সুজিত-টুজিতের কথা বলে লাভ কী? খোদ শাওনির ঘরেই এই জাতীয় একজন মজুত আছে। প্রোমোশনের সঙ্গেই আসল গাঁটছড়াটা বেঁধেছে মনে হয়। বারো বছর আগে যখন ঘর বেঁধেছিল? মনে হয়েছিল…না, মনে হওয়ার কথা ভেবে কোনও লাভ নেই। মনে হওয়া জিনিসটা এত ব্যক্তিগত যে তার ওপর নির্ভর করে জীবনের কিছুই চলে না। কিন্তু…কত কোমল ছিল তখন স্বরূপের মুখ। কত ভাবুক ছিল তার চাউনি। কত আদর ছিল দু হাতে। সুবিচার ছিল ব্যবহারে। স্বরূপ তখন শাওনিকে তার প্রিয় বন্ধু ভাবত। এখন? এখন ভাবে না। শাওনির সম্পর্কে ভাববার তার সময় নেই। যদি বা ভাবে তাহলে শাওনি এখন তার স্ত্রী। ঘরনি গৃহিণী। খুব খারাপ লাগে খারাপ কথা বলতে, ভাবতে কিন্তু…কিন্তু শাওনি এখন স্বরূপের মেয়েমানুষও কি?
একটা সীমাহীন অন্ধকারে ভরে যেতে থাকে ভেতরটা। অন্ধকার, গ্লানি। শিক্ষা… বুদ্ধি… সতর্কতা… ভালোবাসা কিছুই শেষপর্যন্ত কাজে লাগে না জীবনে। তারা কি পরস্পরকে বোঝেনি? সে আর স্বরূপ? দুজন প্রাপ্তবয়স্ক, ডিগ্রিধারী, চাকুরিপ্রাপ্ত যুবক যুবতি? স্বরূপ বলেছিল, তোমাকে আমি সুখে রাখব, শাওনি।
তুমি আমাকে প্রেমে রেখো।
আর তুমি? তোমার বুঝি আমাকে প্রেম দিতে লাগবে না?—শাওনি হাসছিল। কত বিশ্বাস তখন জীবনে।
প্রেম প্রথম শাওনি, তারপর সুখ।
আমিও তোমাকে সুখে রাখব। দুধে-ভাতে। এই দেওয়া কথার অর্ধেকটা তারা রেখেছে। পরস্পরকে তারা সুখ দিয়েছে।
স্বরূপ প্রথম দিল টেলিভিশন সেট। দামি। রঙিন। তারপর দিল ফ্রিজ। প্রশস্ত, দু-কপাট, সুন্দর। তারপরে দিল ভি.সি.পি। তারপরে একটা চমত্তার সাততলার ফ্ল্যাট। তারপর তেজি স্কুটার। মিস্কি, মাইক্রোওয়েভ আভেন, ওয়াটার পিউরিফায়ার, ভ্যকুয়াম ক্লিনার, ওয়াশিং মেশিন… শাওনি? শাওনি দিয়েছে পুষ্টিকর, রুচিকর, নিত্য নতুন খাদ্য, ধবধবে জামাকাপড় হাতের কাছে, মুখের কাছে চা, কফি, মশলা, চকচকে জুতো, বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনের জন্য আপ্যায়ন, ইদানীং দিচ্ছে ড্রিংকস নরম এবং কড়া। দিচ্ছে না শুধু যান্ত্রিকভাবে নিজেকে। স্বরূপ বুঝতে চায় না প্রাণের টানে, প্রেমের টানে যে চাওয়া, সে চাওয়া চাইতে পারলেই শাওনি আছে। আছে নিবিড়, ভরাট অথই দিঘির জলের মতো, আছে উর্বরী মৃত্তিকার পেলব অভ্যন্তরের মতো, অনন্ত কুয়োর জলে পড়ে থাকা চাঁদের মতো।
সম্ভবত এসব আর চায় না স্বরূপ। তার বড্ড তাড়া। তা ছাড়া সে জানে দাম দিলাম কিনলাম এনে ফেললাম। ব্যাস। আবার কী? এক জিনিস যেমন বার বার কেনার পরিশ্রম সয় না, এক মানুষকেও তেমনি বার বার জয় করা লাভ করা এসব সেন্টিমেন্টাল ব্যাপার অনেক পেছনে ফেলে এসেছে সে। ঠিক আছে। তাহলে বদ্যিনাথ চানের জল দিক, মায়া খেতে দিক, আলমারির পাল্লা খুললেই পরপর শার্ট, ট্রাউজার্স টাই, যাকে ব্রাউন, যাকে কালো জুতো পালিশে নিশপিশ করছে। তা ছাড়া এ তো কোনো প্রতিশোধ নয়। এটা একটা সুবিধের বন্দোবস্ত। এর মধ্যে শাওনির কোনো রাগ নেই। এমন নয়, সে লোকজনের হাতে স্বরূপকে একেবারে ছেড়ে দিয়েছে। এ একটা আবশ্যিক ব্যবস্থা। সে-ও তো একটা চাকরি করে। প্রোমোশনে প্রোমোশনে ছয়লাপ না হলেও ভালোই চাকরি। সৃষ্টিসুন্দর, সন্তোষজনক। এ নিয়ে স্বরূপের সঙ্গে তার কোনো প্রতিযোগিতা নেই। স্বরূপ হয়তো বলতে পারে—তোমার বেরোবার সময় বরাবর একই ছিল। আমারও। তখন তুমি আমার সঙ্গে খেয়ে নিতে। মাঝে মাঝে যেমন বেণী তেমনি রবের অত্যাচার তোমার সইত। তুমি চুল ভিজোতে না। তা হলে? কিন্তু এ কথা বলার অধিকার কি স্বরূপের আছে আর? অধিকার তো আলাদা কথা, মানসিকতা? মানসিকতা আছে তার এ কথা বলার? যদি বলে তবে সেটা হবে না কি চূড়ান্ত হিপক্রিসি।
সে কি বলে না শনিবার ব্যান্ডেল লোকাল ধরে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে যাওয়ার সেই আনন্দ একটা অপ্রয়োজনীয় রোমান্টিক ভাববিলাস! শনিবার তাকে হিতেশের বাড়ি ছুটতে হবে। হিতেশের একটা পি. সি. আছে বলে। বহু কাজ, বহু কাজ এখন দুজনে মিলে করবে। ডিগ্রিতে যা নেই, কাজের আগ্রহে, দক্ষতায় তা পুষিয়ে দিতে হবে তাকে। হবেই। নইলে নেক্সট প্রোমোশন ফসকে যাবে।
এদিকে সুসময় যে ফসকে যাচ্ছে। জীবন যে ফসকে যাচ্ছে সে চেতনা ওর আর নেই। সন্তান ও চায় না। একদম গোড়ার দিকেই বলে দিয়েছিল বাচ্চাকাচ্চা ও সব ভুলভাল ব্যাপার। সেটাতেই এখনও সেঁটে আছে ও।
শাওনি অবশ্য বাচ্চা না থাকাটা বা থাকাটাকে তাদের সম্পর্কের মধ্যে একটা ইস্যু করে তুলতে চায়নি কখনও। পত্রিকাটা হোক ছোটো। তবু তার সহ সম্পাদিকার কাজটার মধ্যে তার মনে এমন একটা মুক্তি সে এখনও পায় যে নিজেকে সার্থক মনে করতে অসুবিধে হয় না। বাড়িতে দুজনেই চাকরি করলে বাচ্চা আনাটা বাচ্চার প্রতি অবিচার এই ধারণাটাও ছিল তার খুবই শক্তিশালী। নিজের ছোটোবেলার কথা স্মরণ করে। তবু তো তার মা কলেজের অধ্যাপিকা ছিলেন। দশটা পাঁচটা নয়! কিন্তু যতক্ষণ বাড়িতে একা, লোকের কাছে ততক্ষণ সে যে কী অসহায়বোধ। স্কুলে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যদি বা সেটা কাটত, বাড়ি ফিরে মা-হীন বাবা-হীন বাড়িতে ঢোকবার কথা মনে হলেই গা ছমছম করত। শাওনি চায়নি আর কোনো বাচ্চা তার মতো কষ্ট পাক। তারপর স্বরূপ? স্বরূপের এই চব্বিশ ঘন্টার চাকরি তাকে বাবা হবার অধিকারচ্যুত করেছে। একেবারে নিশ্চিতভাবে। পাঁচ বছরের শাওনির ধুন্ধুমার জ্বর, ডাক্তার সন্দেহ করেছেন এনকেফেলাইটিস। বাবা টুরে। সাতদিনের আগে আসবেন না। বেশিও হতে পারে। দুপুর রাত। একটা লোক নেই। টেলিফোন ডেড। মা পাশে জলের গ্লাস রেখে বাড়ি চাবি দিয়ে উদভ্রান্তের মতো ডাক্তারের বাড়ি ছুটে যাচ্ছে, সেই ঘটনার আর কি পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত তার জীবনে?
