জানো তো দেখছি অনেক কিছুই, কিন্তু ম্যাডাম ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ছাড়া কি এত ডিটেল জানা যায়?
অতীশের কথায় জয়া হাততালি দিয়ে হেসে উঠল, খাপ খুলব না কি? শোভনা!… সামান্য একটু লজ্জা রুমাল দিয়ে মুছে নিয়ে শোভনা বললেন, সত্যি, দিনগুলো সব কোথায় গেল বলো তো! কী দিনই ছিল!
ইট ওয়াজ দা বেস্ট অব টাইমস, ইট ওয়াজ দ্য ওয়ার্ল্ড অব টাইমস, সবার জীবনেই এই প্যারাডক্সিক্যাল দিনগুলো আসে, তারে কয় জৈবন।
অতীশ বললেন, আমাদের এসেছিল, আমাদের পিতাদের এসেছিল, আমাদের পিতামহদের এসেছিল, এখন আমাগো পোলাপানদের আইস্যাছে।
তা সে যাই বল অতীশ, আমাদের যৌবনকাল যেন একটা বিশেষ রকম ছিল। ঠিক ওই স্বাদটা, শোভনের গলায় রোমন্থনের আমেজ।
জিভ বার কর, জিভ বার কর—এমন করে অতীশ বললেন যে ঘাবড়ে গিয়ে শোভন সঙ্গে সঙ্গে হাঁ করে এক হাত জিভ বার করে ফেলেছেন।
বলি জিভটা কার?
এ আবার কী প্রশ্ন? এ জিভ আমার, আবার কার?
তবে? নিজের জিভে অন্যের জৈবনের স্বাদ পাবি কী করে?
কথাটা খানিকটা ঠিক অতীশ, কিন্তু তবু বলব দিনকাল পালটে গেছে ভাই। আমাদের সময়ের সেই সর্বাত্মক রোম্যান্স আর নেই। চিন্তা করে দ্যাখ, মণিকা আড়ি আর শান্তনু চক্রবর্তী–কী জুটি রে? মণিকা চার ফুট দশ ইঞ্চি, শান্তনু ঝাড়া ছয় কী আরও বেশি। একটা চুমু খেতে গেলে পর্যন্ত হয় মণিকাকে মই লাগাতে হযে, নয় শান্তনুকে হাঁটু গেড়ে বসতে হবে। প্রেমে কোনো বাধা হয়েছিল? দুজনে কলেজস্ট্রিট দিয়ে গন্ডোলার মতো ভেসে চলেছে, শান্তনুর টাকা পয়সা মণিকার জিম্মায়, মণিকার নোট-পত্তর শান্তনুর ঝোলায়।
তোমরা আর কী জানো? কতটুকুই বা জানো?—শোভনা জয়ার দিকে চেয়ে হেসে বললেন, জয়শ্রী লাহিড়িকে মনে আছে তো? দারুণ মিষ্টি দেখতে! তোমরা
সবাই তো তার জন্যে পাগল ছিলে।
কোনকালে? কোনকালে?—অতীশ চ্যাঁচামেচি করে উঠলেন। শোভন বললেন, আরে বাবা বেথুন-বিউটি বলে কথা! একটু আধটু দোলা তো দেবেই। তার ওপর সাজ কী? সব সময়ে ফিলিম-স্টারের মতো সেজে আছে। গালে রুজ, ঠোঁটে লিপস্টিক।
জয়া বললেন, মোটেই না। ওর চেহারাটাই ওই রকম। গালের চামড়া এত পাতলা আর মসৃণ যে লাল ব্লাড ভেসলগুলো দেখা যেত, তাতেই মনে হত কিছু মেখেছে।
শোভনা বললেন, জয়া ঠিকই বলেছে। জয়শ্রীর চোখের পাতাই এত ঘন আর কালো ছিল যে মনে হত কাজল পরেছে, ঠোঁট এমনি এমনিই লাল। কীর্তি জানেনা ওর? হস্টেলে থাকত তো! একদিন গিয়ে দেখি কপালে হাত দিয়ে শুয়ে আছে। আমার দেখে বললে, ওহ ডগ-টায়ার্ড। ক্যান্ডিডেট ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে। একই ফিলম উনিশবার দেখা হল। উনিশজনের সঙ্গে।
কোথায় এখন জয়শ্রী?
এক বোকা ব্যারিস্টারকে শেষ পর্যন্ত বিয়ে করছে। আচ্ছা… তোদের অরিজিৎদার কথা মনে আছে? অরিজিৎ গোস্বামী!
শোভন বললেন, সেই রামস্বামী না কি মেয়েটা লেঙ্গি মারল বলে তো সুইসাইড করতে গিয়েছিল।
রাইট। লাস্ট মোমেন্টে পেট ওয়শ করে বেঁচে যায়।
শুধু কি প্রেম? বাঁধনহারা, ছন্নছাড়া, ওয়াইল্ড, স্যাক্রিফাইসিং… আরও কত কী ছিল। জলসা ছিল, গড়পাড়ের, বাদুড়বাগানের, শ্রীকৃষ্ণ লেনের, বউবাজারের। বিসর্জনের বাজনা বাজতে না বাজতেই শুরু হয়ে যেত। অতীশ বললেন, জলসাগুলো ছিল রোমান্সের আবহসংগীত। মেজাজ তৈরি করে দিত। আহা! ঠিক রাতদুপুর, আসর সরগরম, কানাতের ফাঁক দিয়ে শীতের হাওয়া ঢুকছে! সতীনাথ সেই হাওয়ায় বিরহ ঢেলে দিয়ে গেলেন।
শুধু বিরহ? অভিমান, আর্তি, আকুতি। তারপর শেষরাতে সেই বিরহের ঘুড়ি কেটে দিলেন দ্বিজেন মুখার্জি তাঁর ব্যারিটোন গলায়—শ্যামলবরণী তুমি কন্যা, ঝিরঝির বাতাসে ওড়াও ওড়না… আহা হা ভাবতে গেলে আর জ্ঞান থাকে না রে ভাই, জ্ঞান থাকে না।
এই সময়ে ঝিলিক হাতে একটা বড়ো প্যাকেট নিয়ে এসে বলল, কাকু, কাকিমা, তোমরা মোমো খাবে? গরম গরম আছে।
হঠাৎ? কোত্থেকে এল? অতীশ জিজ্ঞেস করলেন।
মুখ টিপে মুচকি মতো হেসে ঝিলিক বলল, বনবেড়ালরা এনেছে। এই নাও চায়ের সঙ্গে স্মৃতির সস মাখিয়ে খেয়ে ফ্যালো। ওড়না দুলিয়ে চলে গেল ঝিলিক। চোখদুটো ভ্যালভেলে করে শোভন বললেন, আমাদের বাল্যকালে ছিল কড়াইয়ের চপ, পকৌড়ি, দ্বারিকের শিঙাড়া। দেখতে দেখতে চপ হয়ে গেল… অতীশ তাড়াতাড়ি বললেন, ফ্লপ।
শোভনা বললেন, পকৌড়ি আর বলে না, বলে পাকোড়া।
জয়া বললেন, শিঙাড়াও বলে না, বলে সামোসা। এসে গেছে রোল, মোমো…
মোমোয় কামড় দিয়ে শোভন বললেন, স্মৃতির সস মাখিয়ে খাওয়াই বটে। ঝিলিকটা বলেছে ভাল। আচ্ছা অতীশ, তখন বনবেড়াল বললুম ও শুনতে পেল কী করে বল তো?
জয়া বললেন, ওর মাথার পিছনে দুটো চোখ আছে। রোটেটিং কান। কিছু চোখ কান এড়ায় না।
তা ঘরের মধ্যে ওগুলো বনবেড়াল, না মন বেড়াল?
অতীশ হো হো করে হেসে উঠলেন, বলেছিস ভালো। আমাদের যুগের জয়শ্রী লাহিড়ি যদি উনিশটাকে খেলাতে পারে তো এ যুগের ঝিলিক ভট্টাচার্যই বা কম যাবে কেন?
না না ঠাট্টা নয়। আচ্ছা জয়া–ঝিলিকের বয়স কত হল? কিছু মনে না করলে বল তো শুনি!
মনে করার কী আছে? ঝিলিক তো আপনার রিন্টুর পরের বছরই হল। আটাশ পার হয়ে গেছে। এম এ হয়ে গেছে এক যুগ হতে চলল।
করছে কী?
কী করছে না তাই জিজ্ঞেস করুন। প্রথমে তো দিব্যি টুক করে কলেজে চাকরি পেয়ে গেল। করল বছর দুয়েক। তার পর একদিন খোঁজ পেলুম কলেজের চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে।
