এই অভয়পদবাবু একদিন সু-মেজাজে থাকায় এবং বাইরে তুমুল বৃষ্টি হওয়ায় ক্লাসে গল্পগুজব হচ্ছিল, হঠাৎ উনি বললেন, একটা থট-রিডিং-এর ম্যাজিক দেখবি? যতি দা ডার্ক, ওঠো বাবা! আমি উঠে দাঁড়াতে কিছুক্ষণ শ্যেন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ডান হাতের দুটো আঙুল মুখের সামনে ঘোরাতে লাগলেন, তারপরে বললেন, যতি দা ডার্কের তো দেখছি তিন তিনটে দিদি আছে! সত্যি? সত্যি? আশেপাশে সবাই আমায় জিজ্ঞেস করতে লাগল। আমি কথা বলতে পারছিলুম না, ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলে বসে পড়েছিলুম। আমি থাকি শিকদার বাগান লেনে। অভয়পদবাবু আসতেন বরানগর থেকে, আমাদের বাড়ির কারও সঙ্গেই কোনো সম্পর্ক ছিল না। থাকবার কথা নয়। তবু অভয়পদবাবু কী করে আমার তিন দিদির কথা জানলেন? ধূর্ত চোখে আমার দিকে চেয়ে ছিলেন অভয়পদবাবু। যেন আমার তিন দিদি থাকা ব্যাপারটা খুব দূষণীয়। প্রায় অশ্লীল। ব্রণ ওঠার মতোই অশ্লীল। তখন অভয়পদবাবু প্রত্যেকটি শব্দ চেটেপুটে খেতে খেতে বলছেন, এই যতেটা না জন্মালেও কোনো ক্ষেতি ছিল না। এই ধরনের ছেলেপুলেরাই বাপ-মায়ের চক্ষুশূল হয়ে থাকে। অভয়পদবাবু এই চূড়ান্ত ঘোষণাটি করবার পর টিফিনের ঘন্টা পড়ে গেল। মনে হল সহপাঠীরা ঘৃণা এবং ভয়ের দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইতে চাইতে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমায় শিরদাঁড়া দিয়ে হিমের স্রোত, গলা শুকিয়ে কাঠ, হাত পা কাঁপছে, কোনোক্রমে নিজের বইখাতা ব্যাগে ভরে সবার শেষে ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে অনুভব করলুম—আমার শুধু বাবা-মা কেন, একজন বন্ধুও নেই। এই বিশাল জগতে আমি একদম একা।
টিফিনের পয়সায় সেদিন কিছু খেলুম না। আইসক্রিম কেনবার ছল করে স্কুলগেটের বাইরে বেরিয়ে এলুম। তারপর এদিক ওদিক দেখে বড়ো রাস্তা পার হয়ে দেশবন্ধু পার্কের দিকে হাঁটা দিলুম।
দুপুরবেলাটায় দেশবন্ধু পার্ক ফাঁকা-ফাঁকা থাকে। আমায় একটা প্রিয় কলকে ফুলের গাছ ছিল, গাছটার তলায় বসে হাঁটুর ওপর মাথা রেখে প্রথমটায় খানিকটা গরম চোখের জল বেরিয়ে যেতে দিলুম। তারপর প্রতিজ্ঞা করলুম আর স্কুলে যাব না। বাড়ির থেকেও নিজেকে আস্তে আস্তে মুক্ত করে নেব। সত্যিই তো, আমি যে বাবা-মার চক্ষুশূল এ বিষয়ে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তিরই সন্দেহ থাকতে পারে না। বাবা অত্যন্ত রাশভারী, কড়া প্রকৃতির মানুষ। এতদিন ভাবতুম অনেক বড়ো, প্রায় বুড়ো বলেই বাবা আমায় সঙ্গে কথা বলেন না, এখন বুঝতে পারছি তা নয়, আসলে চক্ষুশূল, আমি চক্ষুশূল। চোখ বুজে মনে করবার চেষ্টা করলেই দেখতে পাচ্ছি ওই তো বাবা দাদাকে ডেকে কি বললেন, ওই তো দিদির সঙ্গে, মেজদির সঙ্গে, ওই তো এমন–কি ছোড়দির সঙ্গেও বাবা কথা বলছেন।
কই দিনের পর দিন যায়, বাবা সোজাসুজি, মুখোমুখি আমার সঙ্গে তো কথা বলেন না। বড়ো জোর—পড়াশোনা কেমন হচ্ছে? কিংবা কোথায় চললে? আর মা? মা আমাকে দিনের মধ্যে সাতবার দোকানে পাঠায়। এই হারুর দোকান থেকে একটু গরম মশলা নিয়ে আয় এই আবার দৌড়ে যা তো যতি, তোর বাবার দই আনাতে ভুলে গেছি। এক ঘন্টাও যাবে না, লান্ট্রি থেকে দাদার শার্ট প্যান্ট আনতে হবে। অমনি একপাতা সেফটিপিন, ভুলুর জন্যে একটা পেনসিল, ফরমাশের আর শেষ নেই। যে অনুপাতে মা আমাকে খাটায় সেই অনুপাতে আবদার রাখে কি? রাখে না। বিশ্বকর্মার সময়ে ঘুড়ির লাটাই-মাঞ্জার পয়সা মাপা মাপা। দোলের সময়ে পেতলের পিচকিরি আজও হল না। একটা ভালো ক্রিকেটব্যাট মা আজও দিচ্ছে, কালও দিচ্ছে। নেমন্তন্ন বাড়িতে যাবার সময়ে সর্বদা সঙ্গে যাবে ভুলু, মায়ের কোলপোঁছা। আমার অবশ্য নেমন্তন্ন যেতে একটুও ভালো লাগে না। কিন্তু ভোজের দিকটাও তো আছে! মাকে কোনোদিন বলতে শুনিনি, যতি আজ আমার সঙ্গে চল।
সেইদিন থেকে আমি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলুম। ঠিক সময়মতো খেয়ে দেয়ে, স্কুলব্যাগ পিঠে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই। তারপরে কোনোদিন দেশবন্ধু পার্ক, কোনোদিন গড়ের মাঠ। কোনোদিন গঙ্গার ধার চলে যাই। কিন্তু ভীষণ দীর্ঘ সময়। কাটতে চায় না। লোকেরা কীরকম সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চায়। আমার মনে হয় যে যেখানে আছে সবাই বুঝতে পারছে আমি স্কুল পালিয়েছি। সবচেয়ে মুশকিল হয় বইয়ের ব্যাগটা নিয়ে, ওইটা দেখলেই লোকে ধরে ফেলে আমি স্কুলের ছেলে। সেই জন্যে কোথাও বসার চেয়ে আমায় মনে হয় হাঁটাই ভালো। হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর চলে যাই। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়্যাল, রেস কোর্স, খিদিরপুর, চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানার ভেতরে ঢুকে সময়টা বেশ কেটে যায়। বাঘের গায়ে কটা ভোরা, সিংহী কটা হাই তুলল, ভালুক কতবার দাঁড়াল, কতবার পড়ে গেল, ভোঁদড় যখন মাছ ধরে ডাঙায় ওঠে, মাছটা কীভাবে মুখের মধ্যে ঝটপট করে এইসব দেখতুম কেমন অন্যমনস্ক হয়ে।
একাধিকবার মুশকিলেও পড়লুম। চিড়িয়াখানায় মন দিয়ে শিম্পাঞ্জির খিচুনি দেখছি, পিঠের ওপর একটা ভারী হাত পড়ল, যতি না? মুখ ফিরিয়ে অস্পষ্টভাবে চিনতে পারলুম ভদ্রলোককে। বাবার কেমন ভাই হন। বিজয়ার পর সপরিবারে আসেন বছরে একবার।—স্কুল থেকে এসেছ? নিজেই সমাধান করে দিলেন সমস্যার। আমি তাড়াতাড়ি বললুম হ্যাঁ। কোথায় আর সব ছেলেরা? টিচার? আমি বললুম ওইদিকে আছে। দেখো আবার, হারিয়ে যেয়ো না। বাবার ভাই এগিয়ে যান। আরেক দিন পাঁচ নম্বর বাসে চড়েছি, লেকের দিকে যাব। লেডিজ সিট থেকে এক ভদ্রমহিলা ডেকে বললেন, এই যতি, যতি, জায়গা খালি হচ্ছে এইখানে বোসো। আমি দূর থেকেই যথাসম্ভব হাত নেড়ে বোঝালুম আমি বেশ আছি। ভদ্রমহিলা আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। আমি ওঁকে চিনতে পারছি না, কিন্তু উনি আমাকে ঠিকই চিনেছেন। দূর থেকে বিশেষ কিছু বলতে পারছেন না, কিন্তু ওঁর খুব সন্দেহ হয়েছে। এখন দুপুর একটা, আমার পিঠে স্কুল ব্যাগ। এই ব্যাগটাই হয়েছে আমার কাল। যতটা পারি ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে বাবার চেষ্টা করি, তারপর স্টপ আসতেই নেমে পড়ি। সামনে যে গলি পাই, তারই মধ্যে ঢুকে পড়ি, ইশ ভুল হয়ে গেছে, ভদ্রমহিলা প্যাঁট প্যাঁট করে দেখছেন। রাস্তা পার হয়ে উলটো দিকের গলিতে ঢোকা উচিত ছিল। অনেকটা সময় গলিটার মধ্যে ঘোরাঘুরি করে যেই বেরিয়েছি, দেখি ভদ্রমহিলা রাস্তার ওদিক থেকে আসছেন হনহন করে। আমার চোখে চোখ পড়ে গেল। চোখ পাকিয়ে বললেন, একদম নড়বে না, পালাবে না। কাছে এসে একটা হাত পাকড়ে ধরে বললেন, তুমি রমলাদির ছেলে যতি না? আমাকে চিনতে পারছ না? সুপ্রভাত কাকা … রথীন … আমি বললুম, আপনাকে আমি চিনি না। আপনি কে আমি জানি না। আমার নাম যতি নয়।
