ততক্ষণে ব্রজবাবু হনহন করে হাঁটা দিয়েছেন। এর দু-এক দিনের মধ্যেই ব্রজবাবু লাইব্রেরিতে ভরতি হলেন, মানে সদস্য হলেন, কড়কড়ে কুড়ি টাকার নোটখানি দিয়ে। লাইব্রেরিয়ান মানুবাবু প্রিয় বান্ধবী বলে একখানা বই দিলেন, মুখ গম্ভীর করে ব্রজবাবু বললেন অন্য একখানা দেখি, মানুবাবু এবার দিলেন। তন্ত্রাভিলাষীর সাধু সঙ্গ, ব্রজবাবু এবার বললেন, ছেলেদের বই নেই?
মানুবাবু বললেন, না দাদু, ছেলেদের বই মেয়েদের বই আমরা আলাদা করি না। ওসব একসঙ্গেই থাকে।
ব্রজবাবু বললেন, ছেলেমানুষদের বই নেই? বাচ্চাকাচ্চার?
মানুবাবু বললেন, তাই বলুন। ভুটুর জন্যে নেবেন, আচ্ছা এই দুখানা নিয়ে যান। আগেকারের পুজোবার্ষিকী সব, সমান ওজনের সোনার দাম দাদু।
মানুবাবুর পুরো গোঁফ পেকে গেছে। তা সত্ত্বেও তিনি ব্রজবাবুকে দাদু বললেন। যাঁর নাকি গোঁফ কাঁচা, মাথার পাকা চুল হাতে গোনা যায়, দাঁত, পানের ছোপ ধরা হলেও পুরো পাটি আস্ত। ভালো। বলো বাবা বলো। বিপত্নীক হয়ে পড়েছেন তার ওপরে রিটায়ার, এরা তাঁকে জোরজার করেই রওনা করিয়ে দেবে মনে হচ্ছে।
ক্ষুণ্ণ মনে ব্রজবাবু বই দুখানা প্যাকেটে ভরে বাড়ি ফিরলেন। রাতের রুটি তরকারি খেয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। ব্যাস। নিজের ঘর, নিজের সংসার। দরকার নেই তোর বাজার। দরকার নেই অমন বুড়োটে কুচুটে ছ্যাচড়া আড়ার। ব্রজবাবুর যদি মনোমত সঙ্গী না-ই মেলে তো ঘরের মধ্যে তিনি থাকবেন তাঁর নিজেকে নিয়ে। দূর করো যত্ত বাজে জঞ্জাল।
দু-একখানা গল্প পড়তে পড়তে কখন মজে গেছেন ব্রজবাবু নিজেই জানেন না। সারাদিন শুয়ে বসে থাকা, এমনিতে ঘুম আসতে চায় না। গল্প পড়তে পড়তে ব্রজবাবুর ঘুম আরও পালিয়ে গেল। ভূতের গল্প, মজার গল্প, ইতিহাসের গল্প, আচ্ছা আচ্ছা গল্প বানিয়েছে তো এরা। রাত দুটো পর্যন্ত পড়ে, বইটিকে মুড়ে ব্রজবাবু এক গ্লাস জল খেয়ে পাশ ফিরে শুলেন। মাথার মধ্যে কিলবিল করছে। গপ্পো। সেই সব গপ্পোই তাঁকে সে রাত্তিরে মাথা চাপড়ে চাপড়ে ঘুম পাড়াল।
এমনি নেশা লেগেছে যে পরদিন বারোটা থেকেই ব্রজবাবু চান-টান সেরে নিয়ে গলা খাঁকারি দিচ্ছেন।
বড়ো বউ বলল, বাবার সময়জ্ঞানটা গেছে।
মেজো বউ বলল, এইভাবেই সব যাবে আস্তে আস্তে।
ছোটো বউ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমায় দাদুরও ঠিক এইভাবে গিয়েছিল দিদিভাই। সব থেকে আগে সময়জ্ঞানটাই যায়। এরপর দেখো খেয়ে বলবেন খাইনি তো। রাতে বলবেন, সকাল হল চা দিলি না? এ আমার নিজের চোখে দেখা আছে গো।
বড়ো বউমা নিজে হাতে করে ভাত নিয়ে এল। কোনোমতে খাওয়া সেরে, আঁচিয়ে ঘরে দোর দিলেন ব্রজকিশোর।
আয়নার সামনে টেবিলের ওপর বই পেতে গালে হাত দিয়ে বিভোর হয়ে পড়তে লাগলেন। আজ ব্রজবাবু একখানা গল্প পড়ছেন, তার নাম হৃদয় রঞ্জনের সর্বনাশ। লেখক বুদ্ধদেব বসু। পড়া শেষ হয়ে গেলে তিনি আরেকটা আরম্ভ করলেন না। উঠে পায়চারি শুরু করলেন। এই হৃদয় রঞ্জনটি অদ্ভুত মানুষ তো! তাঁর মতো একলা। মেসের ঘরে থাকত—ঘরের দেয়ালে স্যাঁতা ধরে নানান ছবি হত হৃদয় রঞ্জন সে দেখে সময় কাটাত, একবার কোথায় গেছে। এসে দ্যাখে মেস ম্যানেজার ঘর চুনকাম করিয়েছে, দেয়ালের ছবি সব অদৃশ্য। মেস ম্যানেজারকে সে এই মারে তো সেই মারে। ভাবতে ভাবতে ব্রজবাবু শুয়ে পড়লেন। অদ্ভুত লোক তো এই হৃদয় রঞ্জনটা। একাচোরা টাইপের। দেখতে পেলে তিনি ভাব করতেন ঠিক। দেয়ালের হাল? অ্যা দেয়ালের … বলতে বলতে তাঁর দৃষ্টি গেল তাঁর নিজের ঘরের পশ্চিম দেয়ালে। আচ্ছা তাঁর ঘরেও তো ছাপছোপ রয়েছে। দেখা যাক তো কোনো ছবি ছাবা হয় কিনা। ইলেকট্রিক ওয়্যার সমকোণে বেঁকে গেছে সিলিং-এর দিকে। কৌণিক বিন্দুতে একটি পোর্সিলেনের লাইট-শেড, ষাট পাওয়ারের বালব ঝুলছে। তার ওপর দিকটায় সিলিং ঘেঁষে একটা বেশ বড়ো ছোপ, নীল-নীল, সাদা-সাদা যেমন হয়। দেখতে দেখতে ব্রজবাবু আপন মনেই বললেন, ধুর। আর সঙ্গে সঙ্গে সিলিং থেকে অদ্ভুত দর্শন একটা লোক তাঁর দিকে কটমট করে তাকাল। লোকটার নাক প্রকাণ্ড। ধনেশ পাখির ঠোঁটের মতো। ঠোঁট জোড়া আড়াআড়ি শোয়ানো একটা বাংলার পাঁচ। চোখের চারপাশ নীল। মাঝখানে মস্ত বড়ো মণি জেগে রয়েছে। মাথাটা টাকে ভরা খালি কিনারে কিনারে গুচ্ছ গুচ্ছ লাল সাদা চুল।
লোকটা কটমট করে তাকিয়ে আছে দেখে ব্রজবাবুর হাসি পেল। বললেন, দূর টাকলু। বলে লক্ষ করলেন লোকটার এইরকম চেহারা হলে কি হবে—যাকে বলে রাম বোকা। চোখটা ভেড়ার চোখের মতো। কেমন মায়া হয়। তিনি বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। প্রায় সমবয়স্ক, কিন্তু রাম বোকা একটা লোক যদি ঘরের মধ্যে সারারাত জেগে থাকে তো কিছু করার নেই। কাল আবার দেখা হবে।
খুব ভোরবেলায় ব্রজকিশোরবাবুর ঘুম ভেঙে গেল। বেশ ঝরঝরে তরতরে লাগছে শরীরটা। সূর্য এখনও ওঠেনি। শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করল না। ব্রজবাবু উঠে পড়ে মুখ-টুখ ধুয়ে ফেললেন। জামাকাপড় পরে বেরিয়ে পড়লেন। এত ভোরে পার্কে কেউ কেউ বেড়াচ্ছে বটে, কিন্তু আড্ডা দেবার মেজাজে কেউ নেই। হনহন করে হাঁটছে সব। প্রাণের দায়ে। ব্রজবাবুও হাঁটতে লাগলেন, ধীরে সুস্থে, পাখির ডাক শুনতে শুনতে, ভোরের হাওয়া খেতে খেতে, গাছের পাতার আড়ালে সূর্য ওঠা দেখতে দেখতে। রোদ একটু চড়া হতেই তিনি পকেটঘড়ি বার করে দেখলেন সাড়ে ছটা, সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফিরে খিলটি তুলে দিলেন। ছেলে-বউরা জাগলেও এখন সব যে যার বাথরুমে। কারুর নজর পড়েনি, বাইরের দরজা খোলা ছিল। ব্রজবাবুর মনে হল পরদিন তিনি তালা দিয়ে বেরোবেন।
