চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে বাচ্চার জন্যে প্রস্তুত হতে পারত সে। কিংবা বাচ্চা জন্মাবার পর অসুবিধে বুঝে চাকরিটা ছেড়ে দিতে পারত। কিন্তু স্বরূপ-শাওনি সরকারের বাচ্চা না হলেও ভারতবর্ষের চলে যাবে—খাবার একটা মুখ, চাকরির একটা উমেদার কম থাকবে এটা যেমন শাওনি ভুলতে পারে না, তেমনই ভোলে না সন্তান তাকে পূর্ণতা দেবেই এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। তার অধ্যাপিকা মা, সেলসম্যান বাবা তো দৌড়োদৌড়ি করে তাকে মানুষ করেছেন, কুড়ি-বাইশ বছর বয়সে পঞ্চান্ন বছরের পরিশ্রমজীর্ণ মাকে কি তার বুড়ো মনে হত না? মনে হত না মা গত যুগের মানুষ, ক্রমেই রক্ষণশীল হয়ে যাচ্ছে, স্বরূপকে মায়ের তেমন পছন্দ হয়নি বলে সে কি মায়ের ওপর মর্মান্তিক ক্রুব্ধ হয়ে ওঠেনি? বাবা গত হয়েছেন, মা একলা এক বান্ধবীর সঙ্গে থাকতেন শেষটায়! যেত, মাঝে মাঝেই যেত, কিন্তু তাদের দুজনের সংসারে কি মাকে ঠাঁই দিতে কখনও ডেকেছে। স্বামী-স্ত্রীর সংসারে তৃতীয় ব্যক্তি থাকা ভালো না, স্বরূপের এই নীতিতে কি সে সায় দেয়নি? আর স্বরূপের ব্যাপার তো আরও খারাপ! স্বরূপের বাবা-মা দুজনেই জীবিত। এই শহরেরই প্রান্তে থাকেন, ভাইঝির বাড়ির একতলায়। স্বরূপ সেই খুড়তুতো দিদি জামাইবাবুর ওপর মা-বাবার দায়িত্ব সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়েছে। টাকা-পয়সা পর্যন্ত দেয় না। বাবা-মার তো যা হোক কিছু সঞ্চয় আছে, পেনশন আছে, কী দরকার! যেন দরকারই সব। দরকারের ওপরে কিছু নেই। বিশেষ বিশেষ সময়ে মনে করে উপহার, স্বরূপের মনেও থাকে না। সে তো শাওনিই দেয়।
অবশ্য এসব কথা তার সম্প্রতি মনে হয়। বিবাহের বারো বছর পর। শ্বশুর শাশুড়ি এখন দূর গ্রহের মানুষ। নিজের মা মরে বেঁচেছেন। ছেলেমেয়েদের থেকে তাঁদের কিছু পাওয়া হয়নি এগুলো এখন, আজকাল মাঝে মাঝে জ্বলন্ত লোহার ছ্যাঁকার মতো বুকের মাঝখানে লাগে। জ্বলতে থাকে বুকটা। এসব ভুলের ক্ষমা নেই। শুধরে নেওয়ার উপায় নেই। সে শুধু বুঝতে পারে ছেলেমেয়ে তাকে পূর্ণ করবে এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। নতুন কোনো ব্যথা-বেদনার উৎস তৈরি করে কী লাভ! উপরন্তু স্বরূপের সাধ্য, ইচ্ছে, স্বরূপের সঙ্গে সম্পর্কের চিরত্ব এগুলোর ওপর তার বিশ্বাস খুব পোক্ত নয়, এটা সে বুঝতে পারে। আর স্বরূপ বোধহয় এখনও তার নিজের মানসিকতার স্থির। বাচ্চাকাচ্চা ও সব ভুলভাল ব্যাপার।
অফিসে বেরোবার সময়ে বলে বেরোও না কেন? কথাটা বলেই শাওনির মনে হল সে ভুল করল। জিজ্ঞাসার ফ্রেমে না রেখে অন্যভাবে বলা যেত কথাটা। বলে বেরোলে পারো—এটা বললেই ভালো হত। সোজাসুজি জিজ্ঞাসাটা যেন একটা দ্বৈত সমরে আহ্বান।
বলেই তো বেরোই।–স্বরূপ টি.ভি-র পর্দায় চোখ রেখে বলল। সিগারেটটা মুখের একপাশে চালান দিয়ে।
কখন আবার বলো?
চান করলুম, জামাকাপড় পরলুম, খেলুম, জুতো পরলুম-বলা আবার কেমন হবে? … যেমন প্রশ্ন তেমন উত্তর, যেমন কর্ম তেমন ফল-শাওনি ভাবল।
পত্রিকাটার পাতায় তার চোখ, কিন্তু সে কিছুই পড়ছে না।
চুমু-টুমুও খেতে হবে না কি-পার্টিং কিস?
আপাদমস্তক রাগে লাল হয়ে গেল শাওনি। এত তিক্ততা? এতটা সিনিক এই লোকটা? বারান্দার দাঁড়াল। ঘরের ভেতরে এল। শীত শীত লাগল। পাখা বন্ধ করে দিল। খুবই স্পষ্ট যে সে আঘাত পেয়েছে। কিন্তু স্বরূপ সরকার একবারও ডাকল না, একবারও এল না, বারান্দায় বা ঘরে। নিজের ভঙ্গি বদল করল না। ঠিক যেমনভাবে সিগারেট হাতে-মুখে টিভি দেখছিল ঠিক তেমনভাবেই দেখতে লাগল। জঘন্য-জঘন্য বিজ্ঞাপন, তাদের অসম্ভব রূপকথাসদৃশ সুখের প্রলোভন। আদিখ্যেতা এবং মাঝে মাঝে যতিচিহ্নের মতো সিরিয়্যাল, নতুন বোতলে পুরনো মদ। একই, সেই একই একঘেয়ে আখ্যান, একই চরিত্র, একই চরিত্রহীনতা।
খেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু কোনোরকম দেখানেপনা তার অসহ্য। তাই সে উঠল। চোখে-মুখে জল দিল। অভ্যস্ত যত্নে খাবার পরিবেশন করল। তারপর রোজকার মতো দুখানা রুটিকে আট টুকরো করল দুহাতে ছিঁড়ে। চারটে টুকরো দুধের বাটিতে ফেলল। আর চারটে টুকরো আলুকপির হেঁচকি দিয়ে মুড়ে মুখে পুরতে লাগল একের পর এক, যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু খাবারে তার কোনো স্বাদ লাগল না। ডাল নেবে কি না, মাছের কোন টুকরোটা তাকে দেওয়া হবে—এই সব টুকটাক প্রশ্নও সে রোজকার আলগা ভঙ্গিতে করল তার বরকে। কিন্তু তাতে ছিল না কোনো অন্তরঙ্গতা, না কোনো প্রাণ।
রাতে শুতে যাবার সময়ে সে ইচ্ছে করে অনেক দেরি করল। পড়ার ঘরে পত্রিকা স্তুপীকৃত হয়েছে। খাবারের কাগজগুলোর রবিবারের পাতা। একটার পর একটা খুলে সে পড়তে লাগল দাগিয়ে দাগিয়ে। এটা তার দরকার হয়। একটা ডায়েরির পাতায় সামান্য কিছু নোটও করল সে। ঘড়িতে একটা বাজতে তার খেয়াল হল। দুজনের একমাত্র শোবার ঘরে গিয়ে দেখল সবুজ আলোয় মাখামাখি হয়ে স্বরূপ ঘুমোচ্ছে। স্বল্প পরিসরের মধ্যেও এইভাবেই প্রথম বিচ্ছেদ সম্ভব করল শাওনি। শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল কোটি-কোটি দম্পতি হয়তো এভাবেই থাকে, এভাবেই সম্ভব করে এসব। অন্তত এতকাল করেছে ভারতের মতো দেশে। সম্প্রতি আর করতে চাইছে না। উপায় বেরিয়েছে কিছু। একবিংশতিতে হয়তো আর কেউই এসব সহ্য করতে চাইবে না। বিশেষত সন্তানের দায় না থাকলে।
