এই মেজাজেই কাঠের পাটিশন-করা মাঝারি অফিসঘরে ঢুকে সে শুনল মালিক জয়ন্ত শেঠ বলছেন, না, না, মিসেস সরকারকে আমি এ প্রস্তাবটা দিতে পারি না। একে মহিলা, তার ম্যারেড। হতেপারে একটা কাগজ চালাচ্ছি। তার মানে হৃদয়টাও কাগজের মতো হতে যাবে? সুবীর তুমি একটু ভাববা…।
কী প্রস্তাব?–শাওনি সতর্ক চড়া স্বরে বলল এগোতে এগোতে।
কুপ্রস্তাব নয়, ঘাবড়াবেন না—সুবীর বলল হেঁকে!
আজ পনেরো বছর স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের সঙ্গে কাজ করছে, শাওনির এসব ইয়ার্কি গা-সওয়া হয়ে গে সুবীর ছেলেটা খুব ভালো, মজাদার। কিন্তু জয়ন্তবাবুর সামনে? এদের মাত্রাজ্ঞান আর কবে হবে?
জয়ন্তবাবু হাসলেনও না, কথাটা শুনেছেন বলেও জানতে দিলেন না। কেজো গলায় বললেন, আসলে উড়িষ্যাতে ছোট্ট করে একটা ব্রাঞ্চ খুলছি। লোক্যাল লোকই নেওয়া হবে, কিন্তু অভিজ্ঞ কারও যাওয়া দরকার। আপনার মতো। অভিজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ, এক্সপার্ট যাকে বলে। এই সব চ্যাংড়াদের কাজ নয়।-সুবীর ইত্যাদির দিকে নজরটা ঝাঁটা বুলিয়ে নিলেন তিনি, কিন্তু আপনি ভাববেন না। আমরা ভাবছি। আরও ভাবছি।
যাব। আমি যাব।
বলছেন কী মিসেস সরকার? অফকোর্স ইটস আ প্রোমোশন! অ্যালাউয়েন্স বাবদও ভালোই দেওয়া হবে। বাসস্থানের ব্যাপারে মহিলা গেলে আমরা একস্ট্রা কেয়ারও নেব। কিন্তু…এটা…মানে চট করে ফেরত আসতে পারবেন না।
যাচ্ছি, আমিই যাচ্ছি। প্লিজ ডু দ্য নিডফুল।
নিজের ছোটো কিউবিকলে ঢুকে গেল শাওনি।
হোয়াট?—আপাদমস্তক নাড়া খেয়ে চমকে থমকে বলে উঠল স্বরূপ।
প্রোমোশন। পুরোনো লোক নইলে নতুন ব্রাঞ্চ কে সামলাবে?
তাই বলে…আর কেউ ছিল না?…তুমি রাজি হয়ে গেলে?
কী করব? চাকরি… তোমার কোনো অসুবিধে হবে না। এরা ওয়েল-ট্রেনড। ঘাড়ে ধরে তাড়িয়ে না দিলে কাজ ছাড়বে না।
স্বরূপ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। বলল না। একটু পরে বলল, কতদিন লাগবে ব্রাঞ্চটা চালু করতে?
শাওনি বুঝল ও ভেবেছে ব্যবস্থাটা সাময়িক। সে কিছু ভাঙল না। বলল, দেখা যাক।
চুপচাপ টিভি দেখা। এ. টি. এন। অবিশ্রান্ত উদরী নাচ, নিতম্ব নাচ, অবিশ্রান্ত তাল হ্যাঁচকা খিচুড়ি গান। স্বরূপ দেখছে। দেখুক। শাওনি প্যাকিং করবে। জামা কাপড়, প্রসাধনী, ওষুধ-বিষুধ, টিনের খাবার, বিস্কুট মশলা। যথাসম্ভব কেটেছেটে। সামান্য কিছু বই কাগজপত্র। একটা বাজল। ঘড়ি জানান দিচ্ছে। ভোর সাড়ে চারটের সময়ে উঠতে হবে। সন্তর্পণে একেবারে পা টিপে টিপে সবুজ আলোর ঘরে শয্যার ধার ঘেঁষে শুয়ে পড়ল শাওনি।
নি, নি তুমি কেন যাচ্ছ? কেন রাজি হলে? কেন? নি, তুমি হারিয়ে যাচ্ছ, তুমি যাবে না, যেয়ো না শাওনি, যেয়ো না…নাঃ স্বরূপ সরকার অঘোরে ঘুমিয়ে যাচ্ছে। বিয়ার-ঘুম কিংবা হুইস্কি-ঘুম। অনেকক্ষণ বিশুষ্ক চোখে জেগে জেগে কখন ঘুম এসে গেছে। পাঁচটা বাজার শব্দে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল শাওনি। পাশে স্বরূপ নেই। বাথরুমের দরজা খুলে যাচ্ছে। পরিষ্কার-দাড়ি কামানো, স্নাত স্বরূপ, পোশাক-পরিচ্ছদ পরা।
আমি চট করে একটু কফি খেয়ে ট্যাক্সি ডাকতে বেরোচ্ছি।
চান করার তেমন সময় আর নেই। চুল বাঁচিয়ে কাক-চান। সিনথেটিক কাপড়ের সালোয়ার কামিজ। চুলে বেণী বাঁধা। এই ভালো হল, যেমন বেণী তেমনি রইল, চুল ভিজল না। একটা, দুটো, তিনটে, চারটে হয়েছে লাগেজ। কপালে কালো টিপ আটকাতে আটকাতে আয়নার দিকে তাকাল শাওনি। আটত্রিশ বছর বয়স হয়ে গেছে। আঠারো বছরেও মনে হত আঠারো? এখন মনে হয়, একদিন আটাশ ছিলুম। মনে হয় যখন আঠারো ছিলুম! কিন্তু আয়নায় কিছু বোঝা যায় না। না-পাওয়ার ভার, না-দেওয়ার ভার, কিচ্ছু না। যুবতী এক, নরম কপালে তারার মতো টিপ পরছে। শুধু চোখ দুটোয় ভালো করে চোখ ফেললে বোঝা যাবে সেখানে বাদামি কনীনিকার পেছনে ক্লান্ত সংকল্প ধূসর পর্দা মেলে রয়েছে। চুলের রঙে একটা খয়েরি ছোপ, খড়ের মতো শুষ্কতা যা যত্নের অপেক্ষায় আছে।
এতগুলো?—স্বরূপ।
আমি দুটো নিচ্ছি—শাওনি।
তুমি গাড়িতে গিয়ে বোসো—স্বরূপ।
বাস্কেটটা নিচ্ছি-শাওনি।
জল কই?-স্বরূপ। মিনার্যাল ওয়াটার নিয়ে নেব-শাওনি। স্বরূপ চুপ। শাওনি চুপ।
ভোরবেলা। ভোর। ময়লার গাড়ি। ময়লা। বাতি টিম টিম। সেলোফেনে সূর্য মোড়া। শুকতারা এখনও। ফিকে। ফালি চাঁদ। শুকিয়ে যাচ্ছে। টুপি মাথায় বৃদ্ধ। ভোরের হাওয়া। কাঁপ-ধরা ঠান্ডা। ভিখারি। বেরোচ্ছে। পা নেই। ঠ্যালাগাড়ি। চাকা অলা। ঠেলছে। ঠান্ডা স্ট্র্যান্ড রোড থরথরে। থরথর…থরথর। হাওড়া ব্রিজে টিনোসেরাসের পিঠ। কাঁপছে। ফেলে দেবে? গঙ্গা। ময়লা। গমগম গমগম। স্টেশন। জটলায় জটলায় পুঁটলি-পাঁটলার যাত্রীদল। গ্রুপে গ্রুপে নরম, শক্ত ল্যাগেজ নিয়ে ফিটফাট প্যাসেঞ্জার। সরসর সরসর। খবর্দার! খবর্দার! যাত্রী ভেদ করে ঠ্যালাগাড়ি। অমুক আপ উইল ডিপার্ট ফ্রম তমুক প্ল্যাটফর্ম অ্যাট অমুক আওয়ার। টু জিরো টু ওয়ান আপ…টু জিরো টু ওয়ান আপ…কোচ সেভেনটিন…সেভেনটিন। সিট ফর্টিওয়ান…থার্টিএইট নয়? বিয়াল্লিশ নয়? ফর্টিওয়ান?
এই যে, জলটা ধরো।
বেল দিচ্ছে।
কাচের বাইরে স্বরূপ। ভেতরে শাওনি। দেখা যায় না। কাচের গায়ে স্বরূপ নিজেকেই দেখতে পায়। শুকনো চুল। এলোমেলো। উঁচু কলার। কাটা দাগ ভুরুর ওপর। কাচের ভেতরে শাওনি। বাইরে দৃষ্টি। বোঝা যায়, দেখা যায় না। কাচের গায়ে শাওনি নিজেকেই দেখতে পায়। গেরুয়া কাঁধ। রুদ্রাক্ষের গলা, কপালের মাঝখানে কড়া কালো, দু-কানে বাসি রক্তের ফোঁটা। ছটা উনপঞ্চাশ। শতাব্দী এক্সপ্রেস ছাড়ছে। রাইট টাইম। স্বরূপ, স্বরূপ তুমি কি আমাকে ডাকছ? ডাকো স্বরূপ.একবার ডাকার মতো ডাকো…শাওনি, শাওনি তুমি কি ফিরে আসছ? ফেরো শাওনি…একবার ফেরার মতো ফেরো…শতাব্দী এক্সপ্রেস ছেড়ে যায়।
শুনঃশেফ
আমার নাম যতি। জ্যোতি নয়। যতি। বর্গীয় জ আর অন্তঃস্থ য-এর মধ্যেকার এই তফাতটা আমার জীবনে খুব গুরত্বপূর্ণ। কেন যে এই তফাত তা নিয়ে খুব অল্প বয়সেই আমার মধ্যে একটা আবছা কৌতূহলের জন্ম হয়েছিল। আমার সঙ্গে আমাদের ক্লাসে আরেক জ্যোতি পড়ত। সে বর্গীয় জয়ের জ্যোতি। মাস্টারমশাইরা দুজনকে তফাত করবার জন্যে আমাকে ডাকতেন ওয়াইতি। অবিকৃত জ্যোতি নামের সম্মান আমার সহপাঠীই পেত। এবং তাই নিয়ে একটু বড়ো হতে না হতেই সে কলার তুলতে শুরু করে। আরেক দল মাস্টারমশাই ছিলেন, তাঁরা আবার বলতেন, জ্যোতি দা ব্রাইট আর যতি দা ডার্ক। স্কুলে পড়ার ওই বয়সে যখন ঠ্যাং সবে বেখাপ্পা রকমের লম্বা হতে শুরু করেছে, গাল খসখস করছে, কপালে গালে দু চারটে ব্রণ উঁকিঝুঁকি মারছে, সেই লজ্জাকর, মুখচোরা সময়ে যতি দা ডার্ক কিংবা ওয়াইতি ডাক আমাকে যে কী ভয়ানক আত্মগ্লানির কটাহে নিক্ষেপ করত তা একমাত্র আমিই জানি। মাস্টারমশাইরা একজনও আমায় পছন্দ করতেন না। প্রাণপণে পড়া মুখস্থ করলেও না। অঙ্ক সব মিলে গেলেও না। হাতের লেখা ভালো করেছিলুম অনেক অভ্যেস করে করে, কিন্তু তাতেও তাঁদের অপছন্দের নিরেট দেয়াল ভেদ করতে পারিনি। কিন্তু অভয়পদ স্যারের যেন আমার ওপর একটা বিজাতীয় ঘৃণা ছিল। কেমন একটা আক্রোশ কাজ করত ওঁর আমার প্রতি সব ব্যবহারের পেছনে। উনি পড়া জিজ্ঞেস করবেন বলে বিশেষ করে ওঁর ক্লাসের পড়া ভালো করে তৈরি করে যেতুম। ভেতরের সমস্ত কাঁপুনি সংযত করে সঠিক, সুন্দর উত্তর দিচ্ছি, উনি মাঝপথে থামিয়ে দিতে ছড়া কেটে উঠতেন, আতা গাছে তোতা পাখি, ডালিম ডাছে মৌ। ক্লাসে ইতস্তত হাসি শুরু হত। আমি লজ্জায়, ক্ষোভে বেগনি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতুম।
