খোঁজ পেলি মানে? শোভনা অবাক হয়ে বললেন। তোদের সঙ্গে কী তোদের একমাত্র মেয়ের কোনো মানসিক যোগাযোগ নেই?
আছে বললে আছে ভাই, নেই বললে নেই—জয়া বললেন।
বুঝলুম না—শোভনা হতাশ।
না বোঝার কী আছে?—অতীশ চেয়ার এগিয়ে বসেন, সকালবেলা চা করে দিচ্ছে, বিছানা গুছোচ্ছে, বালিশ রোদে দিচ্ছে, দেয়ালে ঝুল দেখলেই ঝাড়ছে, মাকড়সা দেখলেই মুচ্ছো যাচ্ছে, ওর মায়ের আর ওর শতখানেক প্রসাধনের সামগ্রী নিয়ম করে কিনে আনছে।
জয়া হাঁ হাঁ করে উঠলেন—শতখানেক প্রসাধনের আইটেম মানে? ইয়ার্কি পেয়েছ?
আরে বাবা ক্রিমই তো খান পঞ্চাশেক। ঠোঁটের ক্রিম, চুলের ক্রিম, নাকের ক্রিম, কপালের ক্রিম, গালের ক্রিম…..
শোভনা বন্ধুর সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন, আহা, ঠোঁটের আর গালেরটা ঠিক আছে অতীশদা। বাকিগুলো আপনার উর্বর মস্তিষ্কের প্রোডাক্ট। কথা বলবার সুবিধের জন্যে মানে আলাপটা বেশ রঙ্গিলা করে তোলবার জন্যে ব্যবহার করছিলেন।
তোমরা সাইড-ট্র্যাকে যাচ্ছ—শোভন বিরক্ত হয়ে বললেন, আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল মা-বাবার সঙ্গে কন্যার মানসিক যোগাযোগ, সেটা…
হ্যাঁ হ্যাঁ, অতীশ বললেন, ওই যা বলছিলুম, সবই করছে, বেরোনোর সময়ে বলেও যাচ্ছে, ইচ্ছে হলে ডেস্টিনেশন এবং ফেরবার সম্ভাব্য টাইমও। কিন্তু কোথায় কখন বললে কী হবে, কেন, কেমন এসব বিষয়ে চুপ। ওগুলো নাকি ব্যক্তিগত ব্যাপার।
এই এক ব্যাক্তিগত উঠেছে আজকাল, শোভনা ফোঁস করে উঠলেন, রিন্টুটাকে নিয়ে আমাদের কত জল্পনা-কল্পনা। ছেলে আমাদের বন্ধু হবে। বাপের বন্ধু, মায়ের বন্ধু। ছেলে তো বাপের ফাজলামি শুনতে শুনতে বড়ো হল। কিন্তু বন্ধু কই? এখন দেখছি সে গুড়ে বালি। ব্যক্তিগত-তে এসে সব ঠেকে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত-টা আবার ঠিক কোনখান থেকে আরম্ভ হচ্ছে বোঝা দায়।
এই সময়ে ঝিলিক আবার এসে ঢুকল। ঝিলিক একটি অতি তন্বী পাঁচফুটি তরুণী। বয়সে যুবতি হলেও তাকে দেখলে আঠারো পার হয়েছে বলে মনে হয় না। রং মাজা। দেখতে সে ঠিক কেমন, সুন্দরী না বান্দরী সেটা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। কারণ অল্পবয়সের মহিমা তার সর্ব অবয়ব থেকে ঠিকরোচ্ছে। সে একটা ঝোল্লা কুর্তা পরেছে, যার ওপর কতকগুলো কার্টুন ফিগারের অ্যাপ্লিক সাঁটা। সালোয়ারটাও ঝোল্লা। ফলে ঝিলিককে আরও বেঁটে দেখাচ্ছে। কিন্তু তার চোখমুখ, হাঁটাচলা ইত্যাদি দেখলেই বোঝা যায় সে এসব গ্রাহ্যের মধ্যে আনে না। ঝিলিকের মুখ তেলতেলে। প্রচুর চুলেও বেশ তেল। মাঝখানে সিঁথি কেটে দু-দিক পেতে আঁচড়ানো। ঝকঝকে দাঁতে ঝিলিক হেসে বলল, বসতে পারি?
শোভন-শোভনা হাঁ-হাঁ করে উঠলেন, নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই বসবি বইকি! এ তো আমাদের সৌভাগ্য।
কেন? সৌভাগ্য কেন? বলতে বলতে ঝিলিক বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে নীচের দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে বলল, সদর দরজাটা ভালো করে টেনে দিয়ে যাস। এই পটাশ, পরের দিন রেকর্ডগুলো, মনে আছে তো?
নীচ থেকে কতকগুলো উচ্চ আওয়াজ এল। চার পাঁচটি ছোটো বড়ো চুল ছেলে, চার পাঁচটা এলোমেলো চুল মেয়ে রাস্তা কাঁপিয়ে তর্কাতর্কি করতে করতে চলে গেল।
ঝিলিক এবার মুখ ফিরিয়ে বলল, কেন? সৌভাগ্য কেন?
সৌভাগ্য মানে সৌভাগ্য কেন হবে? সৌভাগ্য বই কি! শোভন-শোভনা আমতা আমতা করতে থাকেন।
ঝিলিক হেসে বলল, আসলে আমার কথা আলোচনা হচ্ছিল, খুব ঘাবড়ে গেছ আমি এসে বসতে। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়। ঠিক? না, না, মিথ্যে কথা একদম বলবে না, মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। আচ্ছা কাকু, তোমরা এত পি এন পি সি করো কেন বল তো?
জয়া রাগ করে বললেন, তুই তাহলে আমাদের পর? তোকে নিয়ে আলোচনা করলে পি এন পি সি?
দেখ মা, তা যদি বল প্রত্যেকটা মানুষই প্রত্যেকটা মানুষের পর। আমার পেট কামড়ালে তুমি বড়ো জোর ওষুধ দিতে পার। ডাক্তার ডাকতে পার, কিন্তু আমার ব্যথাটা তুমি ভোগ করতে পার কি?
অতীশ জোর গলায় বেশ ঘোষণা করার মতো করে বললেন, ঝিলিক, আমরা কিন্তু মোটেই তোমাকে নিয়ে সারাক্ষণ আলোচনা করিনি, একদম শেষ দিকটায় তোমার সম্বন্ধে, মানে তোমার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সামান্য কিছু আধা সিরিয়াস আলোচনা হয়েছে। তাকে নিন্দা বা চর্চা কোনোটাই বলা চলে না।
তা হলে কী আলোচনা হচ্ছিল এতক্ষণ?
রোমান্স নেই, শোভন ঘোষণা করলেন, প্রেমও নেই, আমাদের সময়ে ছিল, এখন নেই। এই।
ঝিলিক হাসতে হাসতে বলল, খাবারদাবারগুলো এখন কেমন যেন লাগে, না কাকু? সে সবজিও নেই, সে মাছও নেই, সব ভ্যাসকা। সে রাঁধুনিও নেই। কাকিমা রাঁধে, ঢোঁক গিলে ভালো, কিন্তু কাকু তোমার মায়ের মতো শুক্তো করতে কি পারে? বড়ির টক? শাকের ঘন্ট? বলো? জনান্তিকেই বলো না হয়, কিন্তু বলো। আচ্ছা বাবা, তুমি তো দিবারাত্র হা-হুতাশ করছ—নাই নাই সে-সব গান নাই বলে, তা তোমার বাবা মানে আমার দাদু গান বিষয়ে তোমাকে কিছু বলেননি? দাদু বা দিদা? বলেননি আহা জ্ঞান গোঁসাই, কৃষ্ণচন্দ্র দে… সব কী গানই গাইতেন, তোমাদের আধুনিক গান সতীনাথ মুখার্জি, শ্যামল মিত্র তার কাছে দাঁড়াতে পারে না, একেবারে ছ-ছ্যা। বলেননি?
কী বলতে চাস তুই? অতীশ রে-রে করে উঠলেন, আমরাই বুড়ো হয়ে গেছি? আমাদের স্বাদ পাবার ক্ষমতা চলে গেছে আর পৃথিবীর সবকিছুই ঠিক আগের মতো আছে, এই তো?
