সকালবেলাই তাঁকে এমন ভবিযুক্ত দেখে বড় বউ মুখ তুলল, বাবা কি কোথাও বেরিয়ে ছিলেন?
হ্যাঁ এই মানে একটু দরকার ছিল। ব্রজবাবুর স্বভাবটাই এমনি। যা সত্য কথা, সেটাকে কিছুতেই বলতে পারেন না। পারেন না মানে, এদের কাছে পারেন না। একটু ঘুরিয়ে বলেন।
বেড়াতে বেরিয়েছিলুম, প্রাতভ্রমণে গিয়েছিলুম এ ধরনের কথা বলতে যেন ভীষণ লজ্জা।
তবে দু-চার দিনের মধ্যেই বাড়ির সবাই ধরে ফেলল। মুখ টিপে হেসে মেজো বউ বলল, বাবা এরকম গুজগুঁজে স্বভাবের কেন বলো তো দিদি?
বড়ো বউ বলল, মা ছাড়া আর কাউকে বাবা ঠিক কথাটা বলতে অভ্যস্ত নন। লক্ষ করে দেখো। স্বভাব।
পান মুখে ব্রজবাবু বিছানায় কাত হয়েছেন। পুবে মাথা পশ্চিমে পা। হাতে বই। আগের বই দুটি আদ্যোপান্ত শেষ হয়ে গেছে। ফেরত দিয়ে ব্রজবাবু আরও দুটি ছেলেদের বই এনেছেন। এনেছেন ভুটুকে লুকিয়ে। ড্রয়ারে চাবি দিয়ে রাখেন। নইলে ও ছেলের হাত থেকে আর বই উদ্ধার করতে পারবেন না। হঠাৎ মনে পড়ে গেল। ব্রজবাবু হাসি হাসি মুখে পশ্চিমে দেয়ালে সিলিং ঘেঁষে তাকালেন, —কী হে টাকলু, রামপাখি! ওমা, টাকলুটা তো নেই। তার গাধা-বোকা চোখ নিয়ে টাকলুটা অদৃশ্য হয়ে গেছে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে, চশমা মুছে, এদিক-ওদিক চারদিক থেকে ঘাই মেরে মেরেও ব্রজবাবু লোকটার হদিস করতে পারলেন না। তারপর হঠাৎ শক খেয়ে ব্রজবাবু বিছানায় চিত হয়ে পড়লেন। সিলিং-এর কোণ থেকে এক সাংঘাতিক মেয়ে তাঁর দিকে চেয়ে রয়েছে। টিকোলো নাক, ইয়া লম্বা লম্বা চোখ, চোখের পাতা। লম্বা নিটোল ঘাড়। ঠোঁট ঈষৎ ফাঁক, চোখে কটাক্ষ, ঠোঁটে কৌতুকের হাসি। ঘাড় পর্যন্ত স্পষ্ট বোঝা যায়, তারপর আস্তে আস্তে সব কেমন আবছা হয়ে গেছে। ব্রজবাবু কোনোদিন গিন্নি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাননি। এখন গিন্নি নেই। জানতে পারলে তিনি কী মনে করবেন? কিন্তু ব্রজবাবুর উপায় নেই। চোখ খুললেই সামনে ঘাড় বেঁকিয়ে হাসছে। মেয়েছেলেটি। আ গেল যা কী বেহায়া রে বাবা। ব্রজবাবু বেশ শব্দ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন, পাশ বালিশটি জড়িয়ে। এক মিনিট, দু-মিনিট, পাঁচ মিনিট। তিনি আবার চিত হলেন। বইটি তুলে পড়তে আরম্ভ করলেন। তারপর যেই পাতা উলটে ওপর দিকে তাকিয়েছেন অমনি দেখলেন মেয়েটা নাচছে। গলার তলায় যেখানটা আবছা আবছা মতো ছিল সেখানটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। মুখটা চেনা চেনা। অনেক ভেবে তিনি মনে করতে পারলেন গিন্নি যে কী সব সিনেমা পত্রিকা নিতেন তারই কোনোটাতে মেয়েটিকে দেখে থাকবেন তিনি। গিন্নি ঘরে না থাকলে ড্রয়ার থেকে বার করে উলটেপালটে দেখতেন, পায়ের শব্দ শুনলেই ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখতেন আবার। খুব কৌতূহল হল। চোখের ওপর হাত চাপা দিয়ে আঙুলের ফাঁক দিয়ে মেয়েটাকে দেখতে থাকলেন তিনি। ঝিরি ঝিরি বাকলের মতো গাছের পাতা দিয়ে করা একটা খাটো ঘাগরা পরেছে। নিটোল পা দুটি নাচের ভঙ্গিতে বেরিয়ে আছে। হাতে কি একটা মুদ্ৰামতো। ঠিক নাচ নয়, অঙ্গভঙ্গি, এমন অঙ্গভঙ্গি, নাঃ। ব্রজবাবুর রক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে। তিনি চোখ থেকে হাত সরিয়ে নিলেন, ভালো করে দেখতে দেখতে কেমন একটা অসহ্য পুলকে অবশ হয়ে আসতে লাগলেন। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছেন জানেন না।
কিছুদিন এমন হল ব্রজবাবুর আর ঘর থেকে বেরুতে ইচ্ছে করে না। দালানে ভাত খেতে যান, বারান্দায় একটু রাস্তা দেখেন বসে বসে, কিন্তু ওই পর্যন্ত। কতক্ষণে ঘরে ঢুকবেন, কতক্ষণে দরজা বন্ধ করবেন, যেন তিনি হা-পিত্যেশ করে বসে থাকেন। এত আগ্রহ, এত পুলকও যে তাঁর সাতষট্টি বছরের শরীরে মনে ছিল তা তিনি জানতেন না। বউরা বলাবলি করতে লাগল, বাবাকে ডাক্তার দেখানো দরকার। ছেলেরা বলল, কোনো নির্দিষ্ট কমপ্লেন নেই, ডাক্তারে কি করবে? বউরা বলল, নাই থাক। থাকলেও তো বলবেন না। আমরা বাবা পরের বাড়ির মেয়ে, লোকে পাঁচ কথা বলবে কিছু হয়ে গেলে। অগত্যা ডাক্তার এলেন। একগলি পরে বসেন। ছোটো ছেলে ডেকে আনল।
ব্রজবাবু বিকেলে বারান্দায় বসে আছেন। ডাক্তার এল।–কী খবর দাদু?
এই ডাক্তার তাঁর ছেলের বয়সি ঠিকই। মেলোমশাই বললে আপত্তি ছিল না। কিন্তু আজকাল কেউই তাঁকে দাদু ছাড়া ডাকছে না। ডাক্তারের কোলকুঁজো চেহারার দিকে তাকিয়ে ব্রজবাবুর হাসি এল। এরপর তাঁর নিজের ছেলেরাই না তাঁকে দাদু ডাকে।
ব্রজবাবু বললেন, তুমি এদিকে কি মনে করে? এদের কারও শরীর-টরীর খারাপ না কি?
ডাক্তার বলল, খারাপ? না, না। আপনাকেই একটু চেক আপ করতে এলুম।
চেক আপ? আমাকে? কেন? আমার হয়েছেটা কী?
চেক আপের আবার হওয়া-হওয়ি কী?
ভালো করে দেখে শুনে ডাক্তার বলল, বাঃ। ভালো আছেন তো! খুব চনমনে। খিদে হয়?
দিব্যি।
ঘুম?
চমৎকার।
কোনো অসোয়স্তি?
উঁহু।
ঠিক আছে। প্রেশারটা একেবারে মার্জিনে আছে। ও কিছু না। পাতে নুনটা খাবেন না।
যাবার সময় কোলকুঁজো ডাক্তার ছেলেদের ডেকে হেসে বলে গেল, আপনাদের বাবা আপনাদের চেয়ে অনেক ভালো আছেন।
ক-দিন ধরে ব্রজবাবু সিলিং-এ আর সিনেমার মেয়েটিকে দেখতে পাচ্ছেন না। মনটা খারাপ হয়ে রইল দু-তিন দিন। তারপর হঠাৎ নিজেই নিজে বললেন, ধুত্তেরি, এই বয়সে আর অত ধকল সয় না। গেছে তো বেঁচেছি।
ব্রজবাবু আবার ভোরবেলা উঠে, সদরে তালা দিয়ে প্রাতভ্রমণে বেরোতে লাগলেন। ছেলেরা নিশ্বাস ফেলল। বউরা বলল, যাক।
