হিংসে হওয়ার কোনো কারণ নেই। নিজেরাও রাখতে পারতে অনায়াসেই। ফ্যাশন করবার জন্যেই মাথা মুড়িয়েছ।
আজকাল সব দরকারের ফ্যাশন, সুবিধের—তা জানো তো শাওনিদি? চুল ছোটো হতে হতে আর আছেটা কী? সামনেটাই একটু ঝাঁপালো। পেছনটা তো টিকটিকির ল্যাজ। তা ছাড়া বিচ্ছিরি কোঁকড়া?
বিচ্ছিরি কোঁকড়া? কী যে বলো? কোঁকড়া চুল দেখতে তো পাগল হয়ে যেতাম আমরা। ন্যাচারাল কার্লস! তার তুলনা আছে?
ধ্যাৎ, একরকম, সব সময়ে মাথাটা একরকমের দেখাতে থাকবে। বোরিং টু দা পাওয়ার ইনফিনিটি। ভালো হল সোজা চুল, বা সামান্য ওয়েভি। তোমারটায় সেই সামান্য ওয়েভ আছে। চুলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই মুগ্ধ পুরুষের সময় কেটে যাবে। …..
এইবারে কঠিন হয়ে যায় শাওনির ঠোঁটের রেখা। চোখের পাতা। চোয়াল চিবুক। কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে যায়। কী লাভ! পুরুষ! পুরুষ! পুরুষ! সবাই যে যেখানে আছে ঠারেঠোরে বলে যাচ্ছে পুরুষের মনোযোগই মেয়েদের সব, পুরুষ একবার তাকালে মেয়েরা কৃত-কৃতার্থ হয়ে যাবে। বিজ্ঞাপন বলছে, সিনেমা বলছে, লোভনীয় মোহনীয় চিত্রভাষ্যে বলে যাচ্ছে। পুরুষেরও নারীর মনোযোগই কাম্য, টেক্সটাইল কোম্পানি, মদ বিক্রেতা এরা সে কথাও বলছে। হোক সে নারী ডাক-মেয়ে, পার্টি-প্রজাপতির ছদ্মবেশে পণ্যস্ত্রী। কিন্তু এই মনোযোগটা স-ব এমন কথা বলতে চাইলেও কেউ বিশ্বাস করবে না। কেউই গুরুত্ব দেবে না এমন ভাবনাকে। অথচ এই মেয়েগুলো! ত্রিশ-ছুঁই-ছুঁই কিংবা সবে-ত্রিশ-পার, যৌবন যাদের এখন কস্তুরী মৃগের মতো করে রেখে দেবার কথা! তারা কারণে অকারণে পুরুষের মনোযোগের কথা বলে। যদি না বলে তো ভাবে অন্ততপক্ষে। ডিসগাস্টিং।
কী হল শাওনিদি, রাগ করলে?
তোদের ওপর রাগ করে লাভ?
কেন, তুমি স্বরূপদার মনোযোগ চাও না?
স্বরূপদার মনোযোগ আর পুরুষের মনোযোগ এক হল?
আচ্ছা বেশ, তুমি পথ-চলতি পুরুষের প্রশংসার চাউনি চাও না? একটু অ্যাপ্রিসিয়েশন? একটু মুগ্ধতা? খুব খারাপ? সেটা? একটা সভা-সমিতি কি উৎসবে সাজগোজ করে গেছ, কেউ তোমার দিকে চাইল না, চোখ দিয়ে কেউ বলল না দাউ আর্ট বিউটিফুল, খুব খুশি হবে তুমি শাওনিদি? সত্যি কথা বলো তো?
তোরা মুড়ি-মুড়কির, রসবড়া-রসগোল্লার ডিফরেন্স করতে পারিস না, কী-ই বা বলব তোদের? তবু চেষ্টা করছি বোঝাতে, শুধু পুরুষ কেন, মেয়েরাও কি অ্যাপ্রিশিয়েট করতে জানে না? তারা করলেও আমার তৃপ্তি। আর যে পুরুষ আমাকে ছেড়ে আমার চেহারার দিকে চেয়ে থাকবে, তাকে তোরা মুগ্ধই বলিস আর হ্যাংলাই বলিস সে আমার চোখে ছোটো হয়ে যাবে। বাড়ি ফিরে আমি আয়নায় নিজের ছায়ার দিকে চেয়ে দুদণ্ড ভাবব কী ছিল সেই সাজগোজে যা আমার নিজেকে আড়াল করে দিল?
ওঃ শাওনিদি প্লিজ, ফিলজফিক্যাল কথাবার্তা বলো না। তোমার রসবড়া রসগোল্লার তফাত কজন ধরতে পারে গুনে দেখো তো।
আর বেশি কথা বলে না শাওনি। কী দরকার বাবা? এরপর ওরা নিজেদের মধ্যে শাওনিকে নিয়ে হাসাহাসি ফাজলামি করবে হয়তো। কাউকে প্রভাবিত করবার নেত্রীসুলভ বা গুরুসুলভ ইচ্ছা বা ব্যক্তিত্ব কোনোটাই নেই তার। নিজের ধারণামতো নিজে চলতে পারলেই সে যথেষ্ট মনে করে। নিজে…আর…আর… সে যাকে জীবনসঙ্গী বলে পছন্দ করেছে, যে তাকে জীবনসঙ্গী বলে পছন্দ করেছে। পারস্পরিকতায় সে স্বীকৃত, সেই সে যদি তার ধারণাগুলোকে মান দেয় তাতেই সে খুশি থাকবে বর্তে যাবে। আর কী চাওয়ার আছে জীবনে? একখানা ফ্রস্টফ্রি রেফ্রিজারেটর, একটা চার চাকার যান, একটা কাপড়কাচা কল, একটি বিদেশি প্রযুক্তির টেলিভিশন সেট এগুলো তো ঠিক চাওয়ার জিনিস নয় জীবনে। এগুলো জীবনযাত্রার উপকরণ। যে মনে করে লাগবে, না হলেই চলবে না, তার কাছে উপকরণ হিসেবে এগুলোর দাম বেশি। যার মনে হয় না হলে চলে যায়, তার কাছে এগুলো অবান্তর। শেফালি সমাদ্দার বলে এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে তার একবার মধ্যপ্রদেশ বেড়াতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল। তিনি জ্যোৎস্নারাতে নর্মদাবক্ষ থেকে মাৰ্বলরকের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে বলে উঠেছিলেন, খুব সুন্দর, না মিসেস সরকার? কিন্তু জীবনের উচ্চাশার কতটা এর জন্যে স্যাক্রিফাইস করেছি, তা জানেন?
কতটা?—চোখ মাৰ্বলরকে গচ্ছিত রেখে শাওনি আলগা গলায় জিজ্ঞেস করেছিল।
বোনচায়নার একটা ডিনার সেট, কমপ্লিট উইথ কাটলারি। অবশ্যই রুপোর। সেটটা বিদেশি। উফফ ভাবলে ভেতরটা যেন কেমন হয়ে যায়। হল না। মেয়ে, আমার ওই হাইস্কুলে-পড়া মেয়ে জববলপুর আসবেই। আসতে হবেই। আরে, ধৈর্য ধরে স্টার টিভিটা দ্যাখনা, কত প্রোগ্রাম করছে আজকাল দেশ-বিদেশের ওপর। না, যাবই। লাইভ দেখব। তা দ্যাখ, জোছনাও প্রতি শুক্লপক্ষে ঝরছে, আর মাৰ্বলরকেরও পাখা নেই। যে কোনো সময়ে দেখা যাবে। চার বছর পরে বিয়ে লাগিয়ে দেব, হনিমুনে যাস না হয়। কিন্তু অমন ড্রেসডেন চায়না? আর কি পাব?
শাওনির মনে হল ভদ্রমহিলা যে ফোঁস করে নিশ্বাসটা ফেললেন সেটা গাড়ির একজস্ট দিয়ে বেরনো কালো কার্বন মনোক্সাইডের মতো। নর্মদার জোছনাকে কালো করে দিচ্ছে। সুজিত বলে এক বন্ধু আছে শাওনির। খুব ভগবানে বিশ্বাস করে। সে প্রতিদিন ঘুমোতে যাবার সময়ে প্রার্থনা করে, হে ভগবান, আমার যেন একটা ফোর হুইলার হয়।
