স্বরূপ বদলে গেছে। খুব বদলে গেছে। আগেকার প্রতিজ্ঞা সংকল্প এসব আর তাকে মনে করিয়ে কোনো লাভ নেই। সেভাবে আর ওর মনে পড়বেও না। কতকগুলো কথা মনে পড়াই তো আর মনে-পড়া নয়। তার পেছনে বা তার সঙ্গে যে আবেগ থাকে, অনুভূতির যে জটিল ঐশ্বর্য থাকে সেগুলোও মনে পড়তে হবে। নইলে নিতান্ত নিছক কতকগুলো কথার স্মৃতিতে বিশেষ কিছু নেই।
সে? সেও কি বদলেছে? বদলেছে বইকি? পঁচিশ বছর আটত্রিশ হয়েছে। সে স্থির হয়েছে। হৃদয়ের কথা বলবার সেই ব্যাকুলতা তাকে ছেড়ে গেছে। প্রেম? আগে না পেলেও দিতে পারত। উপছে পড়ত অতিরিক্তটুক। উপছে-পড়ার আনন্দে মাতোয়ালা থাকত। কড়ায়-গন্ডায় ফেরত পেলে কি না গ্রাহ্যই করত না। এখন করে। না পেলে আর দিতে ইচ্ছে করে না। এমন নয় যে তার হাতের অঞ্জলিতে প্রেম ভরা আছে, সে মুঠি বন্ধ করে রাখছে। আসল কথাটা হল, উসকে না দিলে প্রেম আর জন্মাচ্ছে না। ঠান্ডা জল জমা রয়েছে বুকে। তাকে তোমার উত্তাপে তাপিত করো তবে সে টগবগ করে ফুটবে, আর তখনই জন্ম হবে সেই রঙিন বাষ্পর। অধরা-মাধুর্যময়, বায়বীয় তবু বুকের মানিক, নয়নের নিধি সেই ভালোবাসা।
ভালোবাসা কী? ভাবে আজকাল শাওনি। কী সে জিনিসটা? ভাবটা? সত্যিই ভাব তো? বিশুদ্ধ, বিমূর্ত? পাত্র-ব্যতিরেকে সে থাকে? এই যে সে ভেবেছিল স্বরূপকে না হলে তার চলবে না, এটা তো ভুল। স্বরূপ কিংবা অরূপ কিংবা বিশ্বরূপ যে-ই হোক না কেন, তার রুচির পরিধির মধ্যে থাকলে বাকি ঘটনাগুলো পর পরই ঘটত। এখন তো স্বরূপের বিশেষ কোনো তাৎপর্য নেই তার জীবনে। স্বরূপের জীবনে শাওনিরই বা তাৎপর্য কী? কিছু না! কিছু না। ভালোবাসা কি যৌবনেরই ধর্ম, আরও পরিষ্কার গদ্য করে বলতে গেলে শরীর রসায়ন? হরমোন সম্ভব? স্বরূপের হরমোনেরা কি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে, মাত্র এই বিয়াল্লিশ বছর বয়সে? শাওনির হরমোনেরা কি বিরূপ? বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যাবে না কি তারা? প্রেমের জন্যে? গেলেই ডাক্তার জিজ্ঞেস করবেন, নাল লাইফ লিড করছেন তো?
উত্তরে বলতে হবে, নামানে হ্যাঁ। অর্থাৎ আকাঙক্ষার কোনো অভাব নেই। স্বরূপের তো নয়ই। সে একটা রোবোই-মানুষের মতো কলকবজা নাড়ে। শাওনিরও নেই। কিন্তু আকাঙক্ষার হাতে নিজেকে সমর্পণ করতে তার স্বরূপের আগেকার রূপ, আগেকার চেহারা মনে করতে হয়।
স্বরূপ, স্বরূপ তুমি অমন করে চেয়ো না।
তুমি অমন করে এলে কেন? নি! নি! তুমি কী পরেছ? কি করেছ আজ?
কই বিশেষ কিছু তো পরিনি, কিছুই করিনি।
তাহলে? তাহলে আমার ভেতর-অন্দর থেকেই যদি অমন চাউনি উঠে আসে…
কী দেখছ তুমি? কী দেখতে পাচ্ছ?
নি, আমার বলবার শক্তি নেই। এক প্রবল অনুভূতির তোড়ে সব হারিয়ে গেছে, সব ঘুরছে।
কালবৈশাখীর মতো?
অনেকটা। অনেকটা…হোল্ড ইয়োর ট্যাং ওহ ফর গডস সেক…
কতদিন স্বরূপ তাকে নি বলে ডাকে না। ডাকলেও বোধহয় ন্যাকা-ন্যাকা শোনাবে এখন। টাং হোল্ড করতে অবশ্য এখনও বলে। বলে কর্কশ, রূঢ় গলায়। আমি চলে যাব—ভেতর থেকে একটা স্বতঃস্ফূর্ত কান্নার মতো উচ্ছাসে বেরিয়ে এলো কথাগুলো। আমি চলে যাব। কাকে বলল শাওনি? স্বরূপ তো সামনে নেই! সে এখন দিল্লি গেছে। কিন্তু এই ঘরে, বাড়িতে স্বরূপ আছে। আছে দেয়ালে, জানলায়, কড়িকাঠে, আছে আলমারিতে, ছবিতে, শয্যায়, চেয়ারে, টেবিলে, সোফায়, মোড়ায়। আলমারির পাল্লা খুলে সারি-সারি ঝুলন্ত পোশাকগুলোকে শাওনি বলল, চলে যাব। টেবিলের ড্রয়ার খুলে তাড়াতাড়া কাগজপত্র নাড়তে চাড়তে বলে উঠল, যাচ্ছি, চলে যাচ্ছি শিগগিরিই। চান করতে করতে শাওয়ার খুলে, ঊধ্বমুখে জলের তরল আঘাত নিতে নিতে। জোরালো গলায়, চারণ কবি মুকুন্দদাসের কিংবা নজরুলের দেশপ্রেমমূলক গানের প্রদীপ্ত সুরে বলে উঠল,
যাব, আমি চলে যাব। যাচ্ছি আমি যাচ্ছি চলে, সকল ফেলে সকল ভুলে, যাব যাব, সব হারাব, ফিরব না আর ফিরব না গো, যাবই যাব।
চান সেরে বেরিয়ে, শাড়ি পরতে পরতে, চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে, শূন্য ঘরে ঘুরতে ঘুরতে, অন্যমনস্কভাবে ভাত খেতে খেতে শাওনি দেখল, বা বুঝল এই বাড়ির সর্বত্র যেমন স্বরূপ আছে, তেমনই সে-ও আছে। কোণে কোণে। ছবিতে, শয্যায়, চেয়ারে, টেবিলে, সোফায়, মোড়ায়, জানলায়, দরজায়, পর্দায়, পাপোশে…সর্বত্র। শাওনিকে চলে যাব বলতে তার গলা আটকে গেল। ফিসফিসানির বেশি উঠল না গলাটা।
কিন্তু এমনই ভেতরে ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছিল সে চতুর্দিকে ছড়িয়ে থাকা শাওনির মুখোমুখি হবার জন্য, যে মিনিবাসে অফিস যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলে উঠল, যাব। একটু পরে আরও জোর গলায়। পাশের ভদ্রলোক চমকে ফিরে তাকালেন। একটু গুটিসুটি মেরে বসলেন। একটু সংযত সতর্ক হয়ে গেল সে। কিন্তু লজ্জা পেল না। মানুষ যখন তার জীবনের চূড়ান্ত মুহূর্তগুলোর মোকাবিলা করে তখন লজ্জা-সংকোচ এসব অতি তুচ্ছ মনে হয়। কী এসে যায় মিনিবাসের সহযাত্রী যদি তাকে ছিটগ্রস্ত ভাবেন? কিছু না।
কদিন ধরেই রাস্তা পার হচ্ছিল সে যান্ত্রিক অভ্যাসে। লাল আলো, হলুদ আলো, সবুজ আলো সমস্তই চেতনার ভেতরে জ্বলে, নেভে। ধাবমান, গর্জমান যান-মিছিল পার হয়ে, অফিসের দরজায় পৌঁছে চড়াৎ করে সে জ্ঞানে ফিরে আসে। সে কী? কখন সে রাস্তা পেরোল? বাস থেকে ঠিকঠাক স্টপে নামল কী করে? কখন কীভাবে সবটাই তার অজ্ঞাতে ঘটে গেছে। হঠাৎ শিউরে ওঠে সে। যদি কোনো গাড়ি ওস্তাদ খেলুড়ের মতো তাকে হেড মারত? শূন্যে লাফিয়ে উঠে ফুটপাথের শানে কিংবা অন্য খেলুড়ে গাড়ির সামনে পেছনে, নাকে মাথায় আছড়ে পড়ত! না, না অমন সমাপ্তি সে চায় না। না, সতর্ক হতে হবে। অমন হারিয়ে গেলে চলবে না।
