদ মজুমদার। এত চট করে বললুম যে ভদ্রমহিলা থতিয়ে গেলেন। বললেন, কী ঠিকানা খুঁজছ? তোমাকে একেবারে রমলাদির ছেলে যতির মতো দেখতে। না, যতি এতটা কালো নয়, এত রোগাও নয়।
যাক কী ঠিকানা যেন খুঁজছিলে?
আমি বললুম, পঁচিশের এক বকুলবাগান রো না রোড গুলিয়ে ফেলেছি, বাড়িটা দেখলেই আমি চিনতে পারব।
ভদ্রমহিলা বললেন, কিছু মনে কোরো না। আমায় এক আত্মীয়ার ছেলের সঙ্গে তোমার খুব মিল। যাও তোমার দেরি করিয়ে দিলুম। আমারও দেরি হয়ে গেল।
হাতঘড়ির দিকে একবার চেয়ে উনি আবার বাস স্টপে গিয়ে দাঁড়ালেন, আমি বকুলবাগানের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে থাকলুম।
সারা কলকাতা, দক্ষিণেশ্বর থেকে লেক কালীবাড়ি পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতুম। কিন্তু পথও আমায় টানত না। কোনো কিছুকেই আমার বিন্দুমাত্র আকর্ষণীয় বলে মনে হত না। এই সমস্ত বাড়ি ঘর ইট-কাঠের দৈত্য সব, গলি রাস্তা, মোড় অজানা এক জনহীন গ্রহের। জনহীন। এত মানুষ বাসে ঝুলতে ঝুলতে যাচ্ছে, ফুটপাতে ভিড় করে যাচ্ছে, দোকানবাজার গমগম করছে কিন্তু আমায় মনে হত কেউ নেই। কেউ কোথাও নেই। যেন সিনেমা দেখছি। টিকিটের পয়সা জমিয়ে জমিয়ে এক এক দিন কোনো হলে ঢুকে পড়তুম। সারাদিন ঘোরা, খাওয়াদাওয়া নেই, পর্দার হট্টগোল কান ফাটিয়ে দিত, তুমুল নাচ-গানের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমার কোমর, উরু সব ব্যথা করত, রক্ত অস্বস্তিকর রকমের গরম হয়ে উঠত, সস্তার সিট, চারপাশ থেকে অশ্রাব্য খিস্তি, সিটি বেজে উঠছে, পর্দার নাচিয়ে মেয়েটির পেটের দিকে আঙুল দেখিয়ে পাশের সিটের লোক বলত, কী খোকা পছন্দ হয়? জবাব না দিলে ছাড়ত না। ইস্কুল পালিয়ে তো দেখতে এসেছ, পছন্দটা বলতে দোষ কী, আমার সঙ্গে মেলে কিনা দেখতুম। বলে লোকটা খা খা করে হাসত। পান গুণ্ডি খাওয়া কালো মাড়ি কালো দাঁত দেখা যেত। আমার ভেতরটা গুলিয়ে উঠত। ইনটারভ্যালের সময়ে উঠে পড়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিতুম। হেঁটে হেঁটে সময় ভরানো। কোনো কোনো দিন সময়ের ঠিক রাখতে পারতুম না। হা-ক্লান্ত হয়ে আগে আগেই বাড়ি ফিরতুম। মা বলত—কী রে! আজ সকাল-সকাল ছুটি হয়ে গেল?
বললুম, হ্যাঁ, একজন টিচার মারা গেছেন।
কোন টিচার রে! আহা! ছেলে মেয়ে আছে!
গম্ভীরভাবে বলতুম, পুরোনো টিচার। আমি ঠিক চিনি না।
একদিন খুব দেরি হয়ে গেছে, পা টিপে টিপে বাড়ি ঢুকছি, নীচের দালানে মৃদু আলো জ্বলছে। সিঁড়ির ওপর থেকে একটা খুব জোরালো নারীকণ্ঠ ভেসে এলো। কেমন চেনা-চেনা।
না রমলাদি, তোমার যতিকে আজ আর দেখা হল না। বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে। আসলে কী জানো, পাঁচ নম্বর বাসে ক মাস আগে একটা যতির মতো ছেলেকে দেখলুম। পিঠে ব্যাগ। আমি যতি, যতি কোথায় যাচ্ছ বলে ডাকতে নেমে বকুলবাগানের মধ্যে ঢুকে গেল। তো আমিও নেমে ছেলেটাকে পাকড়েছি। কী ভুল দেখো। ছেলেটার নাম ব্রতী। বাবার হঠাৎ স্ট্রোক হয়েছে। জ্যাঠার বাড়িতে খবর দিতে এসেছে। বরানগরে থাকে, স্কুলের টাইমে এসেছে বকুলবাগান। তা ছেলেটাকে ছেড়ে দিলুম। কিন্তু তারপর মনে হল স্কুলের ব্যাগ কেন পিঠে? আর ধরতে পারলুম না। সেই থেকে মনটা খচখচ করছে।
ভদ্রমহিলা সিঁড়ি দিয়ে নামছেন। আমি তৎক্ষণাৎ দালানের অপর প্রান্তে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে উঠোন, উঠোনের ওদিকে কলতলা, তার মধ্যে।
মিনিট দশেক পরে আস্তে আস্তে বেরিয়ে ওপরে উঠছি, মা রান্নাঘরের থেকে বেরিয়ে বলল, কী রে যতি, আজ এত দেরি যে? উঃ আমি আর বানাতে পারি না, পারি না।
ড্রিল সার ডিটেন রেখেছিলেন, যা মুখে আসে তাই বললুম।
ডিটেন রেখেছিলেন? কেন? মার ভুরু কুঁচকে উঠল।
ড্রিল পারিনি, তাই।
ড্রিল কি মুখস্থ করা যায় যে না পারলে ডিটেন করবে? আস্পদ্দা তো কম নয়! মা বিরক্ত মুখে গজগজ করতে করতে ভেতরে ঢুকে গেল। দোতলায় উঠতে মেজদি বলল, হ্যাঁরে যতি, স্কুল থেকে ফিরেই কলঘরে ঢুকেছিলি কেন রে?
বাথরুম পেয়ে গিয়েছিল।
মেজদি বলল, দিদি দেখেছিস যতিটা কী ভীষণ কালো আর রোগা হয়ে গেছে?
দিদি বলল, তাই তো বুলু, ঠিক বলেছিস তো! হ্যাঁরে যতি, আজকাল তো আমার কাছে সংস্কৃত দেখাতে আসিস না! দাদার কাছে অঙ্ক-ইংরিজি দেখাতে তো দেখি না?
আমি উত্তর দিচ্ছি না দেখে দিদি এগিয়ে এসে আমাকে ঝাঁকানি দিল কী রে, কথা বলছিস না যে? এ কী? তোর হাতগুলো কী ময়লা রে? কী নোংরা তুই, ছি। ছি।
মা নীচে থেকে ডাকল, যতি, জলখাবার খেয়ে যা! লুচি ভাজার গন্ধ আসছিল। আমি সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই দিদি বলল, সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে খেতে বসবি যতি। খেতে বসে কিন্তু আমায় বমি পেতে লাগল। কোনোক্রমে একটা লুচি গলাধঃকরণ করে আমি উঠে পড়লুম। মা অবাক হয়ে বলল, তোর জন্যে টাটকা ভেজে তুললুম, না খেয়ে উঠছিস যে! আমারই ঝকমারি হয়েছিল দেখছি …
