মাউথপিসে হাত চাপা দিয়ে ঝিলিক এদিকে চেয়ে বলল, কে আসবে? কাকু না কাকিমা, রিন্টু মালদা থেকে ফোন করছে, ডিসিশন নিয়েছে…
জড়বৎ বসে থাকেন শোভন-শোভনা। কী ডিসিশন রিন্টুর, যাতে ঝিলিক তাকে কনগ্রাচুলেট করে? কী সেই ডিসিশন যা শুনলে তাঁরা নাকি ন্যাচার্যালি খুশি হবেন? বুদ্ধিবৃত্তি-ম্যাচুরিটি-জীবনবোধ? কী জীবনবোধের বার্তা শোনাবে রিন্টু, তাঁদের নয়নের মণি, একমাত্র আদরের সন্তান?
লিখন
ব্রজকিশোরবাবু মধ্যম দৈর্ঘ্যের গাঁট্টাগোট্টা চেহারার মানুষ। বেশ গোঁফ আছে। চাপ। গোঁফ। বেশি কথাও বলেন না। আবার কম কথাও বলেন না। অর্থাৎ কারও কারও সঙ্গে বেশ কথা বলেন, কারও কারও ব্যাপারে হাঁ হাঁ করে সেরে দ্যান। আপিসে বড়োবাবু ছিলেন। কোনো কোনো সমবয়সি সহকর্মী, কোনো কোনো অধস্তন ছেলেছোকরার সঙ্গে বেশ জমাট আলাপ ছিল। মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি থেকে এলে, ভালো আছো তো? জামাই বাবাজি এল না কেন? কাজ পড়েছে? ভালো ভালো। নাতিনাতনিদের সঙ্গে কী দাদুভাই পড়াশোনা কেমন হচ্ছে? দিদিভাই একটু সকাল-সকাল করে বড়ো রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরবে। গিন্নির সঙ্গে অবশ্য সম্পর্কটা একটু আলাদা রকমের। চল্লিশের আগে পর্যন্ত ব্রজকিশোরবাবু গিন্নির। সঙ্গে দোলনায় দুলেছেন। এক পানের বাটা থেকে দুজনে এ ওকে ও একে পান খাইয়েছেন। রঙ্গ-রসিকতা করেছেন আর দুলে দুলে হেসেছেন। খেলাধুলোর জন্যে লুডো, তাস আর চাইনিজ চেকার সদাসর্বদা ঘরে মজুত থাকত। সাপ লুডোটাই যদিও সবচেয়ে পছন্দ ছিল দুজনের। তিন মাস অন্তর মাইনের টাকা থেকে জমিয়ে ব্রজকিশোরবাবু গিন্নিকে একটি জববর শাড়ি কিনে দিতেন। হাতি পেড়ে, কি গঙ্গা যমুনা পাড়, কি পাছা পেড়ে। গিন্নি বেঁটে মানুষ, রং টকটক করছে, নাকটি বড়ির মতন, চুল কালো কুচকুচে তৈলাক্ত মসৃণ। সেই খাটো, মোটাসোটা শরীরটিতে লাল-কালো গঙ্গা যমুনা পাড় শাড়িখানা পরে ঝনাৎ করে যখন পিঠের পেছনে চাবিটি ফেললেন, নাকের হিরেটিতে আলো ঝলকে উঠত, তখন ব্রজকিশোরবাবুর ভেতরটা কী করত তা একমাত্র ব্রজকিশোরবাবুই জানেন। আমরা জানি না।
বয়স পশ্চিমে হেলতে থাকল, ব্রজকিশোরবাবুর ব্রজকিশোরীও ক্রমশ বউমাদের রান্নাঘরে, আঁতুড়ঘরে সেঁদোতে লাগলেন। দোলনায় ছেলে-বউকে টপকে নাতিনাতনিরা বন্ধুবান্ধব নিয়ে দুলতে লাগল। পান খাওয়া কমে এল। খেলাধুলোর গিন্নি ক্রমশই আরও খেলুড়ি সংগ্রহ করতে লাগলেন। বড়ো নাতি দুলাল বলে, আমি কিন্তু লাল নেব। নাতনি শীলু বলবে, আমি, নীল। সবাই সব নিয়ে-টিয়ে ব্রজকিশোরবাবুর পড়ে থাকবে ম্যাটমেটে, অলুক্ষুনে হলদে। রোজ। রোজ। একদিনও তো মানুষ বুড়োমানুষটাকে লাল দেয়। তাঁর ঘর। তাঁর লুডো। হয় নাতি, নয় নাতনি লাল নিয়ে বসে আছে। তার ওপর কোথা থেকে শিখে এসেছে কেঁচে খেলা। খুঁটি উঠে গেল। তারপর আবার সেখান থেকে দান মতো নেমে কুচ কুচ করে দাদুর খুঁটি কাটছে। আ গেল যা। কয়েকদিন খেলে খেলায় জন্মের মতো বীতশ্রদ্ধ হয়ে ব্রজকিশোরবাবু বললেন, দুত্তোর ছাই, খেলব না, তোরা খেল গে যা।
তিনজনে খেলা হয় না কি? অ দাদু এসো না!
নাঃ।
গিন্নি কটাক্ষে চেয়ে বললেন, বাবুর বুঝি রাগ হল?
হ্যাঁ রাগ হল। ব্রজকিশোরবাবু বারান্দায় পাতা বেতের চেয়ারে গিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসলেন। হাতে খবরের কাগজ।
আশা করি আমি বোঝাতে পেরেছি এই ব্রজকিশোরবাবুর চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করতে হলে কিংবা স্ত্রীবিয়োগ হলে কি বিপদ হবে। তাই হল। এবং একসঙ্গে হল। সেপ্টেম্বর মাসে তিন বছর এক্সটেনশনের পর ব্রজবাবু রিটায়ার করলেন। মালা ও চন্দন, ছাতা-ছড়ি, ধুতি-পাঞ্জাবি, শাল নিয়ে। শালটি ঈষৎ বেগুনি আভার। আসল পশমিনা। আদর করে গিন্নির গায়ে জড়িয়ে দিলেন। অক্টোবর মাসে পুজোর সপ্তমীর দিন অষ্টমীর বাজার করে আনলেন স্বামী-স্ত্রীতে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, কড়াইশুটি, কুমড়ো, টম্যাটো, প্যাকেটের ময়দা, ভালো ঘি, নৈনিতাল আলু, এক নম্বর ছোলার ডাল, কিসমিস, বেগুন। সন্ধে বেলায় গৃহিণী ঘুরে পড়লেন। পড়লেন তো পড়লেন। আর উঠলেন না। নার্সিংহোম ঘুরে একেবারে কেওড়াতলা চলে গেলেন।
সবকিছু চুকেবুকে গেলে, বুকের ওপর আড়াআড়ি হাত, মাথা ঝুঁকিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন দেখে, বড়ো বউমা, মেজো বউমা, ছোটো বউমা এসে বলল, বাবা, বাবা, আমরা তো আছি। একটু দুরে তিন ছেলে। বড়ো হয়ে অবধি বাবার সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলা অভ্যাস নেই—কী ইশারা করল যে যার বউকে। বড়ো বউ বলল, বাবা, আপনি আরাম করুন, মেজো বলল, কোনো ভাবনা নেই। ছোটো বলল, আমরা সবাই আছি।
ব্রজকিশোর বললেন, হুঁ। বলে ঘরে চলে গেলেন। দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। থাকো বাবা, সবাই থাকো। কিন্তু ওইখানে থাকো। ওই চৌকাঠের বাইরে। ঘরে যদি থাকি তো আর কাউকে মনোমতো না পেলে আমি আমাকে নিয়েই থাকব। তোমরা তোমাদের সংসারে। আমি আমার সংসারে। চারবেলা চাট্টি খেতে দিয়ো। ব্যস।
বাড়িখানি ব্রজকিশোরবাবুর ঠাকুরদার করা। তাঁর বাবা, তিনি, ছেলেরা, যে যেমন পেরেছে বাড়িয়েছে, সারিয়েছে। ব্রজবাবুর ঘর বরাবরই দক্ষিণ-পশ্চিমে, দেয়ালগুলোতে কী মশলা কী ইট ব্যবহার করেছিল মিস্তিরি কে জানে, বর্ষার পর দেওয়াল বিশেষত পশ্চিমের দেয়াল কেমন ভেপসে ওঠে, চুনকাম অসমান, ছোপ ছোপ হয়ে যায়। ঘরের একদিকে একটি সেকেলে পালঙ্ক। পালঙ্কের তলায় গিন্নির সেলাই মেশিন, গরম জামাকাপড়ের ট্রাঙ্ক বাক্স। ঘরের উলটোদিকে কাজ-করা আয়নাঅলা মেহগনির আলমারি, পাশে আলনা, তার পাশে টেবিলে আয়না বসানো। সামনের চেয়ারে বসে কাজকর্ম করাও চলে, আবার দাড়ি কামানো, চুল বাঁধা, সাজগোজ এসবও চলে, চলে মানে চলত। ড্রয়ারের মধ্যে এখনও একটাতে গৃহিণীর ফিতে-কাঁটা-চিরুনি মজুত। আরেকটাতে চিঠি লেখার সাজসরঞ্জাম-খাম, পোস্টকার্ড, লেটার প্যাড, কলম ইত্যাদি ইত্যাদি। ঘরের একদিকের দরজা দিয়ে দোতলার দালানে যাওয়া যায়, আরেক দিকের দরজা দিয়ে সরু জাল ঘেরা বারান্দায় যাওয়া যায়। বারান্দায় একটি কাপড়ের ইজিচেয়ার পাতা আছে। একটি টিয়ার খাঁচা থাকে, আর একটি আড়াআড়ি তারে ব্রজবাবুর জামাকাপড় অর্থাৎ লুঙ্গি, ফতুয়া, গেঞ্জি, রুমাল, গামছা শুকোয়।
