দেখেছি? কে? কে?–শোভনা-জয়া একসঙ্গে হইহই করে উঠলেন।
পটাশ।
পটাশ? জয়া যেন আকাশ থেকে পড়লেন।
শোভন বললেন, পটাশ না খটাশ? এ রকম আবার কারও নাম হয়? অ, তুই তখন ওপর থেকে বলছিলি বটে পটাশ রেকর্ড আনিস, না কী একটা!
শোভনা বললেন, ওই থ্রি কোয়াটার সুতো ঝোলা প্যান্ট আর ফতুয়া পরা মেয়েটা? চোখে বোধহয় সতেরো পাওয়ারের চশমা, দাঁত উচু-ওকে আমি প্রথমটায় মেয়ে বলে বুঝতেই পারিনি। আমার রিন্টুর পাশে ওই পটাশ?
প্রথমত কাকিমা, পটাশ নামটায় আপত্তি হলে ওর একটা পোশাকি নামও আছে। অনন্তযামিনী কৃষ্ণকামিনী সাবিত্রী কৌশল্যা আয়েঙ্গার। এখন উচ্চারণ করতে অসুবিধে বলে আমরা পটাশ বলেই ডাকি। দ্বিতীয়ত কাকিমা, কে কার পাশে থাকবে সেটা তো আর আয়না ঠিক করে দেবে না। কনভেনশন্যাল, রক্ষণশীল বিয়ে রোম্যান্টিক মানুষেরা কখনোই করে না। মন যাকে চায় তাকেই…
শোভন গম্ভীরভাবে বললেন, তা রিন্টুর মন যাকে চেয়েছে ওই পটাশ না পটাশিয়াম সায়নাইডটি কে? কী?
ও হল গিয়ে গ্লোব-ঐটার। পর্যটক। ওকে নিয়েই তো এখন ডকুমেন্টারি করছি আমরা। সেই জন্যেই ওর রেকর্ডস আনতে বলছিলুম। সাইকেলে ভারত ভ্রমণ দিয়ে আরম্ভ করেছিল। এখন তো আলাস্কা অবধি চলে গেছে।
ভালো। খুব ভালো। পছন্দ-অপছন্দ তোমাদের খুব ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমরা কিছু বলতে চাই না। তা রিন্টুর মন খারাপ করার কারণ কী? আমরা ওর পথের কাঁটা হয়ে থাকতে চাই না। অনুমতি দিয়ে দিচ্ছি, যা খুশি তাই করুক।
তোমরা অনুমতি দিলে কী হবে? পাত্রী স্বয়ং যে টালবাহানা করছে।
মানে? পটাশের রিন্টুকে পছন্দ হচ্ছে না? জয়া আকাশ থেকে পড়লেন।
কেন?
অবভিয়াসলি পটাশ আরও রোম্যান্টিক বলে। ওর দাবি রিন্টু ওই সরকারি চাকরিটা ছেড়ে দিক। ওরা দুজনে সারা পৃথিবী পর্যটন করে বেড়াবে। ট্রেনে, সাইকেলে, ট্রাকের মাথায়, হিচ হাইক আর কি, যখন যেমন জোটে।
অন্নবস্ত্র?–শোভনা হাঁ করে রয়েছেন। শোভন কোনোমতে জিজ্ঞেস করলেন। এ সব ব্যাপারে আজকাল কিছু স্পনসর-টর পাওয়া যাচ্ছে কাকু। তবে পটাশ পরোয়া করে না। ওর থিওরি হল দুটো শিক্ষিত বুদ্ধিমান ছেলেমেয়ে যাদের গোটা হাত-পা আছে তাদের গ্রাসাচ্ছাদনের অভাব হওয়ার কথা নয়। দরকার হলে মাল বইবে, দরকার হলে হোটেলে এঁটো বাসন ধোবে। মোট কথা…
অতীশ-শোভন প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলেন, রিন্টু একটা ইকনমিকসের এম.এস.সি. আই এ. এস. অফিসার… সে মাল বইবে? এঁটো বাসন ধোবে?
জয়া বললেন, পটাশের ইচ্ছে হয় সে বাসন ধুগে যাক। তাকে মানাবে এখন।
মজা পাওয়া গলায় ঝিলিক বলল, পটাশ কিন্তু বায়োকেমিস্ট্রির ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট মা, আর পটাশরা তিন পুরুষ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে আছে। ওর বাবা ডক্টর শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার এখন এডুকেশনের ডিরেক্টর।
চমৎকার, তা তাঁর মেয়ের এমন মতিগতি কেন? বাসনই যদি মাজবে তো বায়োকেমিস্ট্রি পড়ার দরকার কী ছিল?
পটাশ বলে, জীবনটাকে ঠিকমতো দেখতে শুনতে হলে, বুঝতে হলে, ল্যাবরেটরির বাইরে আসতে হবে। সমস্ত কাজ, সমস্ত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
ভালো, তা ঘর-টর বাঁধা, ছেলেমেয়ে মানুষ করা এ সব করবে কবে? বুড়ো হয়ে গেলে?–শোভনার গলায় ঝাঁঝ।
কাকিমা সে-গুড়ে বালি, পটাশ বলে, পৃথিবীতে যথেষ্ট শিশু আসছে, তাদের আদর হচ্ছে না, তারা ধবংস হয়ে যাচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে ওদের দুজনের আর শিশু আনবার প্রশ্নই উঠছে না। আর ঘর বাঁধা? পটাশ পথকেই ঘর বলে মনে করে। বুড়ো বয়সের নাকি প্রশ্নই নেই। ওর ধারণা এইভাবে পৃথিবী দেখতে-দেখতে ওরা যৌবনেই গত হবে, বৃদ্ধ আর হতে হবে না।
—বাঃ, হতভম্ব চার মা-বাবার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল।
অতীশ বললেন, তা এই চিরপথিক চিরনবীন পটাশকেই আমাদের রিন্টু বিয়ে করবে ঠিক করেছে?–অতীশের গলায় কি শ্লেষ?
ঝিলিক একটু চুপ করে রইল, তারপর মুখ তুলে আলতো করে বলল, সেখানেই তো আসল প্রবলেম।
চারজনেই হাঁ করে আছেন।
ঝিলিক বলল, কাকু, পটাশ বিয়ে করতেও চাইছে না।
মানে?
বলছে বিয়ে-টিয়ে ও সব পুরনো সমাজের পুরোনো অভ্যেস। যতদিন পরস্পরের পরস্পরকে ভালো লাগে ততদিন একত্রে থাকলেই হল।
অর্থাৎ?
রিন্টুর ভালো না লাগলে রিন্টুর ফিরে আসার স্বাধীনতা আছে। পটাশের ভালো না লাগলে পটাশেরও। এই নিয়েই ওদের টানাটানি চলছে এখন। রিন্টু ডিসিশন নিতে পারছে না। বেচারির অবস্থা খুব খারাপ কাকু। পটাশকে ছাড়া ওর জীবন অন্ধকার, পটাশেরও তাই… এ দিকে…
এই সময়ে ফোনটা ঝনঝন করে বেজে উঠল। অতীশ ধরবার জন্যে উঠছিলেন, ঝিলিক তড়াক করে লাফিয়ে উঠল, বলল, আমার একটা এস টি ডি আসার কথা আছে বাবা, আমি ধরছি।
ওঁরা চারজন বারান্দার বসেছিলেন পরস্পরের দিকে মুখ করে, বারান্দার কোলে ঘর, ঘরটা ছায়া-ছায়া দেখাচ্ছে, ঝিলিকের বিস্কুট রঙের পোশাক ঘরের রঙের সঙ্গে প্রায় মিশে গেছে। ওর খোলা চুলের ঢাল দেখা যাচ্ছে, আর মাঝে মাঝে নাকের উগা। সবাই প্রায় একসঙ্গে ঘরের দিকে মুখ ফেরালেন, কেননা—মাউথপিসের মধ্যে ঝিলিক বলছে-আরেকটু চেঁচিয়ে বল রিন্টু, ভালো করে শুনতে পাচ্ছি না, কেমন একটা ভোঁ ভোঁ আওয়াজ হচ্ছে… হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক আছে… ডিসিশন নিয়েছিস। বাঃ, চমৎকার, হ্যাঁ ডিসিশনটাই আসল, তোর চোদ্দো আনা বুদ্ধিবৃত্তি-ম্যাচুরিটি জীবনবোধ ওই ডিসিশনের মধ্যে দিয়েই প্রকাশ পাবে। কী বললি? গুড। ভেরি গুড, আই কনগ্রাচুলেট ইউ, ঘটনাচক্রে কাকু-কাকিমা আজ এখানে। তুই ওদের বল, নিজেই বল… হ্যাঁ ন্যাচার্যালি খুশি হবেন।
