দুপুরে ঘুমোলে আজকাল আর ব্রজবাবু রাতে ঘুমোতে পারেন না। তাই দুপুরটা প্রাণপণে বই নিয়ে, পত্র-পত্রিকা নিয়ে জেগে থাকেন। যদিও ভাত খাবার পর একটা টুল আসে। যাই হোক, দুপুরে জেগে থাকার জন্যেই বলা যায়, রাতের ঘুমটা নিচ্ছিদ্র হয়। ঠিক দশটা থেকে পাঁচটা। সেদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। ব্রজবাবু বাথরুম গেলেন, জল খেলেন, তারপর চটিটি পাপোশের ওপর খুলে চিত হয়ে শুলেন। পুবে মাথা পশ্চিমে পা। চোখ তুলতেই ব্রজবাবু ভিরমি গেলেন। পশ্চিমের দেয়ালে এক ভয়ঙ্কর পুরুষ, ইয়া গোঁফ, ইয়া বুকের পাটা, ঝাঁকড়া চুল, তার শেষ কোথায় দেখা যায় না। তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে ভীষণ রুষ্ট চোখে। ভয়ে ব্রজবাবু চোখ বুজলেন। কিন্তু বুজলে কী হবে? সেই মুখ সারাক্ষণ ভাসছে চোখের মধ্যে। ব্রজবাবু উঠছেন, জল খাচ্ছেন, শুচ্ছেন, বসছেন, স্বস্তি পাচ্ছেন না। বারান্দায় দিকের দরজা খুলতে সাহস হচ্ছে না। যদি ওইরকম রাক্ষসের মতো কোনো চোর বা ডাকাত …। হঠাৎ মনে পড়ল, বারান্দা তো রটআয়রনের জালি ঢাকা। ব্রজবাবু তড়াক করে উঠে বারান্দায় চলে গেলেন, ঘরের দরজাটিতে শেকল দিলেন। আরাম চেয়ারটা পাতলেন। বাকি রাত সেখানেই আধশোয়া হয়ে কাটিয়ে দিলেন।
সকালবেলা তাঁকে বারান্দায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন দেখে, বড়ো বউ বলল, কাল যা গরম গেছে, দিল্লি লখনউকে হার মানায়।
কিন্তু দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনও ব্রজবাবু বারান্দায় রাত কাটালেন। দুপুরবেলা ঘরের দরজা খোলা রাখেন, বই পড়েন, কোনোদিকে তাকান না কিন্তু রাত্তিরে শুনসান, প্রচণ্ড ভয়ে ব্রজবাবুর মতো লোকও দিশেহারা হয়ে যান। চতুর্থ দিন মাঝরাত্তিরে বৃষ্টি এল। পুবে ছাট। জালের মধ্যে দিয়ে ছাট এসে ব্রজবাবুর জামাকাপড় ভিজিয়ে দিতে লাগল। বুড়ো বয়সে কি ব্রজবাবু শেষে নিউমোনিয়ায় পড়বেন? বুক ভরে একটা দম নিয়ে ব্রজবাবু বীরপুরুষের মতো ঘরে ঢুকলেন, গামছা দিয়ে গায়ের জল মুছলেন, ফতুয়া বদলালেন, তারপর শুয়ে পড়লেন, প্রথমে তাকালেন না, মনে মনে বললেন, হ্যাঁ। একটা ছায়া তার চেয়েও কম, একটা ছোপ-ক-দিন পরই পালটে যাচ্ছে, তাকে আবার ভয়! তুমিও যেমন।
পুরো চোখ খুলে সিলিং-এর দিকে তাকালেন ব্রজবাবু। কিছু নেই। সিলিং দিয়ে লম্বা রেখার জল পড়েছে। ভয়ানক মুখ মুছে গেছে। কিছু সাদা, কিছু নীল, অর্থহীন দেয়াল। ব্রজবাবু খুব নিরাশ হলেন। কিছু না থাকার চেয়ে কি ভয় থাকাও ভালো? সেই রাত্তিরে ব্রজবাবু ঘুমোতে পারছেন না কারণ সব শূন্য। তাঁর দেয়ালে কোনো লিখন নেই। অবশেষে তাঁর ঘরের ভেতর থেকেই কে যেন তাঁকে প্রশ্ন করল, বেশ তো ব্রজ, কী তুমি দেখতে চাও? বলো? ওই দানব, ওই সিনেমার মেয়ে, না ওই বোকা? না কি আর কিছু, বল বল, বলে ফ্যালো।
ব্রজবাবু বললেন, না না। ওসব তো দেখা হয়ে গেছে। নতুন কিছু দেখাও। নতুন কোনো মুখ। আমার নিজের মুখ, সেটা আমি এখনও দেখিনি। আয়নায় একরকম দেখি। গিন্নির চোখে একরকম দেখতুম। ছেলে-বউ, নাতিনাতনিদের চোখে আবার আরেক রকম দেখি। বাইরের লোকের ডাকে আমি সাড়া দিতে পারি না। তারা কাকে ডাকে আমি আদৌ বুঝতে পারি না। দেয়ালের ওপর যদি একবার আমার সঠিক মুখটি ফুটে উঠত।
ঘরের মধ্যে থেকে স্বর বলে উঠল, এতদিন তো তাই-ই তোমার দেখাচ্ছিলুম।
ব্রজবাবু চমকে উঠলেন, কে? কে ওখানে? কে একথা বললে? সাড়া দাও।
কেউ সাড়া দিল না। ব্রজবাবু খাটের তলা, আলমারির পেছন, টেবিলের তলা সব ভালো করে খুঁজে এলেন। কোথাও আবার কেউ না লুকিয়ে থাকে। নাঃ। নেই কেউ। তখন তিনি আবার চটি খুলে, পা মুছে, ফতুয়াটি দ্বিতীয় বার বদলে, কেন খোঁজাখুঁজিতে ফতুয়া ঘামে ভিজে গেছে, পালঙ্কে এসে শুলেন। পুবে মাথা। পশ্চিমে পা। বললেন, তা হলে তোমাকেই দেখাও। তুমি কে! তোমাকেই দেখি। ব্রজবাবু কী দেখেছিলেন জানি না। কিন্তু পরদিন মুখের মৃদু মধুর হাসিটি দেখে সবাই বলল, বেশ গেছেন। সুখস্বপ্ন দেখতে দেখতেই গেছেন। পুণ্যবান লোক তো সবসময়ে জীবন দিয়ে চেনা যায় না, মৃত্যু দিয়েও কখনও কখনও চিনতে হয়।
শতাব্দী এক্সপ্রেস
হ্যাঁরে বদ্যিনাথ, দাদা কি চলে গেছেন?
হ্যাঁ বউদি, এই তো মিনিট দশ হল।
মায়া রান্না করে খেতে দিয়েছে, বদ্যিনাথ চানের জল দিয়েছে। সে চলে গেছে। ফুরিয়ে গেল ল্যাঠা। তাকে এত কামড়ায় কেন? সে তো এমনটাই চেয়েছিল। ভালো তত্ত্বাবধায়ক সে, সবাই বলে, সে নিজেও জানে। গুছোনো পরিচ্ছন্ন সংসার। এদিকের জিনিস ওদিক হতে পায় না। আলমারির পাল্লা খুললেই হ্যাঙারে পরপর শার্ট প্যান্ট ঝুলছে, বার করে নিক যেটা ইচ্ছে। বাথরুমের আয়না খুললেই দাড়ি কাটার সরঞ্জাম পরপর। যাকে পাটভাঙা তোয়ালে। জুতোর যাকে চকচকে জুতো। খেতে বসার দু মিনিট আগে টেবিলে তিন পদ রান্না সাজানো, যা চাও তাই। ঘি খাবে না মাখন খাবে? বেশ তাই। রোজ নয়? মাঝে মাঝে? ঠিক আছে, সপ্তাহে একদিন কি দুদিন। নিমপাতা ভাজা আলু দিয়ে মেখে একদিন, বেগুন দিয়ে একদিন? একদিন নিমঝোল? ঠিক আছে। মাছ গরম গরম ভাজাটাই সকালে ভালো লাগে? সব দিন ভাত নয়? অর্ধেক দিন রুটি! তবু যদি মন না ওঠে? ঠিক এই সময়টাই যে আমার চানের সময় স্বরূপ, নইলে চুল শুকোবে না। চুল না ভিজোলে বড়ো মাথা ধরে। ভিজে চুল নিয়ে বেরোবার প্রশ্ন নেই। তবে কি চুলটাই কেটে ফেলব! ডান হাতে যেন নাচের মুদ্রা করে পেছনের চুলের গোছা সামনে আনল শাওনি। খানিকটা কেটে ফেলেছে। কিন্তু যা আছে তার সৌন্দর্য সম্পর্কে বেশ সচেতন সে। যতখানি সম্ভব যত্ন নেয়। এই চুল কেটে ন্যাড়া বোঁচা? আজকাল অর্ধেক মেয়েই এরকমই। সেই জন্যেই আরও জেদ তার। চলতি ফ্যাশনের পেছনে সে ছোটে না। তার হল স্টাইল—এমনই একটা ধারণা তার আছে। খুব অমূলক কি? ছোটো চুলেরাই তো উচ্ছসিত হয়, ইস শাওনিদি, কী সুন্দর তোমার চুল! দেখলে হিংসে হয়।
