তুমিই বলছ বাবা কথাটা, আমি কিন্তু বলিনি—ঝিলিক মিটিমিটি হাসতে লাগল।
গা জ্বালানো চিড়িক চিড়িক হাসিসনি আর—জয়া এবার তাঁর কথার বাঁধুনি বার করে ফেলেন, আর সব ছেড়ে রোমান্সের কথাই ধর না। রোমান্স আর নেই, সেই সুদূর, সেই বিধুর,… ঝিলিক যোগ করল, হ্যাঁ হ্যাঁ সেই তিয়াস সেই হতাশা, সেই বিষাদ সেই বিরাগ, সেই অনুরাগ সেই অভিমান, সেই সর্বস্বত্যাগ সেই আত্মঘাত…
হ্যাঁ হ্যাঁ সেই শরীরপাত সেই কুপোকাত—এভাবে বললে কমিক শোনাবেই কন্যে। কিন্তু কথাটা সত্যি। তোমাদের যুগে প্রেম নেই, সবই ক্যালকুলেশন। তোমাদের হচ্ছে ফ্যালো কড়ি, মাখো তেল, পোষালো তো পোষালো, নইলে কাটো। চুটিয়ে ডেটিং করো, দায়িত্ব নেবার কথা বোলো না, কিছু বলতে হলে শেয়ারবাজারের কথা বলো ব্যাঙ্ক থেকে কত লোন পাওয়া যাবে, কত ইন্টারেস্ট, কতটা ফেরত দিলে কতটা মেরে দিলে চলবে, বাড়ি মর্গেজ, গাড়ি মর্গেজ, ইনস্টলমেন্টের ফার্নিচার, ভাগের মা ভাগের বাবা, ভাগের ছেলেপুলে… আঙুল নেড়ে নেড়ে বলতে বলতে থেমে গেলেন শোভন।
কী হল! গাড়ি স্কিড করে গেল কেন কাকু? আগে বাড়ো, ভালোই বলছ।
অতীশ এইবার সুযোগটা নিয়ে নিলেন, বললেন, কথাটা ভালো করে বলার ব্যাপার নয় ঝিলিক। কথাটা হচ্ছে, তুই এখন কী করছিস, ভবিষ্যতেই বা কী করবি? কলেজের চাকরিটা ছাড়লি কেন? বিয়ে-থাই বা করবি কবে? এ সব তো আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে ড্রয়ারে চাবি দিয়ে রেখেছিস। আজ শোভনকাকুরা আসতে যদি তুমি চাবি খুললে তো কথাগুলো হয়েই যাক না! আপত্তি আছে?
না, আপত্তি নেই—ঝিলিক এবার গম্ভীর হয়ে বলল, আমার এক নম্বর কৈফিয়ত শুনে নাও বাবা-মা, কলেজের চাকরিতে আজকাল বড্ড বায়না ক্কা, কষ্ট করে এম, এ. পাস করলুম আটান্ন পার্সেন্ট মার্কস নিয়ে, তো বললে স্লেট পরীক্ষা দাও, যদি পাস করলুম তো বললে ভাইভা দাও, তা যদি দিলুম তো বললে এম ফিল করতে হবে, পি এইচডি করতে হবে, না হলে কদিন পরে আর ইনক্রিমেন্ট হবে না। এখন স্টাডি লিভ পাবার জন্যে কলেজের টি আর-দের সঙ্গে কনস্ট্যান্ট যোগাযোগ রেখে যেতে হবে, তার ওপর দলাদলি, কে সিপিএম, কে ফরওয়ার্ড ব্লক, কে কংগ্রেস, কংগ্রেসের সঙ্গে আবার সিপিএম-এর গোপন আঁতাত। এ সব বুঝতেই তো আমার বছরখানেক ঘুরে গেল। একে আমার অত ঘাড় হেঁট করে পড়তে ভালোই লাগে না, তার ওপর অত তেল খরচা, অত ক্লিকবাজি, আমার পোষালো না, আমি বিদ্রোহ করলুম। ধরি মাছ না ছুঁই পানি করে চালাতে পারতুম অনায়াসেই। কিন্তু সেটা ক্ষমতার অপচয় মনে হল, স্রেফ ছেড়ে দিয়ে চলে এলুম।
তা হলে তো তুই হার স্বীকার করে নিলি–শোভন বললেন।
আমার জীবনটা তো এখনও শেষ হয়ে যায়নি কাকু। আমি, সবাই যা করে সেই হেঁ-হেঁ-টা করলুম না, সিস্টেমটাও আমার পছন্দ হল না, এটা বিদ্রোহ। বিদ্রোহ ব্যাপারটা কিন্তু রোমান্টিক। টাকা-আনা-পাইয়ের হিসেব যারা করে তাদের দ্বারা হয় না।
সকলে একটু চুপচাপ। ঝিলিক বলল, আচ্ছা কাকু, কাকিমা, আমি একাই কি প্রবেলম চাইল্ড? রিন্টু? রিন্টুকে নিয়ে তোমাদের কোনো সমস্যা নেই?
তুমি প্রবলেম চাইল্ড কে বলেছে?—শোভনা জয়া একসঙ্গে বললেন।
শোভনা বললেন, কে বলে রিন্টুকে নিয়ে সমস্যা নেই!
শোভন-শোভনা পরস্পরের দিকে তাকালেন।
রিন্টু কি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে? ঝিলিক জিজ্ঞেস করল।
বলিস কী? এই বাজারে ওই চাকরি ছাড়া? তুই মেয়ে বলে পেরেছিস।
কিন্তু ও তো ভীষণ আনহ্যাপি ওখানে, বুঝতে পার না?
সেটাই তো প্রবলেম, মুখটা ম্লান করে থাকে, খেতে শুতে দীর্ঘশ্বাস, রোগা হয়ে যাচ্ছে।
তোমরা ঠিক জানো, চাকরিটাই ওর একমাত্র প্রবলেম?
কেন? আর কোনো প্রবলেমের কথা তো আমরা জানি না।
ঠিকই বুঝেছিলুম, তোমরা ওর কোনো খবরই রাখে না।
কী করে রাখব! তোমাদের চাবি-দেওয়া ব্যক্তিগত ড্রয়ার আছে না?–শোভনা ঝংকার দিয়ে উঠলেন।
তা আর কী প্রবলেম ওর?—শোভন জিজ্ঞেস করলেন।
দীর্ঘশ্বাস ফেলা, ক্ষুধামান্দ্য—এ সব কীসের লক্ষণ কাকিমা, তোমাদের এক্সপিরিয়েন্স কী বলে?
সে কী রে? ও কি প্রেমে পড়েছে? হুর রে, কী মজা!–শোভনা প্রায় হাততালি দিয়ে ওঠেন আর কি,–তা ভাগ্যবতীটি কে?
তাকেই ভাগ্যবতী হতে হবে কেন? কাকিমা, রিন্টুও তো ভাগ্যবান হতে পারে!
রিন্টু ভাগ্যবান হলে আমাদের চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হবে না। মেয়েটি কে? যে রিন্টুকে ভাগ্যবান করেছে। আমরা চিনি?
-চেনো।
তুই না কি রে?–শোভনা রই রই করে উঠলেন।
ঝিলিক আবার সেই চিড়িক মারা হাসি হেসে বলল, আমি কি পাত্রী হিসেবে খুব ভালো কাকু? একে তো খেয়ালি, তার ওপর ভীষণ গোঁয়ার। রিন্টুর ছ-ফুটের পাশে আমার পাঁচ ফুটই কি খুব মানানসই হবে?
শোভনা বললেন, তুই কি সেই জন্যে মত দিচ্ছিস না? দূর পাগলি। তুই আমাদের চেনাজানা, তোর বাবা-মা আমাদের বেস্ট ফ্রেন্ড। এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে? আমাদের সময়েও ওরকম লম্বু গুড়গুড়ে জুটি ছিল। ওতে কিছু এসে যায় না।
অতীশ এই সময়ে বললেন, শুধু একটা মই…
জয়া চোখ পাকিয়ে তাকাতে তিনি চুপ করে গেলেন।
শোভন-শোভনা বললেন, রাজি হয়ে যা ঝিলিক। আমরা খুব খুশি হব।
ঝিলিক বলল, ধৈর্য ধরো। ধৈর্য ধরো, মেয়েটা আমি নয়।
তুই নয়?–হতাশ গলা শোভনার।
তবে তাকেও তোমরা দেখেছ।
