এই ঘরেই, এই পালঙ্কেই পূর্বে মাথা পশ্চিমে পা ব্রজবাবু শোয়ার সময় শুয়ে থাকেন। কাজের মানুষ। আলস্য, কুঁড়েমি, কোনোদিনও অভ্যেস নেই। কিন্তু মুখ ফুটে বউমাদের বলতে পারেন না, আমাকে বাজারটা করতে দাও। এক-একদিন এক-এক ছেলে—চা খেয়েই পাঁই পাঁই করে বাজারে ছোটে। ঘড়ি দেখতে দেখতে উদ্বিগ্ন মুখে ফিরে আসে কুড়ি পঁচিশ মিনিটের মাথায়। সরু চিলতে বারান্দায় নিজের কাপড়ের আরামচেয়ারে বসে বসে তিনি দেখেন। এক দিন দেখলেন, দু দিন দেখলেন, সাত দিন দেখলেন, তারপর আর পারলেন না। অষ্টম দিনের সকাল সাতটায় বড়ো বউমা চান করে কাপড় মেলছে। মেজো বউমা ভাত বসাবার চাল ধুচ্ছে, ছোটো চা ঢালছে কাপে কাপে, ব্রজবাবু থলি হাতে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিলেন। মেজো বউ চমকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। ব্রজবাবুর গলা খাঁকারির মানে আমায় বাজারের টাকাটা দাও বউমা। মেজো বউমা বলল, ওকি বাবা, আপনি কেন থলি হাতে? ছোটো বউমা বলল, এখনও চা খাওয়া হল না! বড়ো বউমা বলল, বাবা, আপনি ওপরে যান। শিবু আপনাকে চা দিয়ে আসছে, ছি ছি রিনি। কত দেরি করলি বল তো! ব্রজকিশোরবাবুর এদের সঙ্গে এত কথা বলা সাত জন্মেও অভ্যেস নেই। তবু বললেন, বাজারটা আমিই করে দিচ্ছি। ওদের তাড়া আছে। চা খেয়ে যাচ্ছি।
ছোটো ছেলে রবি ছুটে এল। থলেটা হাত থেকে একরকম কেড়ে নিয়ে বলল, না, না, আপনি কেন ব্যস্ত হচ্ছেন? বলুন আপনার কী খাওয়ার ইচ্ছে, আমি নিয়ে আসব।
ব্রজকিশোর বুঝলেন, এরা তাঁর বাজার করার উৎসাহের অন্য ব্যাখ্যা করেছে। মনে করেছে তাঁর বিশেষ কিছু খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে। তাই বাজার যেতে চাইছেন। তিনি একবার কেশে নিয়ে বাজারের থলি ছোটো ছেলের হাতে সমর্পণ করে প্রস্থান করলেন। চিলতে বারান্দায় বসে বসে চা খেতে খেতে বুঝলেন এ সংসারে তাঁর প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তিনি আর কারও কোনো কাজে লাগবেন না। বেচারি অবসরপ্রাপ্ত বিপত্নীক। সেদিন দুপুরে ভাত পাতে কচুর শাক, ভেটকি মাছের কাঁটা চচ্চড়ি এবং ধোঁকা একসঙ্গে দেখে তাঁর মনটা বিতৃষ্ণায় ভরে গেল। এইসব খাদ্যগুলি তাঁর প্রিয়। তাই এরা ভেবেছে তাঁর এগুলি খেতে মন গেছে। বহু কষ্ট করে সবগুলো একদিনে জড়ো করেছে। বেচারি ওপারের নোটিশ পাওয়া বুড়ো শ্বশুর! কদ্দিন আর বাঁচবে? খাইয়ে-মাখিয়ে নাও যে কটা দিন বাঁচে। পাতে খাবার পড়ে রইল। কচুর শাক রাঁধা প্রথমত একেলে কলেজে পড়া মেয়ের কর্ম নয়, কাঁটা চচ্চড়িও তাই। এত ঝাল দিয়েছে যে, নাকের জলে চোখের জলে অবস্থা। ধোঁকাটা করেছে ভালোই, কিন্তু গিন্নির নানারকম নিজস্ব তাগবাগ ছিল। ধোঁকায় সামান্য একটু কুমড়ো কি বাঁধাকপি, কি ফুলকপি মিশিয়ে দিতেন, জিনিসটা নরম এবং সুস্বাদু হত। এ ধোঁকা সে ধোঁকা নয়। কিন্তু ব্রজকিশোরবাবু এত হৃদয়হীন নন যে, সব তাতেই এরকম দোষ ধরবেন। তাঁর আসলে বড্ড লেগেছিল এইজন্য যে, এরা তাঁকে অকেজো, লোভী, পেটসর্বস্ব বৃদ্ধের দলে ফেলে দিচ্ছে।
সেইদিন বিকেলবেলাই ব্রজবাবু প্রথম লেকের ধারে গেলেন। বাড়ির থেকে দু এক গলি পেরিয়ে বড়ো রাস্তার ওপারে দিব্যি পার্ক। তার মধ্যে টলটলে জলের লম্বা একটি পুকুর। পাড়ে কয়েকটি বেঞ্চি ফেলা। এই হল লেক। ব্রজকিশোরবাবু লুঙ্গি বদলে ফর্সা ধুতি পরলেন, গেঞ্জি পাঞ্জাবি, একটি হালকা দেখে চাদর গায়ে ফেললেন, হাতে ছড়িটি নিলেন, জলের ধারে একটি বেঞ্চি পুরো বুড়োদের দখলে। ব্রজকিশোর গিয়ে একটু গলা খাঁকারি দিলেন। নড়ে-চড়ে বসে অবিনাশবাবু বললেন, আরে ব্রজ এসো এসো, খাঁকরাচ্ছ কেন, আমাদের পার্টিতে ভরতি হবে তো মুখ ফুটে বললেই তো হয়। কি বলো বিভূতি!
বিভূতিবাবু বললেন, তাই তো, আচ্ছা ব্রজ, তুমি চিরকেলে রসিক না হয় মানছি, তা রস কি এখানেও পকেটে করে আনবে? আমাদের বুড়ো হাড়ে আর কত সয়? বিভূতিবাবু চোখ টিপলেন। তাঁর চোখের ইঙ্গিত অনুসরণ করে ব্রজবাবু দেখলেন অদূরে বটগাছের ঝুরির আড়ালে একটি আঁচল ও একটি পাঞ্জাবির পাশ পকেট দেখা যাচ্ছে। ব্রজবাবু মুখ ফিরিয়ে নিলেন। বিভূতি, অবিনাশ এবং তৃতীয় ব্যক্তি রাসু এমন খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে লাগল যে বটগাছের আড়াল থেকে ছেলেমেয়ে দুটি হঠাৎ উঠে চিনেবাদাম খেতে খেতে সামনে দিয়ে চলে গেল। ছেলেটি মেয়েটিকে বলল, কালে কালে হল কি রে মন্দিরা, ঘাটের মড়াতেও প্যাঁক দায়?
ব্রজবাবু সবচেয়ে ধারে বসেছিলেন, তাঁর দিকে চেয়েই ছেলেটি বলল। ছেলেটি মুখ-চেনা। মনের ভাব মুখে দেখাবার পাত্র ব্রজবাবু নন, কিন্তু মনে মনে তিনি মরমে মরে গেলেন। এরপর ছেলেটির সঙ্গে রাস্তার-ঘাটে দেখা হলে সে যে এই ধরনের তাচ্ছিল্যকর মন্তব্য আবার করবে না, তার কোনো স্থিরতা আছে?
রাসু বলল, যাক বাঁচা গেল। তারপর তোমার বাড়ির খবর বলো। ছেলেরা কবে ভেন্ন হচ্ছে? অ্যাদ্দিন তোমাতে-গিন্নিতে টেনেছ। তিনি হেঁসেল টেনেছেন, তুমি বাজার টেনেছ। এবার তো ভাই হাতা-বেড়ি উঠেছে হাতে, তোমার পেনশনটুকু বই সঞ্চয় নেই। কী? আছে?
ব্রজবাবু উঠে পড়লেন। একটু কেশে, মুখে বললেন, ঘুরে আসি।
হ্যাঁ, এসো, তাই এসো গে। বয়সটা তো খারাপ ভায়া। ঘাটের গাঁটটি উতরেছ। পঁয়ষট্টিতে আর একটি গাঁট চলছে। চলে ফিরে যন্তরগুলোকে সচল রাখো। নইলে
